কূটনৈতিক সিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে বর্তমান বাংলাদেশের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সখ্যতার বহর বাড়িয়ে চলেছে ঢাকার চীনা দূতাবাস। ঈদুল ফিতরের আগে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করতে দেখা গিয়েছে। সাধারণত এধরনের কর্মসূচিতে সরকারি সংস্থাকেই দূতাবাস বেশি গুরুত্ব দেয়। বিরোধী দলের সঙ্গে এধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূতের সক্রিয় যোগদান বেশ সন্দেহজনক। অনেকেই মনে করেন, চীনা দূতবাসের সহায়তায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) বিপাকে ফেলারই ছক কষছে জামায়াত। তাই জামায়াতের আমিরের মুখে অবিরত চীনের প্রশংসা। চীনও জামায়াতের দিকে সখ্যতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, এই সখ্যতা অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই জামায়াতের সঙ্গে চীনের সখ্যতা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। যা সচরাচর কোন ইসলামপন্থি দলের সাথে কোন কমিউনিষ্ট দেশের হয়না। হাসিনা দেশ ছাড়তেই জামায়াতের দপ্তরে গিয়ে ডা. শফিকুরের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই সখ্যতা গভীরতর হয়েছিল। চীন নিজের স্বার্থেই জামায়াতকে কাছে টানছে। জামায়াতের পরামর্শেই ড. ইউনূসও তার স্বল্পকালীন শাসনামলে চীন সফর করেন। আবার শেখ হাসিনার সরকারেরও পতন হয়েছিল চীন সফরের পরই।
চীন বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া। ঋণের ফাঁদে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে গ্রাস করা চীনা পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা। চীনা ঋণের ফাঁদে শ্রীলঙ্কায় নেমে এসেছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়। পাকিস্তানও দেউলিয়া হতে বসেছে। বাংলাদেশেও তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তার শুরু করে দিয়েছে কয়েক বছর আগে থেকেই। কিন্তু রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে তাদের সেই লক্ষ্য পুরোদমে পূর্ণ হয়নি। তাই এখন নতুন করে ছক কষছে বাংলাদেশকে গ্রাস করার। অর্থের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন রকম ফাঁদ পাতে চীন। সেই ফাঁদ যেকোনও দেশের জন্যই মারণফাঁদ। বাংলাদেশে সেই ফাঁদ পাতার কাজে তারা ব্যবহার করছে ধর্মীয় রাজনৈতিক দল জামায়াতকে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পালিত হবে চলতি বছর। কিন্তু বাকি আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বয়স প্রায় ৫৫। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতাতেই বেজিং ঢাকাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু একাত্তরের পরাজয়ের স্মৃতি পাকিস্তানের মতোই তারাও এখনও ভুলতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে পছন্দ করে না চীন। তাই জামায়াতের সঙ্গে চীনের এই সখ্যতা। জামায়াতও চায় চীনের সাহায্যে নিজেদের শক্তি বাড়াতে। জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান নিজেই বলেছেন, ‘চীন অবিরত বন্ধুর পরিচয় দিয়েই চলেছে।’
১৭ মার্চ পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে মিরপুর-১০ নম্বরে আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দুস্থদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূত ও জামায়াতের আমির উপস্থিত ছিলেন। চীনা দূতাবাস জামায়াতের মাধ্যমে এই খাবার বিতরণ করে। সেই অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির বলেন, ‘চীনের সাথে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদীর্ঘ ৫০ বছরের। ১৯৭৬ সালে চীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং তখন থেকে শুরু করে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আন্তরিক উন্নয়ন অংশীদার। চীনের অংশীদারত্বে বাংলাদেশে কয়েকটি বড় বড় প্রকল্প গড়ে উঠেছে।’
