ধর্ম মূলত মানুষকে মানবতার পথে আহ্বান জানায়। ভালোবাসা, সহানুভূতি, ন্যায় ও শান্তিই এর মৌলিক দর্শন। কিন্তু যখন ধর্ম রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা বিকৃত রূপ নেয় বিভাজনের, ঘৃণার ও সহিংসতার অস্ত্রে। আজকের পৃথিবীতে ধর্মীয় উগ্রবাদ যেন এক ভয়াবহ সামাজিক ভাইরাস, যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে—এর শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ, বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও মানবতার চর্চা দীর্ঘদিন ধরে প্রবল ছিল। বাউল লালন, চৈতন্যদেব, হাছন রাজা কিংবা সুফি সাধকরা এই মাটিতে গড়ে তুলেছিলেন সহাবস্থান ও মানবপ্রেমের সংস্কৃতি। সুফিবাদ ও ভক্তি আন্দোলন ছিল ধর্মীয় সম্প্রীতির অন্যতম উৎস, যা মানুষের ভেতরে নৈতিক ও আত্মিক ঐক্য স্থাপনে ভূমিকা রেখেছিল (Eaton, 1993)। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এই ঐতিহ্যকে দুর্বল করে দেয় (Riaz, 2014)।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম ভিত্তি—যার লক্ষ্য ছিল সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করা শুরু হয়, ফলে সংবিধানিক মূল্যবোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। ধর্মনিরপেক্ষতা ধীরে ধীরে প্রতীকী ধারণায় সীমিত হয়ে পড়ে, আর বাস্তবে গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতা বাড়তে থাকে। এর ফলে সমাজে ভয়, বিভাজন ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি হয় (Khan, 2018)।
ধর্মীয় উগ্রবাদের শিকড় নিহিত রয়েছে অজ্ঞতা, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষমতার রাজনীতিতে। ধর্মকে যাঁরা সহিংসতার হাতিয়ার বানায়, তাঁদের উদ্দেশ্য ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে রামু (২০১২), নাসিরনগর (২০১৬), সুনামগঞ্জ (২০২১) ও পীরগঞ্জ (২০২১)-এর মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা গুজব, উস্কানি ও রাজনৈতিক প্ররোচনায় কিভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা সংগঠিত হয় (Ahsan & Mahmud, 2020; Amnesty International, 2022)। এসব ঘটনায় শুধু মন্দির নয়, পুড়েছে মানুষের নিরাপত্তা ও সহাবস্থানের বিশ্বাস।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন আসলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম রূপ। বাংলাদেশের সংবিধান (ধারা ২৮) স্পষ্টভাবে বলে—ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গভেদে বৈষম্য চলবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। Amnesty International (2022)-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় বিচার ও প্রতিকার—উভয়ই সীমিত। এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। Nussbaum (2012) যুক্তি দিয়েছেন, যে সমাজে একজন নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, সেখানে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার টেকসই হতে পারে না। ধর্মীয় উগ্রবাদের প্রভাব শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করে। এর ফলে মানুষ বিভক্ত হয় বিশ্বাস ও মতাদর্শে, হারিয়ে যায় সহমর্মিতা ও আস্থা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও সমাজ মানবিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। উগ্রবাদ সমাজে ভয়, ঘৃণা ও অবিশ্বাসের এমন এক সংস্কৃতি সৃষ্টি করে যা রাষ্ট্রের ঐক্য ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করে (Chowdhury & Karim, 2020)।
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP, 2021)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে উগ্রবাদ কেবল ধর্মীয় নয়—এটি অর্থনৈতিক বঞ্চনা, রাজনৈতিক স্বার্থ ও সামাজিক অসন্তোষের ফল। বাংলাদেশেও কিছু সংগঠিত গোষ্ঠী ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ঘটনাপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়; প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের ঘাটতি থেকে যায় সবসময়। ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রতিরোধে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নৈতিক ও শিক্ষাগত সংস্কার, যা মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, ভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলবে। পরিবার ও বিদ্যালয় এই প্রক্রিয়ার প্রথম স্তর। শিশুদের শেখাতে হবে—মানুষের পরিচয় ধর্ম নয়, মানবতা। গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি (Khan, 2018)।
