অগ্নিঝরা মার্চ বাঙালির আতীয় ইতিহাসের মুক্তির সংগ্রামের এক গৌরবময় ও বেদনাময় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মার্চ মাস আমাদের গৌরবের মাস। অহংকারের মাস। স্বাধীনতা ঘোষণার মাস। আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাস। ১৯৭১ সালের এই মার্চ মাসেই রাংলাদেশের স্বাধীনতার বপন হয়। এই মাসের প্রতিটি দিন ছিল সংগ্রামের, প্রতিরোধের, আত্মত্যাগের। এই মাসটি শুধু সময়ের পরিক্রমা নয় এটি আমাদের স্বাধীনতার বীজ বপনের মাস, সংগ্রামের দীপ্ত শপষের মাস। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল উত্তাল, প্রতিবাদের আগুনে জ্বলা। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে তখন মুক্তির দাবিতে গর্জে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। এই মাসটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতির প্রতিচ্ছবি। এটি বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের অনন্য গৌরবের প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই মাসে বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাক্ষ্যে চূড়ান্ত রূপ নেয়, এবং স্বাধীনতার পথরেখা সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অগ্নিঝরা মার্চ বাঙালির স্বাধীনতা ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৭১ সালের এই মাসে তীর আন্দোলনের পরিণতিতে শুরু হয় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ। বাংলার আন্দোলন-সংগ্রামের ঘটনাবহুল ও বেদনাবিধুর স্মৃতিবিজড়িত ১৯৭১-এর এই মার্চ মাসেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বে এসে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছিল বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হলেও চূড়ান্ত আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল একাত্তরের ১ মার্চ থেকেই।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ, সারা দেশই ছিল তখন অগ্নিগর্ভ। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন বেতার ভাষণে ৩ মার্চের গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের একটি প্রধান দল পিপলস পার্টি এবং অন্য কয়েকটি দল ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বেতারে এ ঘোষণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকা প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ সময় তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। ইয়াহিয়া খানের ওই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শক খেলা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে হাজারো মানুষ পল্টন-গুলিস্তানে বিক্ষোভ শুরু করে দিয়েছে। সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। সেদিন মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ক্ষুদ্ধ ছাত্ররা সেখানে গিয়ে প্রথমবারের মতো স্লোগান দেয়, বীর বাঙালি অস্ত্রধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কর্মসূচি ঘোষণার দাবি জানায়। বিক্ষোভ-স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকাসহ পুরো দেশ
এরপর একে একে পার হয় ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ২৫টি দিন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ চালায়, শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এই পথ ধরে বাঙালি দামাল ছেলেরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনেন একটি স্বাধীন দেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ । বাঙালির জীবনে নানা কারণে মার্চ মাস অন্তনির্হিতি শক্তির উৎস। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দান ছিল মুহুর্মুহু গর্জনে উত্তাল জনসমুদ্র। লাখো কণ্ঠের একই আওয়াজ উচ্চারিত হতে থাকে দেশের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। ঢাকাসহ পুরো দেশে পত পত করে উড়ছিল সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের পতাকা। শুরু হয় অদম্য সাহস আর আত্মপ্রত্যয়ের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ মাসেই দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন স্বাধীনতাকামী জনতা। এ মাসেই সাধারণ বাঙালি হয়ে উঠে অসাধারণ যোদ্ধায়।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পেরেছিল যে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙক্ষাকে আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানিরা বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বাঙালি নিধনে নামে। ঢাকার রাস্তায় সৈন্যরা নির্বিচারে হাজার হাজার মানুষকে খুন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ছাত্র-শিক্ষককে খুন করে। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ প্রতিরোধের ইতিহাস। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে জাতি লাভ করে স্বাধীনতা। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী শুরু করেছিল বর্বর গণহত্যা, যার বিরুদ্ধে বীর বাঙালি অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর আমরা অর্জন করি চূড়ান্ত বিজয়, লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে প্রতিষ্ঠা করি স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু বুর্জোয়া শাষক গোষ্ঠী এবং ক্ষমতাশীন রাজনৈতিক দলগুলোর শোষণ শাসন লুটপাট এবং উগ্রতা অগ্নিঝরা মার্চের অর্জনগুলোকে মলিন করে দিয়েছে।
মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। এরপরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী লড়াই, যার ফসল আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাঙালির জীবনে নানা কারণে এ মাস শক্তির উৎস। অসংখ্য ঘটনার উজ্জ্বল সাক্ষী। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা শুরু হয়েছিল মূলত ৬ দফার মধ্য দিয়েই। উনসত্তরের বিশাল গণ-আন্দোলনে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন হলো। ৭ মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখো বাঙালির সামনে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি শাসকদের হুশিয়ারি দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। মরতে যখন শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ক্ষুধা ও দারিদ্রদ্র্যমুক্ত, আধুনিক জীবনমানসম্পন্ন একটি সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে । এগিয়ে যাক বাংলাদেশ- এই কামনা আমাদের সবার
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫শে মার্চের গণহত্যা, এবং স্বাধীনতার ঘোষণা উল্লেখযোগ্য। এই মাস থেকেই শুরু হয় আমাদের মুক্তির চেতনার দীপ্ত যাত্রা, যা গড়ায় দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে। এই মাস শুধু সময়ের পরিক্রমা নয়, এ কারণেই মার্চকে বলা হয় “অগ্নিঝরা মার্চ” একটি জাগরণের মাস, প্রতিরোধের মাস, এবং স্বাধীনতার দাবিকে দৃঢ়ভাবে উত্থাপনের মাস। অগ্নিঝরা মার্চ” আমাদের জন্য শুধুমাত্র ইতিহাস নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রেরণার উৎস। আজকের বাংলাদেশ যেন সেই আত্মত্যাগের মহিমা ভুলে না যায়। স্বাধীনতা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়: এটি রক্তে লেখা ইতিহাস, আত্মত্যাগের গৌরব। তাই আমাদের উচিত, এই মাসের শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক, এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এই অগ্নিঝরা মার্চ আমাদের প্রেরণার উৎস, আমাদের মুক্তির সংগ্রামের ভিত্তি। এই মাসটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বীর বাঙালির চূড়ান্ত প্রস্তুতির প্রতিচ্ছবি।অগ্নিঝরা মার্চ” আমাদের জাতীয় ইতিহাসের চেতনার উৎস। এই মাসই আমাদের শিখিয়েছে সংগ্রামের শক্তি, প্রতিরোধের সাহস এবং বিজয়ের অঙ্গীকার। জাতীয় ঐক্যের মাস এই মাসে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যায়। প্রতিরোধের মাস পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।শপথের মাস- এই সময়েই বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।