আমাদের দেশে শিক্ষক নির্যাতন ও শিক্ষক হত্যার ইতিহাস দুঃখজনকভাবে দীর্ঘ, বেদনাবিধুর এবং উদ্বেগজনক। একসময় যা ছিল বিরল ও সমাজকে শিউরে তোলার মতো ঘটনা, আজ তা যেন ধীরে ধীরে নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষকের ওপর আঘাত, প্রকাশ্য অপমান কিংবা নির্মম হত্যার সংবাদ এখন আর সমাজকে তেমনভাবে নাড়া দেয় না—এটাই সবচেয়ে ভয়ের বিষয়। পৃথিবীর অন্য কোনো স্বাধীন দেশে শিক্ষক হত্যা ও নির্যাতনের এমন ধারাবাহিক ও অহরহ দৃষ্টান্ত দেখা যায় কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় থেকেই যায়।
একটি রাষ্ট্রের মানসিক ও নৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের কীভাবে দেখে, কতটা সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়—তার মাধ্যমে। শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের পাঠদাতা নন; তিনি সমাজের বিবেক নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর। অথচ আমাদের দেশের বাস্তবতায় সেই শিক্ষক সমাজই আজ সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়—শিক্ষার কোনো স্তরই এই সহিংসতার বাইরে নয়। কোথাও শিক্ষককে মারধর করা হচ্ছে, কোথাও প্রকাশ্যে অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে, আবার কোথাও জীবন দিতে হচ্ছে নির্মম হামলায়।
এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সম্মিলিত ফল। শিক্ষক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার পর আমরা প্রায় একই চিত্র দেখি—সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, সাময়িক ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা যায়, মানববন্ধন ও বিবৃতি আসে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু থেমে যায়। বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে, তদন্তে গাফিলতি দেখা দেয়, অপরাধীরা রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। এর ফলে সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—শিক্ষকের ওপর সহিংসতা করলেও শাস্তি নাও হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে—শ্রেণিকক্ষে পাঠদানরত শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে, কোথাও পরীক্ষার ফল বা শাসনকে কেন্দ্র করে শিক্ষককে মারধর করা হয়েছে, আবার কখনো স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রের দ্বন্দ্বে—শিক্ষকরা নিয়মিত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, আবার কোথাও শিক্ষককে প্রাণ দিতে হয়েছে নির্মম হামলার ঘটনা একাধিকবার জাতীয় শিরোনাম হয়েছে—যার অধিকাংশই আজও বিচারিক নিষ্পত্তির বাইরে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই শিক্ষক নির্যাতনকে কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। শিক্ষকরা আজ অনেক ক্ষেত্রেই ভয় ও আত্মসংযমের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সত্য বলা, অনিয়মের প্রতিবাদ করা কিংবা ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া—এসবই যেন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানের ওপর। যে শিক্ষক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তিনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে বা শিক্ষার্থীদের মুক্তবুদ্ধির চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে পারেন না—এটি অনস্বীকার্য।
আরও গভীরভাবে ভাবার বিষয় হলো—শিক্ষক নির্যাতনে জড়িত অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের ‘সত্যপ্রেমিক’, ‘দেশপ্রেমিক’ কিংবা ‘ন্যায়পরায়ণ’ বলে দাবি করে থাকেন। বাস্তবে এই দাবি এক ধরনের ভণ্ডামিরই বহিঃপ্রকাশ। কারণ প্রকৃত দেশপ্রেম ও ন্যায়পরায়ণতার প্রকাশ হওয়ার কথা ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে, লুটপাট ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে, প্রশাসনিক অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে। অথচ আমাদের সমাজে ভেজাল খাদ্য ও ভেজাল ওষুধ নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও বলাৎকার নিয়মিত শিরোনাম হচ্ছে, শ্রমিকেরা বছরের পর বছর বকেয়া মজুরির জন্য আন্দোলন করতে বাধ্য হচ্ছেন—এসব গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে তথাকথিত নৈতিকতার ধারকদের অবস্থান প্রায়ই অস্পষ্ট বা নীরব। বরং দেখা যায়, শিক্ষক—যিনি নিরস্ত্র, ক্ষমতাহীন এবং তুলনামূলকভাবে সহজ লক্ষ্য—তাঁর ওপর আঘাত হানতে তারা দ্বিধা করেন না। এতে স্পষ্ট হয়, শিক্ষক নির্যাতন কোনো আদর্শিক বা নৈতিক লড়াই নয়; এটি ক্ষমতার দম্ভ, রাজনৈতিক প্রশ্রয় এবং দায়মুক্তির সুযোগ নেওয়ার প্রবণতার নগ্ন প্রকাশ। আশ্চর্যের বিষয় হলো—যাঁরা শিক্ষক নির্যাতনে জড়িত, তাঁদের অনেকেই নিজেদের সমাজরক্ষক বা নৈতিকতার ধারক হিসেবে পরিচয় দিতে চান; অথচ ভেজাল, দখলদারত্ব কিংবা নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান রহস্যজনকভাবে নীরব।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার কথা বলে। শিক্ষকও সেই নাগরিক। শুধু আইন প্রণয়ন করাই রাষ্ট্রের শেষ দায়িত্ব নয়; আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য। শিক্ষক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এই সহিংসতা বন্ধ হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বহিরাগতদের প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রের দ্বন্দ্ব বা স্বার্থসংঘাতের বলি হচ্ছেন শিক্ষকরা। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের নিরাপদ পরিসর।
আমরা প্রায়ই বলি, শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। কিন্তু বাস্তবে যদি শিক্ষক নিরাপদ না থাকেন, যদি তাঁকে বারবার অপমান , সহিংসতার শিকার হতে হয়, তাঁকে জীবনসংকটে পড়তে হয়, তবে এই বক্তব্য কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। একটি রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের যেভাবে দেখে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও শিক্ষা ও মূল্যবোধকে সেভাবেই দেখবে। শিক্ষক নির্যাতন কোনো একক পেশাজীবী গোষ্ঠীর সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক নৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন।
যে রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজ গড়তে পারবে না। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিক্ষক নির্যাতনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙা এবং শিক্ষক সমাজের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হতে হবে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। অন্যথায় আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোব, যেখানে জ্ঞান নয়—ভয়ই হবে শিক্ষার প্রধান অনুষঙ্গ। যা কোনোভাবেই একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com


























