খাদ্য সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানেও তিস্তা প্রকল্প গুরুত্ব পায় ডা. শফিকুরের বক্তব্যে। একাধিক দেশ অনেক সহজ শর্তে তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইলেও তিনি চীনের হয়ে প্রকাশ্যেই দাবি তোলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই প্রকল্পকে শুধু সাপোর্ট করব না, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি আমাদের কিছু করার থাকে সেটাও করব। কারণ আমরা দেশের কল্যাণ চাই, মানুষের কল্যাণ চাই।’ তাঁর মতে, ‘তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের কান্না—উত্তরাঞ্চলের কান্না’। আর ইয়াও ওয়েনকে খুশি করতে তিনি বলেন, ‘আমরা এই কান্নার অবসান চাই। অতীতে এটা (তিস্তা প্রকল্প) কেন বাস্তবায়ন হয় নাই, এটা সবাই বোঝে। শিশুও বোঝে। আমরা ওই লিগ্যাসি আর বহন করতে চাই না। আমরা এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে জানিয়ে দিতে চাই, আমরাও স্বাধীন দেশের নাগরিক, আমাদের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি আছে।
চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে কোনও দেশেরই ‘নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি’ থাকতে পারে না। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান তার বড় প্রমাণ। চীনের স্বপ্নের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ থেকে দুনিয়ার বহু দেশ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ‘চীনা প্রেমে বিভোর’ ডা. শফিকুর বলেছেন, ‘আমরা আশা করি, অতীতের চেয়েও আগামী দিনগুলোতে আমাদের প্রিয় বন্ধুরাষ্ট্র চীন আরও বেশি উদ্যোগী হয়ে বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।’ প্রশ্ন উঠেছে , বাংলাদেশের মানুষের, নাকি জামায়াতের কল্যাণে কাজ করবে চীন?
বাংলাদেশের নতুন সরকার এখনও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে সরকারের চিন্তাভাবনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করেনি। দেশবাসীর ভালোর স্বার্থে বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পের সবদিক বিবেচনা করে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে জামায়াত। তাদের এই কৌশলকে মদদ জোগাচ্ছে চীন। চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের লক্ষ্যই হচ্ছে বাংলাদেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে চীনের ক্ষমতা বিস্তার। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা জিম্মির ভয় বাড়ছে। জামায়াতের চীনা প্রীতির কারণে অনেকেই পাচ্ছেন বড়ধরনের বিপদের গন্ধ।
খাদ্য সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে চীনা রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিভ্রান্তী তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে চীন ও জামায়াতের যৌথ উদ্যোগে উপহার বিতরণের কথা বলায়। তবে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছিলেন, চীনের অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির ড. শফিকুর রহমানের উপস্থিতির কথা। পরবর্তীতে চীনা দূতাবাসের তরফে বিবৃতিও দেওয়া হয়। তারা ব্যাখ্যা দেওয়ার পর জামায়াতের পক্ষ থেকে পোস্টটি সংশোধন করা হয়। বিতর্কিত অনুষ্ঠানটিতে ইয়াও ওয়েন বলেছিলেন, ‘ঈদুল ফিতর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও আনন্দ ভাগাভাগির সময়। এই সহায়তার মাধ্যমে চীন উষ্ণতা পৌঁছে দিতে এবং বাসিন্দাদের শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদ্যাপনে সহায়তা করতে চায়’।
নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের জমানায় এখনও প্রকাশ্যে চিনা সহযোগিতায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা সরকারীভাবে ঘোষণা করা হয়নি। চীনের প্রতি বিএনপি সরকারের বাড়তি উৎসাহও চোখে পড়েনি। এই অবস্থায় বিরোধী দলের চীনা প্রেম বেশ সন্দেহজনক বলেই দেশের সুশীল সমাজ, ভুরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহলের ধারনা। অনেকেই মনে করেন, চীনা সামগ্রীর মতোই সে দেশের পররাষ্ট্র নীতিও অতি ঠুনকো। কোনও গ্যারান্টি নেই। যেকোনও সময়ই পাল্টি খেতে পারে বন্ধুত্বও। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এবিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।







































