মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে, যা ইতোমধ্যেই মূল রণাঙ্গন ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরও কয়েকটি দেশকে জড়িয়ে ফেলছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে বলেছে, “মার্কিন বাহিনী আজ রাত ৮টায় (পূর্বাঞ্চলীয় সময়) (০০০০ জিএমটি) ইরানে হামলা শুরু করেছে।”
“মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর ওপর গতকাল ইরানের চালানো হামলার চেষ্টার এটি একটি শক্তিশালী জবাব।”
এর আগে বুধবার, ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা অ্যাম্ব্রে এক প্রাথমিক মূল্যায়নে জানায়, মিশরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর দামিয়েত্তায় একটি মার্কিন মালিকানাধীন গ্যাস ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা হয়েছে। একই সময়ে, মার্কিন ও সৌদি বাহিনী পূর্ব ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালায় এবং ইরান জর্ডানে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
মিশরের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বন্দরে আগুন লাগার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও ড্রোন হামলার কোনো উল্লেখ করা হয়নি। এর জন্য কারা দায়ী তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না।
ইরাক ও মিশরে সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আরও দেশগুলোকে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে, কারণ গত সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে।
মার্কিন সেনাদের ওপর গুলি চালানোর প্রতিশোধ নিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া প্রতিশ্রুতির পরই বুধবার ইরানে মার্কিন হামলা চালানো হয়।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “সুতরাং এবার আমাদের পালা,” এবং “তাদের ওপর খুব কঠিন আঘাত হানার” প্রতিশ্রুতি দেন। একই সাথে তিনি আবারও বলেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।
ইরান গত রাতে নিশ্চিত করেছে তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালীতে থাকা জাহাজগুলোর ওপর গোলাবর্ষণ করেছে। এছাড়া, তেল ও গ্যাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নৌপথ, হরমুজ প্রণালীটি যৌথভাবে পরিচালনার জন্য ওমানের একটি প্রস্তাবও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে একটি বোমা হামলা অভিযান শুরু করে। ট্রাম্প বলেছিলেন, এই অভিযান মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে। জুনে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যায়, কারণ প্রণালীটি নিয়ে নতুন করে লড়াই শুরু হয়। ইরান দাবি করে, প্রণালীটি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পাঁচ মাসব্যাপী এই যুদ্ধের অন্যতম তীব্র উত্থানে বুধবার তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ৮ শতাংশের বেশি বেড়ে বেঞ্চমার্ককে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের অনেক উপরে ঠেলে দেয়। এর ফলে এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে মার্কিন হামলা বন্ধ করে দেওয়ায় যে দরপতন হয়েছিল, তার অনেকটাই পুষিয়ে যায়।
ইরাকে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ স্লোগান
যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরবের এই যৌথ হামলায় প্রথমবারের মতো রিয়াদ প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে হামলায় যোগ দিয়েছে।
ইরাকের পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস—ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত আধাসামরিক গোষ্ঠী—জানিয়েছে, ইরাকজুড়ে বিভিন্ন ঘাঁটিতে চালানো মার্কিন-সৌদি হামলায় তাদের অন্তত ২০ জন সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছে।
নিহত যোদ্ধাদের মরদেহ বডি ব্যাগে বহন করার সময় ইরাকি পুরুষরা “আমেরিকার মৃত্যু হোক!” বলে স্লোগান দিচ্ছিল।
ওয়াশিংটন ও রিয়াদ জানিয়েছে, ইরাক থেকে সৌদি আরবের তেল লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে।
দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যৌথ হামলার পর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বুধবার ওয়াশিংটনে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ট্রাম্প প্রশাসনকে ইয়েমেনের হুথিদের ওপর হামলা এবং ইরাকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত হামলা চালিয়ে সংঘাত আরও না বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছেন।
সূত্রগুলোর মধ্যে একজন আরও যোগ করেছেন, এই ধরনের সংঘাত বৃদ্ধি “বড় ধরনের অজানা ঝুঁকির” পথ খুলে দেবে। মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউস এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
মার্কিন কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধাস্ত্রের মজুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান পুনরায় শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
লোহিত সাগর নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির পর ইরানে হামলা হয়েছে
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ এই সপ্তাহে অনুমান করেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে ১,০০০-এরও কম প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৫০-এরও কম থাড ইন্টারসেপ্টর রয়েছে—এই দুটিই প্রধান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
যদিও ইরান ইরাকের ভূখণ্ড থেকে তাদের বাহিনীর সরাসরি হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে, ইরানের সংবাদপত্র হামশাহরি জানিয়েছে ইরাকে চালানো হামলায় ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর চারজন উপদেষ্টা নিহত হয়েছেন।
ইরাকের বিপজ্জনক বিভেদ
ইরাকের ওপর এই হামলা সেই অস্থিতিশীল দেশটির একটি বিপজ্জনক বিভেদকে উন্মোচিত করেছে। শিয়া-নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি সরকারের মধ্যে অন্যতম, যারা তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়ের সাথেই ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু এই বিভক্ত আনুগত্য ক্রমাগত উত্তেজনা এবং ঘন ঘন অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার একটি উৎস।
মাত্র দুই মাস আগে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির কার্যালয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছে তিনি দেশকে আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে রাখতে চান।
ইরাকের রাষ্ট্রপতি আধাসামরিক বাহিনীর ওপর এই হামলাকে “একটি অগ্রহণযোগ্য আক্রমণ এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন” বলে নিন্দা করেছেন এবং একই সাথে ইরাকের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
দুটি বৃহত্তম শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরান ও ইরাকের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক এই সপ্তাহে দৃশ্যমান হয়েছে, যখন লক্ষ লক্ষ ইরানি তীর্থযাত্রী শহীদদের স্মরণে বার্ষিক শোক পালনের জন্য ইরাকের মাজারগুলোতে যাচ্ছেন।
ইরাকে হামলা চালানোর কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের ওপর একটি আকস্মিক ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা পাঁচটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো সম্প্রতি ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে এই মাসে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হন, যা মার্চের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে একটি অননুমোদিত পথে যাওয়ার চেষ্টাকারী তিনটি ট্যাংকারেও আঘাত হেনেছে।































































