যদি এমন হয় যে, সূর্য তেজ হারিয়ে দীর্ঘকালব্যাপী লাল থেকে একপর্যায় আবার সাদাবরণ হলো। অথবা পৃথিবীর মেরুঅঞ্চলের সমস্ত বরফ গলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা একশো মিটার উঁচু হলো। অথবা বিজ্ঞানীরা পূর্বাভাস দিলো যে, বিশালাকৃতির একটি স্টেরয়েড বা গ্রহাণু মাস তিনের মধ্যে পৃথিবীর বুকে নিশ্চিতভাবে আছড়ে পড়বে।
উপরে বর্ণীত যেকোনও অবস্থায় পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য। তবে প্রথম দুটি অবস্থা পৃথিবীর বাইরে ঘটা মহাজাগতিক ঘটনা। তৃতীয়টি সম্পূর্ণ পৃথিবী গ্রহের অভ্যন্তরীণ। আর সবশেষ ঘটনাও মহাজাগতিক। এর যেকোনও একটি মহাজাগতিক ঘটনা নিশ্চিতভাবে পৃথিবী ধ্বংস করে দিবে। কিন্তু উল্লেখিত ঘটনাগুলোর ফলে অসৌরিয় (সৌরজগতের বাইরের) গ্রহ, নক্ষত্রের চলমান প্রক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র ছেদ পড়বে না!
প্রথমত: সূর্য হলো সৌরজগতের মূল। এ জগতের শক্তি, আলো, তাপ সবকিছুর উৎস, মাঝারি মানের হলুদ নক্ষত্র সূর্য। লোহিত বরণ ধারণ করা মানে সেটার বিস্ফোরণ ঘটার পূর্বলক্ষণ। বিস্ফোরণ ঘটলে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুর্ণয়মান গ্রহগুলোও ধ্বংস হবে। বিস্ফোরণের ফলে সূর্য থেকে ছিটকে পড়া উত্তপ্ত প্লাজমার মহাপ্লাবন এর নিকটস্থ তিন চারটি গ্রহের কক্ষপথ গ্রাস করবে। পৃথিবী, বুধ, শুক্র, মঙ্গলসহ অন্যান্য নিকটস্থ বস্তুরাজি সূর্য থেকে নির্গত উত্তপ্ত প্লাজমা স্রোতে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। তখন সৌরজগতের অবয়ব পুরাপুরি পাল্টে যাবে!
স্মর্তব্য প্লাজমা পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। এটি হলো অতি উচ্চতাপমাত্রার আয়নিত গ্যাস। প্রচণ্ড উত্তাপে যেকোনও পদার্থ এঅবস্থা লাভ করতে পারে। সূর্য এবং অন্যান্য সকল নক্ষত্রের মধ্যস্থ পদার্থরাজি প্লাজমারূপে অবস্থান করছে। নক্ষত্রগুলো প্লাজমার বেলুনসদৃশ। বেলুনের স্থিতিস্থাপকত্ব শেষ হলে বিস্ফোরিত হয়। নক্ষত্রদেরও স্থিতিস্থাপকত্বের ইতি হলে বেলুনের মতো বিস্ফোরিত হয়। অতঃপর এদের মধ্যস্থিত প্লাজমারাশি আশেপাশে ছিটকে পড়ে এবড়োথেবড়ো নেব্যুলারূপে দেখা যায়। নেব্যুলার মধ্যে প্লাজমার মহাপ্লাবন থাকে। এতে পতিত বস্তু কঠিন, তরল ও বায়বীয় থাকে না, প্লাজমা হয়।
