বাংলাদেশে চলমান মব কিলিং, সংখ্যালঘু নির্যাতন, সরকার বিরোধী আন্দোলনে হতাহতের ঘটনায় জড়িতদের বিচারসহ গেল সাত মাসে সংঘাতময় পরিস্থিতি নিরসনের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে সর্ব ইউরোপীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।
১ এপ্রিল ২০২৫ জেনেভা প্রেস ক্লাবে সর্ব ইউরোপীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আয়োজনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, লেখক, সাংবাদিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিপিড়নের ঘটনায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ আহবান জানানো হয়।
অল ইউরোপিয়ান মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাধারণ সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সর্ব ইউরোপীয়ান মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি আমিনুর রহমান খসরু, আন্তর্জাতিক বেসরকারি সহযোগী সংস্থা-এনজিওর মানবাধিকার কর্মী ফজলুর রহমান আফ্রিদি, সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক এমইপি পাউলো কাসাকা, জাপান ভিত্তিক বেসরকারি সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্যারিয়ার সাপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ইসিওএসওসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুনিচি ফুজিকি, বাংলাদেশের হাইকোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশের সংবিধানের অ্যাকাডেমিক ফেলো ব্যারিস্টার তানিয়া আমির, আইনজীবী ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নিঝুম মজুমদার, সর্ব ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম ও যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের সভাপতি পুস্পিতা গুপ্ত।
শুরুতেই একটি ভিডিও প্রতিবেদন দেখানো হয়। যেখানে বাংলাদেশে ২০২৪ এর আগস্টের পর থেকে হওয়া সহিংসতা, সংঘাত, হত্যাকাণ্ড, সংখ্যালঘু নিপিড়ন, লেখক-সাংবাদিকদের নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়। এছাড়া ধর্মীয় উগ্রবাদীদের উত্থানের তথ্যও তুলে ধরা হয়। এই সময়ের মধ্যে হওয়া সহিংসতা, হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনার বিচারহীনতা, মবসন্ত্রাসের ভয়াবহতার তথ্যও তুলে ধরা হয় ওই ভিডিও প্রতিবেদনে।
বক্তব্যে বাংলাদেশের হাইকোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশের সংবিধানের অ্যাকাডেমিক ফেলো ব্যারিস্টার তানিয়া আমির বলেন, একটা সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা প্রথম কি করলো? তারা একটি দায়মুক্তি আইন পাশ করলো। এটার মানে কি? এটা হলো, ৫ আগস্টের পর যত হত্যা হয়েছে, কোনোটিই তদন্ত, বিচার ও সাজা হবে না। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ১৪০০ মৃত্যু হয়েছে। সরকার ৮০০ মৃত্যুকে আমলে নিয়েছে। কি হলো বাকি ৬০০ মৃত্যুর ক্ষেত্রে? এগুলোর ক্ষেত্রেই দায়মুক্তি এসেছে। আইন কি বলে? প্রতিটি মৃত্যু, হোক ছাত্র, হোক পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রত্যেকটি হত্যার তদন্ত হতে হবে, বিচার হতে হবে। প্রশ্ন হলো, কে এই সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে, কে এই সরকারকে রক্ষা করছে?
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী মেটিকুলাস ডিজাইনের যে তাণ্ডব, অন্তত ৪৫০ থানায় আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী, বিরোধী দলীয় নেতারা, ধর্ম নিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের জন্মকালীন নানা স্মৃতি স্মারক পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনরত পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের পিটিয়ে হত্যার পর পা উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আইসিসের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বাংলাদেশি ও বাঙালি হিসেবে এসব ঘটনার সঙ্গে আমরা পরিচিত নই। এই ধরনের হত্যা, যেখানে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, নির্যাতন, নির্মমতার চিত্র! সেতু থেকে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই ঘটনাগুলোকেই ড. ইউনুসের সরকার দায়মুক্তি দিয়েছে।তিনি আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অপর প্রশ্ন হলো, সরকার কেনো এমনটি করছে? তারা কি কোনো গোষ্ঠীকে রক্ষা করতে চাইছে? যারা এসব করলো। সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছিলেন, বেশিরভাগ হত্যা হয়েছে স্নাইপারের , ৭.৬২ বোরের গুলিতে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনও বলছে, ৬৬% মৃত্যুর কারণ এই ৭.৬২ বোরের গুলি। ঠিক এজন্যই সরকার এসব তদন্ত করতে দায়মুক্তি দিয়েছে। কারণ সেনাবাহিনী গুলি করেনি। এমন অস্ত্র শুধু সেনাবাহিনীই ব্যবহার করে। অন্য দিকে পুলিশের সেই সক্ষমতা নেই। তাহলে কারা করলো এসব হত্যা? সেখানে কোনো তৃতীয় পক্ষ ছিল কি? কোনো মার্সেনারি গ্রুপ ছিল? তারা কট্টরপন্থী? তারা পুলিশের ইউনিফর্ম পরে এসব করেছে? আর সরকার এসবের তদন্ত এড়াতে চাইছে? অবাক কাণ্ড, এসবের ক্ষেত্রেই দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে? জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪০০ হত্যা হয়েছে। সরকার ৮০০ হত্যার কথা বললেও ৬০০ মৃত্যু নিয়ে চুপ। আর এই ৬০০ জনের বেশিরভাগই পুলিশ সদস্য।ব্যারিস্টার তানিয়া আমির বলেন, এই দায়মুক্তি ছাড়াও সরকার একই ধরনের আরেকটি কাণ্ড করেছে। তারা কারাগারের তালা খুলে দিয়েছে। সন্ত্রাসীদের কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়েছে আদালতের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই। তারা নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়েছে। জেলগেট অপরাধীদের জন্য খুলে দেয়া হলো কিন্তু কারা গ্রেপ্তার হলো। শিক্ষক সাংবাদিক মানবাধিকার কর্মী তাদেরকে কারাগারে ঢুকিয়ে দেয়া হলো এটাই হলো পুরা ঘটনার আপনি শাহরিয়ার কবিরের কথা বলতে পারেন মোজাম্মেল বাবু শ্যামল দত্ত শাকিল ও তার স্ত্রী এবং আইনজীবী।
এই আইনজীবি বলেন, জাতিসংঘের প্রতি প্রতিবেদন দেখিয়েছে কারা হত্যার সঙ্গে জড়িত। আমরা বিভিন্ন ভিডিওতে দেখেছি, কারা স্নাইপার ব্যবহার করলো। কট্টরপন্থীরা নিজেরাই বলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু সরকার এসবের দিকে কোনো নজর দেয়নি। আমরা ছাত্র হোক বা পুলিশ সব হত্যার বিচার চাই। এতে সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক এমইপি পাউলো কাসাকা বাংলাদেশে চলমান নানা সঙ্কটের কথা তুলে ধরে বলেন, আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে হবে, বাংলাদেশকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনুন। আইনের শাসন, পুলিশ বাহিনীকে নিজস্ব ধারায় ফিরিয়ে আনুন। একটি অবাধ সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করুন। এই ধরনের মব বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের সভাপতি পুস্পিতা গুপ্ত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপিড়নের ২০১০টি ঘটনা তথ্য তুলে ধরে বলেন, তাছাড়া ১৭০০ এর বেশি সংখ্যালঘু পরিবার এই সরকারের প্রথম চার মাসে আক্রান্ত হয়েছে। পুলিশ ১৬০৮টি ঘটনার কথা নিশ্চিত করে ধর্মভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠন হিজবুত তাহরিরের প্রধান জসীমউদ্দিন রাহমানীকে তারা মুক্ত করে দেয়। বাংলাদেশে মিথ্যা অভিযোগে হিন্দু নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে গ্রেপ্তার করে বিনাবিচারে কারাগারে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে চলমান এসব ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আওয়াজ তোলার দাবি জানান তিনি।