আর ধরবো না ঝাটকা, ইলিশ খাবো টাটকা, যরা ধরে ঝাটকা, আদের ধরে আটকা। আমি ঝাটকা। আমিই আগামীর বড় ইলিশ। আমাকে এখন ছোট, তুচ্ছ কিংবা সামান্য মনে হলেও কিন্তু আমার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, দেশের অমূল্য সম্পদ এবং নদীমাতৃক বাংলাদেশের গর্ব। আমি শুধু একটি মাছ নই—আমি আপনাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই আমার এই ছোট্ট আবেদন—আমাকে এখনই মারবেন না, আমাকে বড় হতে দিন। আমি আপনাদের জন্যই বেঁচে থাকতে চাই। বাংলাদেশে ইলিশ শুধু একটি সুস্বাদু মাছ নয়; এটি দেশের জিডিপিতে অবদান রাখে, লাখো জেলের জীবিকা নিশ্চিত করে এবং রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে। কিন্তু যখন ঝাটকাকে বড় হওয়ার আগেই ধরা হয়, তখন সেই সম্ভাবনাময় সম্পদটি ধ্বংস হয়ে যায়।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি বহু দিক থেকেই নদীর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আর সেই নদীর সবচেয়ে বড় উপহারগুলোর মধ্যে একটি হলো ইলিশ। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের পরিচয়ের প্রতীক। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার স্রোতে বেড়ে ওঠা ইলিশ যুগ যুগ ধরে বাঙালির রসনা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু এই ইলিশের জীবনচক্রের সূচনা হয় আমার মাধ্যমেই—আমি সেই ছোট্ট ঝাটকা, যার জীবন রক্ষা করলেই একদিন বড় ইলিশ হয়ে আপনাদের ঘরে সুখ-সমৃদ্ধি ভরপুর মাছের ভাণ্ডার নিয়ে আসতে পারি। আমাকে এখনই ধরবেন না, আমি জাতীয় সম্পদ। আমাকে বড় হতে দিন।” এই কথাগুলো কেবল আবেগ নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, লোভ, প্রশাসনের যোগশাযস, ক্ষমতাসীন স্থানীয় নেতাদের তৎপরতা ও অসচেতনতার কারণে আমাকে বড় হওয়ার আগেই ধরা হচ্ছে। জেলেরা জীবিকার তাগিদে, ব্যবসায়ীরা লাভের আশায়, আর অনেক ভোক্তা অজ্ঞতার কারণে আমাকে কিনে খাচ্ছেন। এতে হয়তো সাময়িক লাভ হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আমাদের জন্য, আপনাদের ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমি যদি বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ি, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ইলিশের সংখ্যা কমে যাবে। ফলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং জেলেদের জীবিকাও সংকটে পড়বে।একটি ঝাটকা বড় হয়ে পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হলে লাখ লাখ ডিম ছাড়তে পারে। আমাকে বাঁচানো মানে ভবিষ্যতের অসংখ্য ইলিশের জন্ম নিশ্চিত করা। আমাকে রক্ষা করা শুধু একটি মাছকে রক্ষা করা নয়—এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার সমান।
সরকার ইতোমধ্যে ঝাটকা সংরক্ষণে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নির্দিষ্ট সময়ে ঝাটকা ধরা, পরিবহন, বিক্রি ও আহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলেদের সহায়তা প্রদানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্ত সরকার পদক্ষেপ নিলেও তার যথাযথ প্রয়োগ চোখেপড়ার মতো নয়। জেলেরা ঝাটকা নিধন করে চলছে নির্ভয়ে নির্বগ্নে। কিন্তু শুধু আইন প্রণয়ন করলেই যথেষ্ট নয়—এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঝাটকা সংরক্ষণকে কেবল প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হওয়া প্রয়োজন। এখানে জেলে, ব্যবসায়ী, ভোক্তা—সবাইকে একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে। একজন জেলে যদি সচেতন হন, তিনি নিষিদ্ধ সময়ে আমাকে ধরবেন না। একজন ব্যবসায়ী যদি দায়িত্বশীল হন, তিনি আমাকে বিক্রি করবেন না। আর একজন ভোক্তা যদি সচেতন হন, তিনি আমাকে কিনে খাবেন না। এই সম্মিলিত উদ্যোগই পারে আপনাদের জাতীয় সম্পদকে রক্ষা করতে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির সম্পদ আসীম নয়। আমরা যদি তা অযথা ও অদূরদর্শিতার সঙ্গে ব্যবহার করি, তাহলে একসময় তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। আজ যদি আমরা ঝাটকাকে রক্ষা না করি, তাহলে আগামী দিনে ইলিশের ঘাটতি দেখা দেবে। এতে শুধু খাদ্য নয়, দেশের অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের সামান্য সচেতনতা ও দায়িত্ববোধই পারে এই অমূল্য সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে।লোভ মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, কিন্তু এই লোভই অনেক সময় আমাদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাময়িক লাভের জন্য যদি আমরা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির পথে হাঁটি, তাহলে তা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং আমাদের উচিত সংযমী হওয়া, ধৈর্য ধরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করা।
আমাকে বড় হতে দিন—এটি শুধু একটি অনুরোধ নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। আপনি যদি একজন জেলে হন, নিষিদ্ধ সময়ে আমাকে ধরবেন না। আপনি যদি ব্যবসায়ী হন, আমাকে বিক্রি করবেন না। আপনি যদি ভোক্তা হন, আমাকে কিনে খাবেন না। কারণ আপনি যখন আমাকে রক্ষা করবেন, তখন আপনি নিজের ভবিষ্যৎকেই সুরক্ষিত করবেন।
আমি ছোট, কিন্তু আমার গুরুত্ব অনেক বড়। আমি একটি সম্ভাবনা, একটি প্রতিশ্রুতি, একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আমাকে যদি এখনই ধ্বংস করা হয়, তাহলে সেই ভবিষ্যৎও অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি—ঝাটকা ধরবো না, কিনবো না, খাবো না। সরকারের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলবো এবং অন্যদেরও সচেতন করবো।আমি ঝাটকা—আমাকে বাঁচান। আমি বড় হবো, আমি আপনাদের জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবো।
আমার জীবন বাঁচানো মানেই আপনাদের দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। ঝাটকা বাঁচলে ইলিশ বাড়বে, ইলিশ বাড়লে দেশ সমৃদ্ধ হবে। শেষে আবারও বলছি—লোভে পড়ে নিজেদের ক্ষতি করবেন না। আমাকে বড় হতে দিন। ঝাটকা রক্ষার অভিযান সফল না হলে শুধু ঝাটকা কিংবা ইলিশই ক্ষতিগ্রস্থ হবে না, ক্ষতিগ্রস্থ হবে দেশের আমিষের পুষ্টিপূরণ, দেশের অর্থনীতি, সরকারের ঝাটকা রক্ষার কর্মসূচি. পরিকল্পনা, সেই সাথে বরাদ্ধকৃত অর্থের অপচয়, আমাদের নৈতিকতা, সততা ও দায়বদ্ধতা।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com







