দ্বিতীয়ত: নক্ষত্রের পতন হলে, তা স্বেত বামন, নিউট্রন নক্ষত্র, ব্লাকহোল ইত্যাদি হতে পারে। এর প্রতিটি অবস্থা নক্ষত্রের ভরের ওপর নির্ভর করে। অবস্থা যাই হোক, তাতে পৃথিবীর সময় হিসাবে লক্ষকোটি বছর লাগে। একটি নক্ষত্র বিস্ফোরণের ফলে আশেপাশের মহাকাশে ছিটকে পড়া প্লাজমার মহাপ্লাবন বইতে থাকে এবং পিছনে পড়ে থাকে ক্ষুদ্রাকৃতির নক্ষত্রকোর। যার মধ্যে পদার্থের ঘনত্ব প্রবল হওয়ায় এর মহাকর্ষ অসম্ভব শক্তিশালী হয়। অতঃপর উক্ত নক্ষত্রকোরের প্রবল মহাকর্ষ আশেপাশের মহাকাশে ছিটকে পড়া প্লাজমাস্তর আবার কেন্দ্রের দিকে টেনে আনে। ফলে সমস্ত বস্তুরাজি মিলে কেন্দ্রের দিকে চুপসে যেতে থাকে এবং এক পর্যায় পুরো নক্ষত্রটি কৃষ্ণবস্তুতে পরিণত হয়। যা কৃষ্ণগহ্বর বা ব্লাকহোল নামে পরিচিত। এই হলো একটি নক্ষত্রের জীবনচক্র।
অবশ্য সূর্যের মতো মাঝারী মাপের নক্ষত্র কখনও কৃষ্ণগহ্বর হয় না। বরং এজন্য একটি নক্ষত্রের ভর সৌরিয় ভরের চেয়ে ৩/৪-গুণ বেশি হতে হয়। সূর্য শেষ পর্যায়ে একটি স্বেতবামনে পরিণত হবে। অতঃপর নিকটস্থ কোনও ব্লাকহোলে পতিত হয়ে সূর্যের অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটবে। অতঃপর সৌরজগত গঠনের প্রাথমিক বস্তুকণাগুলো ব্লাকহোল অভ্যন্তরে এক অনন্য অবস্থা (Singularity) লাভ করবে! অতঃপর ব্লাকহোল থেকে ভিন্নকণার রূপ ধরে স্বেতগহ্বর হয়ে মহাবিশ্বের অনন্ত খালিস্থানে ছড়িয়ে পড়বে। সবশেষে শূন্যস্থানে আবার কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের প্রতিক্ষায় থাকবে। এই ধরনের ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে আমাদের মহাবিশ্বে। মূলত এসব ঘটনা চোখে দেখা তো দূরের কথা, অনুভব করাও সম্ভব না।
তৃতীয়ত: পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের সমস্ত বরফ গলে গেলে পৃথিবী একটি মহাসমুদ্রে পরিণত হবে। কোনও স্থলভাগ খুঁজে পাওয়া তখন দুষ্কর হবে। সে পর্যায় পৃথিবী মানব বসতির জন্য অনুপযুক্ত হবে।
চতুর্থত: বড় আকৃতির একটি স্টেরয়েড বা গ্রহাণু পৃথিবীতে পতিত হলে, কয়েকদিনের মধ্যে পৃথিবী গ্রহ অগ্নিগোলকে পরিণত হবে। সে সময় পৃথিবীতে কোনও জীবনের চিহ্নমাত্র থাকবে না। এমন একটি ঘটনায় ডাইনোযুগের সমস্ত প্রাণী ও গাছপালা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেগুলোর ফসিল পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে এখন পাওয়া যায়।
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, পৃথিবী হঠাৎ ধ্বংস হবে না। টাইটানিক জাহাজ ডুবতেও আড়াই ঘণ্টা সময় নেয়। আকৃতিতে পৃথিবীর সাথে টাইটানিকের তুলনা চলে না। সুতরাং পৃথিবী ধ্বংস হতে অনেক দিন, মাস, বছর এমনকি কোটি বছরও লাগতে পারে। এমনও হতে পারে যে, পৃথিবী ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, আমরা টের পাচ্ছি না। প্রতি বছর পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে ক্রমশ তাপ বাড়তে বাড়তে ভবিষ্যত মানবজাতি কতো যে ভয়ংকর তাপীয় পরিস্থিতির শিকার হবে, বর্তমান নাতিশীতোষ্ণ পর্যায় থেকে তা চিন্তা করা যায় না!
