বেইরুট, ১ এপ্রিল – লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে বেইরুটের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছে, যা ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চার মাসের নাজুক যুদ্ধবিরতিকে আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এক হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যিনি সম্প্রতি হামাসের সদস্যদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং সহায়তা করেছিলেন।
এই হামলা লেবাননের রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরে ইসরায়েলের আগের এক হামলার কয়েকদিন পরেই ঘটে, যেখানে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দাহিয়া অবস্থিত।
হামলায় টার্গেট হওয়া ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বিবৃতি আসেনি।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন মঙ্গলবার সর্বশেষ ইসরায়েলি বিমান হামলার নিন্দা জানিয়ে একে “গুরুতর হুঁশিয়ারি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা লেবাননের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত উদ্দেশ্য নির্দেশ করে।
আউন বলেছেন, ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান “আক্রমণাত্মক আচরণ” লেবাননকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়াতে এবং দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমর্থন সংগ্রহ করতে বাধ্য করছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি জাতিসংঘের প্রস্তাব ১৭০১ এবং যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীদের সঙ্গে সমন্বয় করে হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন।
এক প্রতিবেদক জানিয়েছেন, হামলাটি বেইরুটের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরের একটি ভবনের উপর তিনটি তলার ক্ষতি করেছে, যেখানে ব্যালকনিগুলো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে নিচের তলাগুলোর কাচ অক্ষত ছিল, যা হামলাটি লক্ষ্যভিত্তিক ছিল বলে ইঙ্গিত দেয়। ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স উপস্থিত ছিল এবং হতাহতের উদ্ধার কাজ চলছিল।
হামলার আগে এলাকায় কোনো ধরনের সর্তকতা জারি করা হয়নি, এবং হামলার পর অনেক পরিবার বেইরুটের অন্য অংশে পালিয়ে গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
গত নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি এক বছরের দীর্ঘ সংঘাত থামিয়েছিল এবং এর শর্ত ছিল দক্ষিণ লেবাননকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও অস্ত্র মুক্ত করা, সেখানে লেবাননের সেনা মোতায়েন করা এবং ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর ওই অঞ্চল থেকে প্রত্যাহার। তবে উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত পুরোপুরি মানার ব্যর্থতার অভিযোগ করেছে।
মার্কিন মধ্যস্থতায় করা এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। জানুয়ারিতে ইসরায়েল প্রতিশ্রুত সেনা প্রত্যাহার স্থগিত রাখে এবং মার্চে লেবানন থেকে নিক্ষিপ্ত রকেট প্রতিহত করার দাবি করে, যার জবাবে তারা বেইরুটের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর এবং দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালায়।
ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ এই রকেট হামলার দায় অস্বীকার করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মঙ্গলবার বলেছে, লেবানন থেকে আসা রকেট হামলার বিরুদ্ধে ইসরায়েল আত্মরক্ষা করছে এবং ওয়াশিংটন “সন্ত্রাসীদের” এই সংঘাত পুনরায় শুরু করার জন্য দায়ী করছে।
একজন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র এক ইমেইলে বলেন, “সংঘাত আবার শুরু হয়েছে কারণ সন্ত্রাসীরা লেবানন থেকে ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপ করেছে,” এবং যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াকে সমর্থন করে।
২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধের সময় হিজবুল্লাহ তার মিত্র হামাসের সমর্থনে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানের ওপর রকেট হামলা শুরু করলে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত শুরু হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
গাজা যুদ্ধে, যেখানে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে ৫০,০০০ এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, তার সূত্রপাত হয়েছিল ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের এক হামলার মাধ্যমে। এতে ১,২০০ জন নিহত হয় এবং আনুমানিক ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়, যা ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী।