আমার এই আত্মচিৎকার হয়তো সবার কানে পৌঁছাবে না। শিক্ষকদের ওপর চলমান নিপীড়ন-নির্যাতন, অবমূল্যায়ন, শারীরিক ও মানসিক হেনস্তা—এমনকি হত্যার ঘটনাও হয়তো অনেকের চোখে পড়ে না। কিন্তু ইতিহাস ও প্রকৃতি এসব অন্যায় নীরবে নথিভুক্ত করে রাখে। একজন শিক্ষক যখন আত্মচিৎকার করেন, সেটি কেবল ব্যক্তিগত বেদনার প্রকাশ নয়—তা একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার দলিল।
প্রশ্ন জাগে—বিশ্বের আর কোনো দেশে কি এমন নজির আছে, যেখানে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের হাতে শিক্ষক নিয়মিত নিপীড়িত হন, অপমানিত হন, মারধরের শিকার হন, এমনকি প্রাণ হারান? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এসব ঘটনা আজ আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং গা-সওয়া বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই দেখা যায়—পরীক্ষার ফল নিয়ে ক্ষোভের জেরে শিক্ষককে অবরুদ্ধ করা হয়েছে, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, সামাজিকভাবে অপমান করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রাণও হারিয়েছেন। কিন্তু এসব ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল, খণ্ডিত কিংবা নীরব। অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হয় না। এই বিচারহীনতাই শিক্ষক নিপীড়নের সবচেয়ে বড় উৎস।
আজ শিক্ষকরা সামাজিক মর্যাদা হারাচ্ছেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। বিশ্বের অনেক দেশে শিক্ষক সমাজ সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা পায়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ফিনল্যান্ড, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে শিক্ষকতা একটি সর্বোচ্চ সম্মানজনক পেশা। সেখানে শিক্ষকের ওপর হাত তোলা শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, গুরুতর আইনগত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের মধ্যে শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ বজায় থাকে। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষকদের জন্য সেই সুরক্ষা কাঠামো কার্যত অনুপস্থিত।
শিক্ষক সমাজ আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক মর্যাদা ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অনিশ্চিত। বেতন কাঠামো, পদোন্নতি, পেনশন কিংবা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলা। জাতীয় কোনো অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় শিক্ষকদের উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য। এটি নিছক অবহেলা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের প্রতিফলন।
রাষ্ট্র যেন শিক্ষকদের কথা ভুলেই গেছে। অথচ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, রাজনীতি ও ব্যবসা—সব ক্ষেত্রের নেতৃত্বই কোনো না কোনো শিক্ষকের হাতে গড়ে উঠেছে। একজন বিচারক, একজন সচিব, একজন মন্ত্রী কিংবা একজন উদ্যোক্তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন অসংখ্য শিক্ষক। সবাই কোনো না কোনো শিক্ষকের হাত ধরেই জ্ঞান ও বিবেকের আলো পেয়েছেন। সেই শিক্ষার ফলেই তারা আজ ক্ষমতা, সম্মান ও পরিচয় অর্জন করেছেন। তাঁদের জ্ঞানের আলো ছাড়া এই রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভই টিকে থাকার কথা নয়। সেই শিক্ষকদের আজ নিরাপত্তাহীনতা ও অপমানের মুখে দাঁড় করানো রাষ্ট্রের আত্মবিস্মরণেরই নামান্তর।
আরও উদ্বেগজনক হলো—রাষ্ট্রের কিছু অংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে একই কাতারে দাঁড় করিয়ে বিচার করার প্রবণতা। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা সামাজিক আলোচনায় শিক্ষককে প্রায়ই একটি সাধারণ সেবাদানকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যার কোনো নৈতিক কর্তৃত্ব নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদাই ক্ষুণ্ন করে না, শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। শিক্ষক যদি সম্মান না পান, তবে শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা থাকে না, শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হয়। যা চরম অপমানজনক ও অমানবিক। এর ফলেই শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নৈতিকতা ভেঙে পড়ছে, আর দেশের সামগ্রিক ও স্থায়ী উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দিয়েছে—শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় অনিবার্য। উপমহাদেশের নানা সংকটময় সময়ে দেখা গেছে, শিক্ষার অবমূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে এনেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই।
শিক্ষক নিপীড়নের পেছনে মূল কারণ বিচারহীনতা। যখন অপরাধীরা দেখে—শিক্ষকের গায়ে হাত তুলেও শাস্তি এড়ানো যায়, তখন সেই অপরাধ বারবার সংঘটিত হয়। এটি সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা দেয়—শিক্ষক দুর্বল, শিক্ষক অসুরক্ষিত। এই বার্তা শুধু শিক্ষক সমাজকেই নয়, পুরো জাতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শিক্ষকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো করুণা নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এটি কেবল একটি পেশাগত দাবি নয়—এটি জাতির ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রশ্ন। শিক্ষক যদি নিরাপদ না হন, সম্মান না পান, তবে শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে; আর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে জাতির চরিত্র ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ওপর। শিক্ষক যদি ভয়ে, অপমানে ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটান, তবে তিনি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তাশীল, নৈতিক ও মানবিক নাগরিক গড়ে তুলতে পারবেন না।
এখন সময় রাষ্ট্রের স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার। শিক্ষক নিপীড়নের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো, সামাজিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে সমাজকেও মনে রাখতে হবে—শিক্ষককে সম্মান করা মানেই ভবিষ্যৎকে সম্মান করা। সেইসাথে সুবিধা ভোগী শিক্ষক নেতাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে যাদের কারণে রাষ্ট্র এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, শিক্ষা ব্যহত হয়, শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ।
শিক্ষক অবহেলিত হলে শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতি পিছিয়ে পড়ে। এই সরল সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এখনো সময় আছে—রাষ্ট্র চাইলে এই অবক্ষয়ের পথ থেকে ফিরে আসতে পারে। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা মানে রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা রক্ষা করা। এই উপলব্ধিই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com







































