২০২৬ সালের ২ মার্চ কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর—যাকে অনেক পর্যবেক্ষক সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উন্মুক্ত নির্বাচন হিসেবে বর্ণনা করেছেন—নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে, তার সরকার যদি অতীতের অবিচারের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক—সাংবাদিকদের অব্যাহত কারাবাস, ভীতি প্রদর্শন এবং কণ্ঠরোধের—মোকাবেলা না করে, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতি অন্তঃসারশূন্যই থেকে যাবে।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীরা গ্রেপ্তার, মিথ্যা অভিযোগ এবং সহিংসতা ক্রমাগতভাবে সহ্য করে আসছেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে ১৬,৪২৯টি ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার শুরু করার মাধ্যমে এই অবিচারের ব্যাপকতা স্বীকার করে নেয়। তবুও, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও কয়েক ডজন সাংবাদিক এখনও কারাগারে রয়েছেন—কেউ কেউ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে আটক রয়েছেন।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগে শত শত সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন, বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বা তাদের প্রেস পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একজন অপরাধীকেও বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এই দায়মুক্তির পরিবেশ জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করেছে এবং সংবাদকক্ষ গুলোকে আতঙ্কের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করেছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সুশাসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ বিষয়ক কমনওয়েলথ নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে কমনওয়েলথের সরকার প্রধানগণ এই বিপদকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সেই নীতিমালাগুলো দ্ব্যর্থহীন: সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই দায়মুক্তি বন্ধ করতে, সাংবাদিকদের ওপর হামলার তদন্ত করতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার প্রদানে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। কমনওয়েলথের একজন প্রতি শ্রুতিবদ্ধ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এই বাধ্যবাধকতাগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী রহমান প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন। আটক সাংবাদিকদের প্রতি আচরণই হবে সেই অঙ্গীকারের প্রথম প্রকৃত পরীক্ষা। জাতিসংঘের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ রিপোর্টার আইরিন খান যেমন সতর্ক করেছেন, আদালত এই মামলাগুলো কীভাবে পরিচালনা করবে, তা-ই নির্ধারণ করবে নতুন সরকারের প্রতি শ্রুতিগুলো অর্থবহ, নাকি নিছক কথার কথা।যেসব সাংবাদিকদের কখনোই কারারুদ্ধ করা উচিত ছিল না, তাদের মুক্তি দেওয়া কোনো রাজনৈতিক উদারতার কাজ নয়—এটি একটি আইনগত ও নৈতিক আবশ্যকতা। গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সহিংসতার জন্য দায়মুক্তির অবসান ঘটানো কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়—এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ভিত্তি। সাংবাদিকরা যাতে নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের প্রতি কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি জনগণের প্রতি একটি সেবা।
বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন সরকার অতীতের অপব্যবহারের ধারা অব্যাহত রাখার পথ বেছে নিতে পারে, অথবা একটি সুস্পষ্ট বিচ্ছেদের পথ বেছে নিতে পারে—যা নাগরিক, কমনওয়েলথ এবং বিশ্বকে এই বার্তা দেবে যে আইনের শাসন শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু। অন্যায়ভাবে আটক সকল সাংবাদিককে মুক্তি দেওয়া, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করা এবং পেশাগত অধিকার ও স্বীকৃতিপত্র পুনরুদ্ধার করাই হবে সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত।
সারা বিশ্ব দেখছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণও দেখছে। এবং তারা এমন একটি ভবিষ্যৎ পাওয়ার যোগ্য, যেখানে সত্যকে শাস্তি দেওয়া হবে না, সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না এবং আইন জনগণের পক্ষে কথা বলা জনগণকে নিপীড়নের পরিবর্তে সুরক্ষা দেবে।









































