
২৩শে জুন উপমহাদেশের প্রাচীণতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রতিষ্টা বার্ষিকী, দলটি‘র ৭৬তম জন্মদিন, ৭৭তম বার্ষিকীতে পদার্পন করলো। এই দলটির সাথে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস জড়িত। প্রতিবছর দলটির প্রতিষ্টা বার্ষিকী ঘটাকরে পালিত হলেও এবছরই ব্যতিক্রম লক্ষনীয়। ২০২৪ সালের আগষ্টে, ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে অবৈধভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখলকারী নভেল লরিষ্ট ড. মুহম্মদ ইউনুস ক্ষমতায় এসেই দলটি‘র কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এর পেছনে ছিল গভীর ষঢ়যন্ত্র, ড মুহম্মদ ইউনুস যাদের সহযোগীতা এবং সমর্থন নিয়ে ক্ষমতার আসেন তাদের সকলেই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী, তাদের উদ্দেশ্য ১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো ১৯৭১ সালে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল, জামাতে ইসলামী সরাসরি পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে গণহত্যায় অংশ নেয়। জঙ্গিগোষ্টীও স্বাধীনতা চায়নি, তারা চেয়েছিল খিলাফত ব্যবস্থা।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সেক্টর কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দল, এই নিষেধাঙ্গা প্রত্যাহার করছেনা। তাদের এই নীরবতা রহস্যজনক! এবছর নিষেধাঙ্গার কারনে দেশের অভ্যন্তরে দলটির প্রতিষ্টা বার্ষিকীর প্রকাশ্যে কোন কর্মসূচী চোঁখে পড়েনি। তবে দেশের বাইরে বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোতে দলের বৈদেশিক শাখাগুলো ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নেয়। এই দলটির সাথে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ জড়িত। আওয়ামীলীগের রাজনীতি ব্যান্ড করা মানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অস্বীকার করা।
মুখে স্বীকার না করলেও স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে সকলকেই শ্রদ্ধা জানাতে হয়। স্মৃতিসৌধের ধাপগুলো তৈরী করা হযেছে, ১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০, এবং ১৯৭১কে মাথায় রেখে। এসব সৃষ্টি হয়েছিল আওয়ামীলগের কর্মসূচী হিসেবে। এর মাধ্যের স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। আওয়ামীলীগকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে বাংলাদেশের ইতহাস লিখা সম্ভব নয়। হবেওনা।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব-দানকারী দল আওয়ামী লীগের ৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। উপ-মহাদেশের রাজনীতিতে গেল ৭ দশকেরও বেশি সময় ধরে অবিভাজ্য ও অবিচ্ছেদ্য স্বত্ব হিসেবে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে গণতান্ত্রিকভাবে জন্ম নেয়া এই দলটি। এদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রত্যুজ্জ্বল। আওয়ামী লীগ মানেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলধারা। ৪৭-এর দেশ বিভাগ, ৫২র ভাষা আন্দোলন, ৬২র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬র ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর যুগান্তকারী নির্বাচন আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন— সবখানেই সরব উপস্থিতি ছিল আওয়ামী লীগের। আর এসবের অধিকাংশ আন্দোলনের কৃতিত্ব এককভাবে আওয়ামী লীগের।
১৯৪৯ সালে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার কে.এম. দাস লেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিমলীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। দলটির প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং টাঙ্গাইলের রাজনীতিবিদ শামসুল হককে যথাক্রমে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তখনকার সময়ের দেশ কাপানো তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে বন্দী। বন্দী অবস্থায় তাকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম কমিটির যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
১৯৫৫ সালের ২১ এবং ২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে দলের তৃতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত হয়। ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগ। পরে কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বহাল থাকেন। ৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে দলের আন্তর্জাতিক নীতির প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী- ও মাওলানা ভাসানীর মতপার্থক্যের কারণে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ ভেঙে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। আর মূল দল আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বহাল থাকেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড স্থগিত করা হয়। ১৯৬৪ সালে দলটির কর্মকান্ড পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান অপরিবর্তিত থাকেন।
১৯৬৬ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। এর পরে ১৯৬৮ ও ১৯৭০ সালের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এই কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে সভাপতি হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় সভাপতির পদ ছেড়ে দিলে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় পঁচাত্তরে কারাগারে ঘাতকদের হাতে নিহত জাতীয় নেতাদের অন্যতম এএইচএম কামরুজ্জামানকে। সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন মো. জিল্লুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আসে আওয়ামী লীগের ওপর মরণাঘাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবারও স্থগিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে আওয়ামীলীগকেও পুনরুজ্জীবিত করা হয়। তখন আওয়ামীলীগ মিজান এবং মালিক নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়, পরবর্তিতে জন্ম নেয় আওয়ামীলীগ ফরিদ-মহিউদ্দিন নামে আওয়ামীলীগের আরেকটি অংশ, আরেকটি অংশ আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাকশাল নামে আত্মপ্রকাশ ঘটে।
মূল দলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় যথাক্রমে মহিউদ্দিন আহমেদ ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে। ১৯৭৭ সালে এই কমিটি ভেঙ্গে করা হয় আহ্বায়ক কমিটি। এতে দলের আহ্বায়ক করা হয় সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে। ১৯৭৮ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি করা হয় আবদুল মালেক উকিলকে এবং সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুর রাজ্জাক। এরপরই শুরু হয় আওয়ামী লীগের উত্থানপর্ব, উপমহাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলার মূল প্রক্রিয়া। সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দলের মধ্যে সমস্যা দেখা দিলে নির্বাসনে থাকা বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফেরার আগেই ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় এবং সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন আবদুর রাজ্জাক। পরবর্তিতে আরো কয়েকজন ধারাবাহিতকায় দলটির সাধারন সম্পাদক হন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন.আব্দুল জলিল, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওয়াবায়দুল কাদের প্রমুখ। যতবারই আওয়ামীলগের কার্জক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছ , পরবর্তিতে দলটি দ্বিগুন শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে। বর্তমান সরকারের উচিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখতে হলে দলটির স্থগিতোদেশ প্রত্যাহার করা। আওয়ামীলীগ একটি ইতিহাস। আওয়ামীলীগ মানে স্বাধীনতা। আওয়ামীলীগ মানে পরাধীনতা ও দাসত্ববন্ধন থেকে মুক্ত বিহংগ। আওয়ামীলীগ মানে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের মুক্ত উজ্জ্বল শিখা।


































