Bangladesh Hindu Buddhist Christian Unity Council (BHBCUC) অনুযায়ী, ২০২৩ জুলাই থেকে ২০২৪ জুন পর্যায়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রায় ১,০৪৫টি ঘটনা ঘটেছে — যার মধ্যে মারা গেছে ৪৫ জন। Vatican News+1 ওই বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রায় ২,২০০টি মামলা (case) রেকর্ড হয়েছে। The Daily Star পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট ২০২৪ থেকে শুরু করে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বেশিরভাগ কেস ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত, শুধুই ধর্মীয় কারণে নয় — উদাহরণস্বরূপ পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয় ১,২৩৪টি অভিযোগ “রাজনৈতিক” ভিত্তিতে, মাত্র ২০টি “ধর্মীয়” ভিত্তিতে। The Business Standard+1. ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি–জুন) ২৫৮টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে নিহত ২৭ জন, মন্দিরে হামলা‑ভাঙচুর ৫৯টি, বাড়ি‑ব্যবসায় হামলা ৮৭টি। The Daily Star+1
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সহিংসতার পর প্রতিকার দেওয়া নয়, বরং এমন সামাজিক কাঠামো তৈরি করা যা ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি ঠেকাতে পারে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে, এবং দোষীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম ও পুরোহিত—সবাইকে সামাজিক প্রতিরোধের অংশ হতে হবে। ধর্মীয় উস্কানিতে কেউ স্থায়ীভাবে লাভবান হয় না; বরং রাষ্ট্রের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় (Chowdhury & Karim, 2020; UNDP, 2021)। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহাসিকভাবে সহিষ্ণু ও শান্তিপ্রিয়। তারা বারবার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং মানবতার পক্ষে রুখে দাঁড়িয়েছে। তাই ধর্মীয় উগ্রবাদ দমন কোনো প্রশাসনিক প্রচেষ্টা নয়, এটি এক সামাজিক ও নৈতিক সংগ্রাম। আমাদের জয় হবে তখনই, যখন আমরা ধর্ম নয়, মানবতাকে শ্রেষ্ঠ বলে মেনে নেব। সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও ভালোবাসাই পারে উগ্রবাদের অন্ধকার ভেদ করে নতুন আলোর সমাজ গড়ে তুলতে।
ধর্মীয় উগ্রবাদ এক গভীর সামাজিক রোগ, যা অজ্ঞতা, ভয় ও অবিচারে বেড়ে ওঠে। এর প্রতিকার সম্ভব তখনই, যখন শিক্ষা হবে মানবিক ও মুক্তচিন্তার ধারক। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মিলেই গড়ে তুলতে পারে এমন এক সমাজ, যেখানে মানুষ প্রথমে মানুষ—ধর্ম, জাতি বা মতাদর্শের আগে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই মানবিক আলোর ওপর—যেখানে মানুষই সর্বাগ্রে, ধর্ম নয়। আলোকিত সমাজ গড়তে হলে এখনই দরকার ঐক্য, শিক্ষা ও বিবেকের নবজাগরণ। ধর্মীয় উগ্রতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল রাষ্ট্রের নয়, প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। মানবতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা—এই তিন শক্তিই পারে বাংলাদেশকে উগ্রতার অন্ধকার থেকে টেনে তুলতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহাবস্থানমূলক সমাজ নির্মাণ করতে। সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও ভালোবাসাই পারে উগ্রবাদের অন্ধকার ভেদ করে নতুন আলোর সমাজ গড়ে তুলতে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই মানবিক আলোর ওপর—যেখানে মানুষই সর্বাগ্রে, ধর্ম নয়। জাতীয় পাঠ্যক্রমে “Ethics, Pluralism and Peace Studies” বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। মসজিদ, মন্দির ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত “Community Harmony Dialogue” চালু করা যেতে পারে। ডিজিটাল ঘৃণাচর্চা (hate speech) নিয়ন্ত্রণে কড়া নীতিমালা ও প্রযুক্তি-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে মানবাধিকারের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। যুব সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শান্তি ও সহাবস্থানের উপর প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রাম চালু করা।
References
- Ahsan, S., & Mahmud, T. (2020). Religious Violence and Social Polarization in Bangladesh. Dhaka University Journal of Social Studies, 27(2), 112–134.
- Amnesty International. (2022). Bangladesh: Attacks on Religious Minorities and Lack of Accountability. London: Amnesty International Report.
- Chowdhury, F., & Karim, M. (2020). Politics of Intolerance: Religious Extremism and Democracy in Bangladesh. South Asian Review, 41(3), 245–267.
- Eaton, R. M. (1993). The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760. Berkeley: University of California Press.
- Khan, A. (2018). Roots of Religious Extremism in South Asia: A Socio-Political Analysis. Journal of Peace and Conflict Studies, 15(1), 56–78.
- Nussbaum, M. C. (2012). The New Religious Intolerance: Overcoming the Politics of Fear in an Anxious Age. Harvard University Press.
- Riaz, A. (2014). Political Islam and Governance in Bangladesh. Routledge.
- (2021). Social Cohesion and Countering Violent Extremism in South Asia. New York: United Nations Development Programme.
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com


























































