
উপরে সংযুক্ত ছবিদুটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ছায়াপথের (Milky Way) কল্পিত ছবি। ছায়াপথ, আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে একটি সর্পিল গ্যালাক্সি। উল্লেখ্য অনেক মানুষ Galaxy শব্দের অর্থ ছায়াপথ বলে (যেমন মোটর সাইকেলকে হোন্ডা) এটা ভুল। বাঙলায় প্রচুর বিদেশি শব্দের ব্যবহার আছে, তদ্রূপ গ্যালাক্সির বাঙলা অর্থ ছায়াপথ নয় বরং গ্যালাক্সি। ছায়াপথ মাত্র একটা গ্যালাক্সির নাম। এর নিকটতম গ্যালাক্সির নাম এন্ড্রোমিডা। নিচে ছায়াপথের ছবিদুটোর একটিতে পৃথিবীর অবস্থান অব্যক্ত রয়েছে। বিষয়টির ওপর এখন আলোকপাত করছি:
মহাবিশ্ব অগণিত গ্যালক্সির সমন্বিত রূপ। গ্যালাক্সিগুলো ঝাঁক বেঁধে ক্রমবর্ধমান এক সমতলে আবর্তন করছে। এই সমতলের নাম স্থানকাল বা ম্যাট্রিক্স। সৌরজগতের কেন্দ্রে সূর্য নামক মাঝারী মাপের হলুদ নক্ষত্র কেন্দ্র করে আটটি গ্রহ আবর্তন করছে। পৃথিবী সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ। ছায়াপথ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থানরত সেজিটারিয়াস-এ* নামক সুপার ম্যাসিভ ব্লাকহোলকে কেন্দ্র করে সূর্য প্রতি ২২.৫ থেকে ২৫ কোটি বছরে একবার ঘুরে আসে। সাথে থাকে এর পরিবার, যাকে আমরা সৌরজগত বলে অভিহিত করেছি। জন্মের পর থেকে আজ অব্দি সূর্য ২০/ ২৫-বারের বেশি কেন্দ্র (Segittarius-A*) প্রদক্ষিণ করতে পারেনি।
ধারণা করা হয়, মোটামুটি ৩০ হাজার কোটি নক্ষত্র ছায়াপথে বিরাজ করছে। সূর্য একটি দ্বিতীয় প্রজন্মের নক্ষত্র। বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, গ্রহাণুপুঞ্জ (Asteroid belt), বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন, বামন গ্রহ প্লুটো ছাড়াও বিভিন্ন গ্রহ কেন্দ্রিক চাঁদের মতো অসংখ্য উপগ্রহ, ধুমকেতু এবং বিক্ষিপ্ত ভগ্নাংশ (Debris) নিয়ে সৌরজগত গঠিত। সৌরজগতের নিকটতম বেষ্টনীর নাম কাইপার বেল্ট। এর আরও পরে রয়েছে Oort Cloud-এর বেষ্টনী। সূর্য থেকে ওর্ট ক্লাউডের দূরত্ব ২০০০ থেকে ৫০০০ (Astronomical units – AU) মহাজাগতিক একক। প্রায় এক আলোকবর্ষ অঞ্চলজুড়ে এর বিস্তৃতি। তারপর কেবল শূন্যস্থান এবং আরও পরে সূর্যের নিকটতম প্রতিবেশী আলফা সেন্টোরি তিন তারাবিশিষ্ট বাইনারি নক্ষত্রজগত। এদের মধ্যে সবচে’ ছোট তারাটির নাম প্রক্সিমা সেন্টোরি বা আলফা-৩। প্রক্সিমা সূর্যের সবচে’ কাছের নক্ষত্র। (সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বকে এক AU বলা হয় এবং শূন্যস্থানে এক বছরে আলো যতটুকু পথ পাড়ি দিতে পারে, সেটাই আলোকবর্ষ)।
প্রতিবেশী নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টোরির দূরত্ব সূর্য থেকে ৪.২৩ আলোকবর্ষ। অর্থাৎ কোনও বস্তু আলোর গতিতে ভ্রমণ করলে সেখানে পৌঁছাতে ৪.২৩-বছর লাগবে! প্রক্সিমারও নিজস্ব জগত আছে। যেখানে ২০২২-সাল পর্যন্ত তিনটি গ্রহের সন্ধান মিলেছে। এভাবে হয়তো প্রতিটি নক্ষত্রের নিজস্ব জগত আছে। দূরত্বের কারণে অসৌরীয় গ্রহ (Exoplanet) কোন কোন নক্ষত্রের সাথে আছে, শনাক্ত করা কঠিন।
সম্প্রতি নাসার গবেষকগণ বলেছেন, ছায়াপথে ৬০ বিলিয়নের কমবেশি পৃথিবীসদৃশ বাসযোগ্য গ্রহ থাকতে পারে। তাইলে বাসের অযোগ্য গ্রহের সংখ্যা কতো, হিসাব মেলানো যায় না! ছায়াপথের মতো অগণিত গ্যালাক্সি মহাবিশ্বে ভ্রমণ করছে! এখানে বলে রাখা ভালো যে, পৃথিবী এমনকি পুরো সৌরজগত অস্তিত্বহীন হলেও ছায়াপথ গ্যালাক্সি বহাল তবিয়তে থাকতে পারে।