তবে অনুমান করা যায় যে, তখন দুনিয়াব্যাপী মানবজাতি সমস্ত দৈনন্দিন কাজ দূরে রেখে, স্বীয় প্রাণ রক্ষার জন্য শেষ প্রচেষ্টা চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। কিন্তু উক্ত নির্মম উষ্ণতার ধ্বংসযজ্ঞ থেকে কোনোক্রমে পরিত্রাণের উপায় নাই। যে ক্ষয়ক্ষতি হবে, তার সব পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রাণীকুল ও বৃক্ষরাজির বইতে হবে। সৌরজগতের বাইরে মহাবিশ্বে ভিন্ন কোনও অসৌরিয় গ্রহে (Exoplanet) পৃথিবী ধ্বংসযজ্ঞের কোনও প্রভাব পড়বে না।
তখন এ গ্রহবাসীদের কোথায়ও পালানোর উপায় থাকবে না। আসলে তখন মানবীয় সকল প্রকার লোভ-লালসা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিমেষে উবে যাবে। একজন অন্যজনকে ক্ষতি করা, খারাপ উপদেশ দেওয়া, অথবা আক্রমণ করার মতো মানবীয় হিংসাত্মক মনবৃত্তি বলতে কিছু থাকবে না। বস্তুত বিপদে পড়ে, মানবজাতি নিজেদের উদ্ধারের কথা ভাবে। ফলে খারাপ মানুষও ভালো কাজ করে। কিন্তু বস্তুজগতের যেকোনও পরিবর্তন ঠেকানোর সাধ্য মানুষের নেই। আর প্রলয়ের পূর্বে সকল মানুষ সৎ এবং নির্ভেজাল চরিত্র ধারণ করলেও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ হয় না।
বস্তুত মানুষ দুষ্ট চরিত্রের হয়, প্রকৃতি যখন তাকে শান্তিতে রাখে। সুখে থাকতে ভূতে কিলায় আরকি! পৃথিবী গ্রহের পরিবেশ প্রাণবান্ধব বলে মানুষ মহানন্দে দিনাতিপাত করছে। প্রতিটি মানুষ আরও চায়। সে চাওয়াগুলো কেবল চাওয়াতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পাওয়ার জন্য সবাই ব্যাকুল হয়ে পড়ে। এই আকুলতার প্রভাবে মানুষের চরিত্রে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। কেউ হয় ভালো এবং কেউ হয় মন্দ। কিন্তু একজন মানুষ যদি নিজের কাজগুলো অন্যের জন্য কতটা উপকারী বা ক্ষতিকর বিবেচনা করে, তবে প্রলয় আসার আগেই পৃথিবী একঝাঁক পায়রার আবাস হতো!
বিপদে পড়ে সবাই ভালো মানুষ হলেও সময় সবাইকে ভবিষ্যতে নিয়ে যায়, কাউকে পূন্যবান হতে পিছনে যেতে দেয় না। আজ বিশ্বব্যপী জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের জন্য ভবিষ্যত বংশধরদের নিয়ে মানুষ চিন্তিত। প্রতিটি শান্তিকামী লোক চায় যে, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব অনাসৃষ্টি তিরোহিত হোক। কিন্তু তা কি সহজে যাবে? অবশ্যই না!
তবে যদি প্রকৃতি অনুদার চরিত্র উন্মোচন করে, তবে এসব দূর হতে সময় লাগে মাত্র কয়েকমুহুর্ত। কিন্তু তাতে কী আসে যায়। মানুষ সমস্ত কর্মকাণ্ড একত্র করেও প্রকৃতির কাজে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারে না। বরং প্রকৃতির কাছে সে অসহায়ভাবে নিজকে সমর্পন করতে বাধ্য। এই যদি হয় মানুষের বাস্তব নিয়তি, তবে কিসের এতো দ্বন্দ্ব এবং কিসের জন্য জাতিগত আত্মম্ভরিতা?!







































