
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসে, ততই আমাদের দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক। নির্বাচন-পূর্ববর্তী ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি ও বাড়ি দখলের মতো ঘটনাগুলো আর বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক নয়; বরং এগুলো একটি পুনরাবৃত্ত, সুপরিচিত এবং ভয়াবহ রাজনৈতিক বাস্তবতা। নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে এই সহিংসতার এক ধরনের অদৃশ্য যোগসূত্র তৈরি হয়েছে, যা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়। যত দোষ শুধু হিন্দুদের। তাই এদরকে ধরে ধরে মেরে ফেলতে হবে। এরা দেশে থাকলে দেশটা রসাতলে যাবে। তাই দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হচ্ছে। মেরে ফেলা হচ্ছে। পান থেকে চুন খসলেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু (হিন্দুদের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। যা গত স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং ইদানিং কালে সংখ্যালঘু নির্যাতন, হত্যা, খুন, গুম, অপহরণ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, বাড়ি-ঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ, মিথ্যে মামলা ইত্যাদি অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পিছনের প্রধান কারণ মূলত বিচারহীনতা।
এই সহিংসতার প্রভাব কেবল কিছু ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সার্বিক নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে। ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। ফলে নির্বাচন সংখ্যালঘুদের কাছে গণতন্ত্রের উৎসব নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়।দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দীর্ঘদিনের সমস্যার কোনো স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান দিতে রাষ্ট্র এবং দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। প্রতিটি ঘটনার পর কিছু আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস শোনা গেলেও বাস্তবে বিচার, জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে এবং সংখ্যালঘুদের মনে স্থায়ী ভয় ও অবিশ্বাস গেঁথে দিচ্ছে।
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। নির্বাচন যদি সত্যিই গণতন্ত্রের উৎসব হয়, তবে সেই উৎসবে দেশের প্রতিটি নাগরিক—সংখ্যাগরিষ্ঠ হোক বা সংখ্যালঘু—সমান নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার নিয়ে অংশ নিতে পারবে, এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়। এই দায় পালনে ব্যর্থ হওয়া মানে কেবল একটি জনগোষ্ঠীকে নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র ও নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া। নির্বাচনকেন্দ্রিক সংখ্যালঘু নির্যাতনের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো ক্ষমতার রাজনীতি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি। নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের একটি নির্দিষ্ট পক্ষের ‘সমর্থক’ বা ‘বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে চরম বিপজ্জনক প্রবণতা। ভোটের অঙ্ক কষে একটি জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়া, তাদের সম্পদ দখল করা কিংবা দেশছাড়া করার চেষ্টা আসলে রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের একটি কৌশল। এখানে ধর্ম নয়, মুখ্য হয়ে ওঠে ক্ষমতা—আর সংখ্যালঘুরা পরিণত হয় সবচেয়ে সহজ ও দুর্বল লক্ষ্যবস্তুতে।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র প্রায়শই নিরপেক্ষ রক্ষকের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনের বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া এবং বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দেয়—এ ধরনের সহিংসতার মূল্য খুব বেশি নয়। রাজনৈতিক পরিচয় যদি ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তবে অপরাধ প্রায় ‘নিরাপদ বিনিয়োগে’ পরিণত হয়। এই দায় শুধু স্থানীয় প্রশাসনের নয়; কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না।ক্ষমতাসীন দলগুলোর অবস্থান তাই বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একদিকে তারা গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে; অন্যদিকে তাদের শাসনামলেই নির্বাচনকেন্দ্রিক সংখ্যালঘু নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই দ্বৈততার অর্থ একটাই—অসাম্প্রদায়িকতা এখানে নীতিগত অঙ্গীকার নয়, বরং প্রয়োজনমাফিক ব্যবহৃত রাজনৈতিক বয়ান। নির্বাচনের পর দায়সারা বিবৃতি, তদন্ত কমিটি বা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা মূলত ব্যর্থতা ঢাকার কৌশল হিসেবেই দেখা দেয়। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দায়ও কম নয়। তারা ক্ষমতায় না থাকলেও এই সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নটি জাতীয় ঐকমত্যের বিষয় না হয়ে দলীয় সুবিধা–অসুবিধার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে রাষ্ট্র কখনোই এই সংকটকে কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করতে আগ্রহী হয় না।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর দিকে তাকালে বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ ঘোষিত Universal Declaration of Human Rights (UDHR)–এর ২ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্ম বা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকের স্বাধীনভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ভয় ও হুমকির মধ্যে দেওয়া ভোট আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কখনোই স্বাধীন ভোট হিসেবে গণ্য হতে পারে না। একইভাবে, International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)–এর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আইনগতভাবে বাধ্য নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় সংখ্যালঘুদের হত্যা, ধর্ষণ ও সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনা—এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থ প্রতিক্রিয়া—এই চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। জাতিসংঘের 1992 সালের সংখ্যালঘু অধিকার ঘোষণা স্পষ্ট করে বলে, সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের ‘বিশেষ দায়িত্ব’। অর্থাৎ রাষ্ট্র এখানে কেবল নীরব দর্শক হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, সংখ্যালঘু নির্যাতনকে প্রায়শই ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
তুলনামূলকভাবে অনেক গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনকালীন সংখ্যালঘু নিরাপত্তা একটি আলাদা রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা, নির্বাচন কমিশন–পুলিশ–মানবাধিকার কমিশনের সমন্বিত তদারকি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকা সেখানে নির্বাচন বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। বাংলাদেশে এই কাঠামোগত প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সহিংসতার দায় প্রায়শই রাজনৈতিক দায়মুক্তির সংস্কৃতিতে ঢাকা পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে impunity–কে ভবিষ্যৎ সহিংসতার সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিচারহীনতা মানেই অপরাধের পুনরাবৃত্তির লাইসেন্স।
নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধা নয়—এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকারগত দায়। এই দায় থেকে বারবার পালিয়ে যাওয়া মানে গণতন্ত্রকে কেবল সংখ্যার খেলায় নামিয়ে আনা, যেখানে মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের কোনো স্থান নেই।নির্বাচনের সাফল্য পরিমাপ হবে কেবল ভোটের হার বা ক্ষমতা বদলের মাধ্যমে নয়; বরং পরিমাপ হবে—কতটা নিরাপদে, ভয়মুক্তভাবে এবং সমান মর্যাদায় সংখ্যালঘুরাও ভোট দিতে পেরেছে তার মধ্য দিয়ে। এই মানদণ্ডেই রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজের নৈতিক উত্তরণ বিচারিত হবে।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর
shudir_chandpur@yahoo.com


























