ছায়াপথের ব্যাসার্ধ ১ থেকে ১.২০-লক্ষ আলোকবর্ষ। পৃথিবী এর তুলনায় সমুদ্রের পাড়ে একটি বালুকণার চেয়েও সূক্ষ্ম। আবার ছায়াপথের আকার মহাবিশ্বের বিশালত্বের তুলনায় বালুকণার চেয়েও কম। ছায়াপথের জন্ম না হলেও বিগ ব্যাং থেকে শুরু হওয়া এই মহাবিশ্বের স্থানকালে কোনও ক্ষত সৃষ্টি হতো না! একফোঁটা জল উবে গেলে সমুদ্রের বিশালতায় কতটুকুই বা ছেদ পড়ে! এটাই জগতের বাস্তবতা! উপরে ছায়াপথের প্রতিচ্ছবি দুটো এ কথার নিত্যতা প্রকাশ করে। একটিতে সৌরজগত আছে, অন্যটিতে নাই। কিন্তু ছায়াপথের অবস্থান অক্ষত রয়েছে।
এতো ক্ষুদ্রতায় অবস্থান করেও শ্রেষ্ঠ দাবী করার মতো অপরিণত চিন্তা, বোধ হয় আর হয় না। দুনিয়ায় কেবল মানবজাতি নিজেদের সেরা দাবি করে। এ দাবির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ কে করবে?! কিন্তু জগতে সে কত যে তুচ্ছ এ উপলব্ধি তাদের নাই! বস্তুত কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নাই বলে মানুষ পৃথিবী দাপীয়ে বেড়াচ্ছে এবং যাচ্ছেতাই করছে। কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী না-পেয়ে তারা নিজেদের মধ্যে হানাহানির নিয়ম করে নিয়েছে। যুদ্ধ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি হানাহানি নিয়মের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। মানুষ ছাড়া একাজ পৃথিবীতে বসববাসকারী অন্যান্য প্রজাতি করে না। অনাদিকাল থেকে মানবজাতি নিজেদের মাঝে যুদ্ধাবস্থা অনিবার্য করে রেখেছে— তাই মানুষের ইতিহাস রচিত হয় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে!
প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ বা যুদ্ধের প্রস্তুতি বজায় রাখা মানুষ সবচে’ বড় কাজ মনে করে! একটি জাতির রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং ভৌগোলিক সীমা রক্ষার জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতির বিকল্প কী হতে পারে, তা নিয়ে কেউ কখনও ভাবেনি! কিন্তু দুনিয়ার সকল নেতার সম্মিলিত ইচ্ছায় বিশ্বব্যাপী সকল প্রকার যুদ্ধ এবং এর প্রস্তুতি চিরবিদায় নিতে পারে— এরকম ইতিহাস যে নাই, তাও না। নইলে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বন্ধ হতো না। ১৯২০-সালে প্রথম মহাযুদ্ধের ভয়াবহতার পর বিশ্ব নেতারা জাতিপুঞ্জ গঠন করে। হয়তো তারা মনে করেছিলো এ সংস্থা ভবিষ্যৎ যুদ্ধ বন্ধ হতে ভূমিকা রাখবে। তবে যুদ্ধমুক্ত দুনিয়া গড়তে যুদ্ধংদেহি মনোভাব এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি আগে বন্ধ হওয়া দরকার, জাতিপুঞ্জ তা করতে ব্যর্থ হয়েছিলো। তাই মাত্র পঁচিশ বছর না-যেতেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়। অতঃপর বিশ্ব নেতারা মিলে ১৯৪৫-সালে জাতিপুঞ্জের নাম বদলে জাতিসংঘ (United Nations) গঠন করে। কিন্তু নাম বদলের দ্বারা মারণাস্ত্রের উৎপাদন বন্ধ হয়নি। বরং সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী নিউক্লিয়ার বোমার উৎপাদন বেড়েই চলছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিরোসিমা, নাগাসাকিতে ব্যবহৃত পরমাণু বোমার তুলনায় বর্তমানের বোমাগুলো অন্তত ১৫০০-গুণ বেশি শক্তিশালী করা হয়েছে!
