২০২৬ ঈসায়ীর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বুঝিয়ে দিয়েছেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সোনালী অধ্যায় রচনায় আগ্রহী দিল্লি। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় ভারত। চায় দুই দেশের মানুষের উন্নতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শাসনামলেও ভারত চায় বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও উন্নত করতে। তাই পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ডিজেল সঙ্কট দেখা দিতেই অতিরিক্ত ৫ হাজার টন ডিজেল পাঠিয়েছে ভারত। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানিয়েছেন, ভিসা প্রক্রিয়াও খুব শিগগিরই স্বাভাবিক হবে। বাড়বে যোগাযোগ ও আত্মীয়তা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পাঠানো চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লিখেছেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হোক’। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদন অনুযায়ী শুভেচ্ছা বার্তার শেষে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও শুভকামনা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ২০২৬ তারিখে পাঠানো চিঠিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লিখেছেন, ‘ভারতের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের এই আনন্দঘন উৎসব উপলক্ষে আপনাকে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।’ একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পবিত্র রমজান উপলক্ষ্যে গত এক মাস ধরে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা রোজা ও ইবাদতের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করেছেন।’ চারিদিকে যুদ্ধের দামামার মধ্যে মোদী তাৎপর্যপূর্ণভাবে মন্তব্য করেছেন, ‘ঈদুল ফিতর উদযাপন আমাদের সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব ও একাত্মতার চিরন্তন মূল্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা বিশ্বব্যাপী মানুষের শান্তি, সম্প্রীতি, সুস্বাস্থ্য ও সুখ কামনা করি।’
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নির্বাচনে জয়ের খবর পেয়েও মোদী আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। প্রথমে এক্স হ্যান্ডলে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করেন। পরে টেলিফোনে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তবে শুধু শুভেচ্ছা বিনিময়ই নয়, মোদী সহযোগিতার বার্তাও দিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত। তাই বাংলাদেশের এই সঙ্কটে ডিজেল পাঠিয়েছে ভারত। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মহম্মদ রেজানুর রহমান ডিজেল পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি সংবাদ সংস্থাকে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের একটি চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তি অনুসারে, ভারত পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশে ১,৮০,০০০ টন ডিজেল সরবরাহ করবে’। পাইপ লাইনের মাধ্যমে সহজেই ডিজেল পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশে। ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আনতে খরচ ও সময় দুটিই কম লাগছে। এছাড়াও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ডিজেলের সহজলভ্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ বা মৈত্রী পাইপলাইনের উদ্বোধন করেন। পাইপলাইনের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। এরমধ্যে প্রায় ১২০ কিলোমিটারই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে নির্মিত পাইপ লাইন দিয়ে বিএনপির আমলে ডিজেল আসছে বাংলাদেশে। কারণ ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, জনগণের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয় বেশী।
চলমান জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জানা গিয়েছে, ওই বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন ব্যবহার করে আগামী চার মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিই দিল্লির লক্ষ্য। কারণ এই সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাই বিএনপির ভোট জয়ের খবর পেয়েই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সামাজিক মাধ্যমে বাংলায় পোস্ট দিয়ে শুভেচ্ছো জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরে ফোন করেও কথা বলেন উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী। নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সৌজন্য ফোনালাপের কথা ট্যুইট করে লিখেছিলেন ‘তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলতে পেরে আমি আনন্দিত। এই জয় বুঝিয়ে দিল বাংলাদেশবাসী আপনার নেতৃত্বে আস্থা রাখেন’। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক নিয়েও বার্তা দিয়েছেন মোদী। তিনি জানান, গণতান্ত্রিক, উন্নয়নশীল বাংলাদেশের পাশে আছে ভারত। প্রধামন্ত্রীর বক্তব্য, ‘ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বহুবিধ সম্পর্ক রয়েছে, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার তাগিদে সেসব এবার আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে’।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভিসা। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ভিসা প্রক্রিয়া অনেকটাই স্বাভাবিক করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাও জানিয়েছেন,‘ভিসা সেবা আবার স্বাভাবিক হচ্ছে’। এরজন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। দিল্লি ও ঢাকা উভয়ই সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাই তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূত হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বড়লা। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মোদীর শুভেচ্ছাবার্তা ও ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রনপত্র তুলে দেন। বিড়লা বলেছেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় ভারত পাশে থাকতে প্রস্তুত’। মোদীর আমন্ত্রণের জবাবে তারেক রহমান লিখেছেন, ‘দুই দেশের পক্ষেই সুবিধাজনক একটি সময়ে আমি ভারত সফরে যেতে এবং ফলপ্রসূ আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী’।
আগামী মাসেই সংক্ষিপ্ত সফরে নয়াদিল্লি যেতে পারেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। আগামী ৮ এপ্রিল ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দিতে তাঁর মরিশাস যাওয়ার কথা রয়েছে। যাত্রাপথে দিল্লিতে তিনি কিছু সময়ের জন্য যাত্রাবিরতি নিতে পারেন। ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নিতেই উভয় দেশের সম্পর্কের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের যুবনেতা শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার দুই মূল অভিযুক্তকেই গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জানা গিয়েছে. বাংলাদেশের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পটুয়াখালির বাসিন্দা ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭) এবং ঢাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেনকে (৩৪) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুজনকেই বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সীমান্তের উভয় পারেই এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বিএনপি সরকারের আমলে সীমান্তে গুলিচালনারও কোনও খবর নেই।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবধরনের জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। ভারতও সেটাই চায়। তাই বাড়ছে বন্ধুত্ব। সম্প্রতি দিল্লি সফর করেন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী। সফরকালে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ ভারতের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। জানা গিয়েছে, উভয় পারের অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য আদানপ্রদান নিয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। শান্তি অক্ষুন্ন রাখাই ছিল সেই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য। দুই দেশেই নিজেদের জনগণের স্বার্থে উন্নয়নমূলক কাজকেই প্রাধান্য দিতে চাইছে। ঈদের শুভেচ্ছাবার্তাতেও মোদী সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন বলে কূটনৈতিক মহলের অনুমান। শিগগিরই শুরু হতে চলেছে সম্পর্কের সোনালী অধ্যায়।








































