মাশরাফি বিন মর্ত্তুজা, নিখুত হাতে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছেন। তার কুশলী কবজি একটা সাধারণ মানের দলকে দিয়েছে শক্ত গ্রাউন্ড, তার দুই পায়ের উপর ভর করে প্রতিপক্ষের সামনে দেয়াল তুলে দিতো বাংলাদেশ জাতীয় দল। মাথা উচু করে দাড়াতে তার মনের দৃঢ়তা শক্তি দিয়েছে সতীর্থ খেলোয়ারদের। সেই মাশরাফি এখন ভাঙা মন নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করছেন, এক সময় দেশের সব মানুষের প্রত্যাসার ভাড় একা কাঁদে বহন করেছেন, এখন নিজেকে বহন করতেই হিমসিম খাচ্ছেন প্রিয় ভুবন কাঁপানো স্পিনার।
কোন অপরাদের মূল্য দিলেন আশরাফি? আওয়ামী-লীগ করা তার অপরাধ? নাকি ছাত্রদের পক্ষে রাস্তায় না নামা অপরাধ? যদি তাদের পক্ষে না থাকাটাই অপরাধ হিসাবে ধরা হয় তবে সেটা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে? কারণ সে তখন সরকারের পক্ষে সংসদে একজন কর্মকর্তা, আর আন্দোলন হয়েছে সেই সরকারের বিরুদ্ধে সেহেতু আমরা বুঝতে পারছি তার আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়া কঠিন ছিলো। তবে আমরা মনে করি জনতার ডাকে সাড়া দিয়ে তার সংসদ পদ ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় নামা উচিত ছিলো। জনতার ডাক উপেক্ষা করা তার ঠিক হয়নি।
একই সাথে তার বিরুদ্ধে আর একটা অভিযোগ পাওয়া যায় তিনি নড়াইলের বেশ কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরাসরি প্রভাব খাটিয়ে তার গনীষ্ঠজনদের বিভিন্ন পদে নির্বাচিত করে নিয়েছেন। তার প্রতি মানুষের এটাও ক্ষোভের একটা কারণ হিসেবে দেখছেন এলাকাবাসী। তার বাবাসহ বেশ কয়েকজন নিকট আত্বীয়দের বিরুদ্ধেও অন্যায় আচরণের অভিযোগ আছে, সেই ক্ষোভও মাশরাফির বাড়ি ভাংচুর করে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়র পিছনে অনুঘটকের কাজ করেছে।
ক্রিকেটার হিসাবে তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজনীতির মাঠ চষে বেড়ানো মাশরাফি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টিকিটে নড়াইল-২ আসনে নির্বাচন করেন এই তারকা। সর্বদলের মাশরাফি নির্দিষ্ট এক দলে যুক্ত হয়ে যাওয়াটা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেনি মাশরাফির অন্য দলের সাথে যুক্ত ভক্তরা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মাশরাফি নড়াইল জেলার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ নিয়ে নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। তখনও নড়াইলে বেশ জনপ্রিয় ছিল মাশরাফি। এ পর্যন্ত সবকিছুই মোটামুটি ভাবে ছিলো সহনশীল পর্যায়ে। কিন্ত এরপর যখনই তার ঘনিষ্ঠজন ক্ষমতার পদগুলো দখল নিতে শুরু করলে তারও জনপ্রিয়তায় ধস নামতে শুরু করে।
মাশরাফির বিরুদ্ধে অর্থ কেলেংকারিসহ অন্য কোন ধরনের অভিযোগ না থাকলেও তারা বাবা গোলাম মর্ত্তুজা স্বপন, চাচা শশুর ফয়জুল হক রোম, ভাইরা ভাই টিপু সুলতানসহ বেশ কয়েকজন নিকট আত্বীয়দের বিরুদ্ধে জমিদখল, টেন্ডারবাজি, টাকার বিনিময়ে শালিস করাসহ বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। আর এই সকল কারনেই দিন দিন জনপ্রিয়তার প্রায় শুন্যের কোঠায় নেমে যায় মাশরাফি। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় অনেকে ভয়ে কিছু বলতে না পারলেও সম্প্রতি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পাশা উল্টে যায়। তার নিরব ভূমিকার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হন তিনি। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে বিক্ষুদ্ধ হয় জনতা সব ক্ষোভ উগ্রে দিয়েছে মাশরাফির বাড়ির উপরে। সেই ক্ষোভের আগুনে পুড়ে যায় তার ডুপ্লেক্স বাড়ি।
নড়াইল শহরের মহিষখোলা এলাকায় মাশরাফির ডুপ্লেক্স বাড়িটি এক সময় দর্শনীয় স্থান ছিলো। এখনও দর্শনীয় স্থান, তবে তা সৌন্দর্যের জন্য না হিংসার আগুনে ঝলসানোর পরে কেমন হয়েছে তা দেখার জন্য।
প্রশ্ন হলো ক্ষোভ থেকেই যদি আগুন দেয়া হয়, তবে লুট হলো কেন আগুন দেয়ার আগে?
সবাই তার প্রতি ক্ষিপ্ত তা নয়, অনেকেই দিনভর পাহাড়া দিয়ে তার বাড়ি রক্ষা করেছে। কিন্তু সন্ধ্যায় যখন তারা নির্ভার মনে নিজেদের বাড়ি চলে গিয়েছেন তখনই একদল হামলাকারী বাড়ি ঘিরে ধরে প্রথমে নিজেদের চাহিদা মত আসবাব, ট্রফি এবং যে যা পেরেছেন লুট করে বাড়িতে আগুন দিয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছিলো।
সময়কে ধারণ না করবার ভুলে স্বপ্নের মতো এক বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছাই করে দেয় এই জাতীয় তারকাকে। চোখের পলকে সারা জীবনে অর্জন হারিয়ে লজ্জায় নুয়ে পরেছেন ২২ গজ কাপানো মহা-নায়ক।

























































