সাংবাদিক লেখক, গবেষক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার কর্মী শাহরিয়ার কবিরকে আটক রাখার ঘটনাকে মৌলিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হিসেবে দেখছে গণহত্যা প্রতিরোধ ও মানব নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ল্যামকিন ইনস্টিটিউট।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি মানবাধিকার কর্মী শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বাংলাদেশের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। বেলারুশভিত্তিক ল্যামকিন ইনস্টিটিউট ৭৫ বছর বয়সী এই সাংবাদিককে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। গেল ৫ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে ল্যামকিন ইনস্টিটিউট শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তার ও পরবর্তীতে আটক রাখার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রক্রিয়াগত ‘অনিয়মের’ অভিযোগ এনেছে।
তার আগে গত নভেম্বরে শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ‘আইনি মানদন্ড ভঙ্গ’ হওয়ার কথা বলেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউএনএইচআরসি)। তারা তার মুক্তির পাশাপাশি ক্ষতিপূরণও দাবি করেছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার বনানী এলাকা থেকে আটক করা হয় শাহরিয়ার কবিরকে। পরে জুলাই আন্দোলনের সময়কার একাধিক মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখায়। সেই থেকে এই মানবাধিকার কর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা কারাগারে রয়েছেন। এসব মামলায় একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। জামিনের আবেদন জানালেও তা মঞ্জুর হয়নি। ল্যামকিন ইনস্টিটিউট তাদের বিবৃতিতে শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তার করা, রিমান্ডে পাঠানো এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা অনুসরণ না করার বিষয়টিও তুলে ধরেছে।
সংস্থাটি বলেছে, অন্যান্য মামলায় আটক থাকা অবস্থায়ই তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার’ অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের একটি কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় হতাহতের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়। যদিও শাহরিয়ার কবির বাংলাদেশ সরকারের কোনো পদধারী ব্যক্তি নন এবং হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তার কোনো ভূমিকা ছিল না। এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে। ল্যামকিন ইনস্টিটিউট তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ১২ জানুয়ারি এ মামলায় শাহরিয়ার কবিরকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে, সেদিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ আসতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ও আদালতগুলোর ‘আচরণ’ বিবেচনায় নিয়ে শাহরিয়ার কবিরের বিচার বাংলাদেশের সংবিধানের আইনি বিধান বা আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী হবে, এমন প্রত্যাশা তাদের নেই। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হতে পারে এবং তাকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হতে পারে। তারা বলছে, শাহরিয়ার কবিরকে ‘স্বাধীনতাবঞ্চিত’ করার পেছনে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান, ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা ও একাত্তরে ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনার যোগ রয়েছে। তাছাড়া তরুণদের মধ্যেও তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। একটি হত্যা মামলায় জামিন শুনানির প্রসঙ্গ টানা হয়েছে বিবৃতিতে, যেখানে রাষ্ট্রপক্ষ সরাসরি শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে এক ধর্মীয় নেতার টেলিভিশন বিতর্কের কথা তোলা হয়। সে সময় রাষ্ট্রপক্ষ প্রকাশ্যেই জানায়, তার আটক মূলত কোনো ‘প্রমাণিত অপরাধমূলক কর্মকান্ডের কারণে নয়’, বরং তার ‘রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই’।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার কর্মী শাহরিয়ার কবির যাতে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করতে না পারেন, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে সোচ্চার হতে না পারেন সে জন্য তাকে আটক রাখা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বর্তমান সংকট নিয়ে বিদেশে গিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থেকেও তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন। এই গবেষক হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না তুলে ধরে ল্যামকিন ইনস্টিটিউট বলেছে, শাহরিয়ার কবির বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। তাকে গ্রেপ্তারের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং এরপর থেকে তাকে এমন পরিবেশে আটক রাখা হয়েছে, যা মানবিক আচরণের ন্যূনতম মানদন্ডও পূরণ করে না। সংস্থাটি বলেছে, শাহরিয়ার কবিরের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলেও তাকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আটক অবস্থায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও বিশেষ চিকিৎসা গ্রহণের আবেদনও বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিভিন্ন খবরে এমনও বলা হয়েছে, তিনি প্রয়োজনীয় ওষুধ বা যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাননি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদন্ডের লঙ্ঘন।
ল্যামকিন ইনস্টিটিউটের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হেলমেট ও হাতকড়া পরিয়ে আদালতে হাজির করার সময় শাহরিয়ার কবির ‘মব’ হামলার শিকার হয়েছেন, তাকে গালিগালাজও করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, মব হামলার সময় শাহরিয়ার কবিরকে রক্ষার চেয়ে পুলিশ নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত ছিল। আদালত কর্তৃপক্ষ তাকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে দেননি; এজলাশকক্ষে যাওয়ার জন্য লিফট ব্যবহারে বাধা দেওয়া হয়; আদালতের কার্যক্রম চলার সময় বসতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এছাড়া নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করে তার পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। এর মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষ শাহরিয়ার কবিরের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কার্যকর আইনগত প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি, বলছে ল্যামকিন ইনস্টিটিউট। গণহত্যা প্রতিরোধ ও মানব নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থাটি বলছে, জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের অনুসন্ধান অনুযায়ী, শাহরিয়ার কবিরের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ‘নির্বিচার গ্রেপ্তারের’ মধ্যে পড়ে। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে মামলা চলার মধ্যে গত বছরের শুরুর দিকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করা গবেষক শাহরিয়ার কবিরের পক্ষে ইউএনএইচআরসির কাছে একটা অভিযোগ দায়ের করা হয়, যেখানে আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ ছিল। সেসব অভিযোগের বিষয়ে পরে ‘নির্বিচারে গ্রেপ্তার’ শিরোনামে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে ইউএনএইচআরসির ওয়ার্কিং গ্রুপ।