বস্তুত জাতিসংঘ একটি অকার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে আজকাল। আর তা করে রেখেছে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধে সক্ষমতা দেখাতে পারলে, ইতোমধ্যে দুনিয়ার সকল প্রকার যুদ্ধাস্ত্র যাদুঘরে ঠাঁই পেতো। কিন্তু কিসের উন্মত্ততার ফলশ্রুতিস্বরূপ পৃথিবী থেকে যুদ্ধংদেহি অবস্থা দূর হয় না, এ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না পাওয়া গেলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, যুদ্ধ ও এর প্রস্তুতি নৃপতিদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একমাত্র কৌশল। এ কৌশল বাস্তবায়নে নেতারা যাকে-যখন-যেভাবে প্রয়োজন ব্যবহার করেছে। যে নেতাদের কথা অগ্রাহ্য করেছে, তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
বিজ্ঞানী ওপেনহেইমারের হাত ধরে আমেরিকায় পরমাণু বোমা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিলো। এদিয়ে জাপান যে পরিমাণ ধ্বংসের মুখে পড়ে, তা দেখে তিনি পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। কিন্তু তখনকার যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাঁর এমন সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নেয়নি। বরং হাইড্রোজেন বোমা প্রকল্পের দায়িত্ব বুঝে নিতে তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করে। তিনি তা নাকচ করে দিলে, প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করে। তিনি সে যাত্রায় জানে বেঁচে যান। কিন্তু তাঁর অবসর ও মামলা থেকে অব্যাহতি দৌলতে মানবতার আদৌ কল্যাণকর কিছু হয়নি। কেননা যুক্তরাষ্ট্র হাইড্রোজেন বোমা প্রকল্প থেকে কখনও সরে আসেনি! বরং ওপেনহেইমারের শিষ্যদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশি বেতনের ফাঁদে ফেলানো হয়। অতঃপর তারাই এ প্রকল্প এগিয়ে নেয়। আসলে রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তি গুরুত্বহীন। ওপেনহেইমানের ক্ষেত্রে যা সত্য হয়েছিলো।
আদিমযুগ, মধ্যযুগ, আধুনিকযুগ ও সমসাময়িকযুগ, কোনোযুগেই নৃপতিরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা থেকে বিরত থাকেনি। আর ভবিষ্যতেও এরা মানুষ এর জন্য, মানবতার পক্ষে ভালো কিছু করবে নিশ্চয়তা নাই। এ খেলায় তাদের লাভ হলেও মানবজাতির জন্য যুদ্ধ সবকালেই ভয়াবহ। মনে হয় এসব ক্ষতিকর লোক জন্ম না-হলে মানবজাতি ভালো থাকতো। অন্তত পৃথিবী টিকে থাকার সময়টা দীর্ঘায়ত হতো।
মানবজাতি নিজেদের বিরাট জ্ঞানী মনে করে। অথচ উদ্বাহু অহংবোধ, পরশ্রীকাতরতা, সম্পদ পুঞ্জীভূত করার উদাগ্র বাসনা, অজ্ঞানতা, অন্ধ জাতীয়তাবাদ ও ধর্মান্ধতা থেকে আজও এরা বেড়িয়ে আসতে পারেনি। বস্তুত এসব ক্ষতিকর প্রবণতায় প্রভাবিত হয়ে মানবজাতি পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে না; জিইয়ে রাখে! আর নেতারা সর্বদা যুদ্ধের পক্ষে জনগণকে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু জনগণ যুদ্ধের ক্ষতিকর দিক বাস্তবে যখন টের পায়, তখন কিছু করার থাকে না। দেশ, জাতি ও গোষ্ঠিগত দ্বন্দ্বকে চরম ভাবাপন্ন করার কারিগর হলো নেতারা। সুতরাং এদের কুপরামর্শ এড়িয়ে চলা সাধারণ মানুষের কর্তব্য হওয়া উচিৎ ছিল। তাইলে হয়তো পৃথিবীতে যুদ্ধের বদলে শান্তি স্থায়ী হতো।
অথচ কারও চিন্তা নাই। মানবজাতির যন্ত্রকৌশলের উন্নতির সাথে দায়িত্ববোধেরও যদি উন্নতি হতো, তবে পৃথিবী আজ কল্পিত স্বর্গলোকে পরিণত হতো। কিন্তু তা হয়নি মানুষের যুদ্ধের মতো আত্মঘাতী মনোভাবের কারণে। আর মানুষের দাবি সে নাকি সৃষ্টির সেরা! নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবনাহীন প্রজাতি নাকি সৃষ্টির সেরা, নিজের সাথে নিজের কী নিঠুর রসিকতা!
পৃথিবী মহাবিশ্বে কী স্বল্পস্থান জুড়ে বিরাজ করছে। পৃথিবীর তুলনায় মানুষ কতো ক্ষুদ্র! পুরো মানবজাতি পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলে ধ্বংসের পরদিনও যথারীতি সূর্যোদয়, সূর্যাস্তসহ যাবতীয় প্রাকৃতিক ঘটনাবলি অব্যাহত থাকবে। বাস্তবতা যদি এমন হয়, তবে কিসের এতো শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই?!
পরিশেষে, পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে যারা নিজেদের জন্য ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম জারি রাখা বিজ্ঞান মনে করে, তারা অন্তত শ্রেষ্ঠজীব নয়। বরং আত্মঘাতী এবং অপরিণামদর্শিতার (Ruthless) নমুনা!







































