
কেন পিতা-মাতার জন্য বৃদ্ধাশ্রম, আর দায়িত্বের জন্য আইন?
একদিন যে হাতটি সন্তানের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, সেই হাতই একদিন বার্ধক্যের কাঁপুনিতে একটি লাঠি খোঁজে। যে চোখ সন্তানের জ্বরের রাতে ঘুম হারিয়েছিল, সেই চোখই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে সন্তান আসবে কি না।
প্রশ্ন হলো—কেন?
কেন এমন একটি পৃথিবী তৈরি হলো, যেখানে সন্তানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা পিতা-মাতাকে জীবনের শেষ অধ্যায়ে বৃদ্ধাশ্রমের আশ্রয় নিতে হয়? কেন এমন একটি সমাজ তৈরি হলো, যেখানে সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে আইন করতে হয়?
যে দায়িত্ব একদিন ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার স্বাভাবিক ভাষা ছিল, আজ সেটি কেন আইনের ভাষায় লিখতে হচ্ছে?
এই প্রশ্ন কোন একক পরিবারের নয়। এটি আমাদের পরিবার, শিক্ষা, সমাজ এবং সভ্যতার সামনে দাঁড় করানো এক নির্মম আয়না।
আইন প্রয়োজন কিন্তু কেন প্রয়োজন?
অধিকার লঙ্ঘিত হলে আইন অবশ্যই প্রয়োজন। অসহায় পিতা-মাতাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব দিয়েছে। আইনে খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং সঙ্গ দেওয়ার মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে। আইনটি প্রয়োজনীয়, কিন্তু আইনের অস্তিত্ব আমাদের স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি অস্বস্তিতেও ফেলতে পারে। কারণ প্রশ্নটি থেকেই যায়
কেন একজন সন্তানকে আইন করে বলতে হবে-তোমার বাবা-মায়ের দায়িত্ব নাও?
আইন বলতে পারে, ভরণ-পোষণ করো, কিন্তু আইন কি বলতে পারে, মায়ের পাশে বসে একটু কথা বলো? আইন বলতে পারে, চিকিৎসার খরচ দাও, কিন্তু বাবার কাঁপা হাতে মমতার স্পর্শ দিতে কি আদালতের নির্দেশ লাগে? আইন দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে। দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে না। আর সেখানেই আমাদের আসল সংকট।
আমরা কি শিক্ষিত, নাকি শুধু শিক্ষিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি?
আজ ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো। সন্তান স্কুলে যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে, স্বাবলম্বী হচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেই একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে।
পৃথিবীকে আমরা যত কাছে এনেছি, কখনো কখনো কাছের মানুষগুলোকে তত দূরে সরিয়ে দিয়েছি।
আমরা সন্তানকে শিখিয়েছি কীভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হয়। কীভাবে ভালো চাকরি পেতে হয়। কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়। কীভাবে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে হয়। কিন্তু সবসময় শেখাতে পারিনি কীভাবে একজন ভালো মানুষ হতে হয়। শেখাতে পারিনি সাফল্যের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা কীভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। অধিকারের সঙ্গে দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হয়। স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে রক্ষা করতে হয়। আমাদের শিক্ষার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই।
আমরা মস্তিষ্ককে তথ্য দিয়ে ভরেছি; কিন্তু বিবেককে যথেষ্ট প্রশ্ন করতে শেখাইনি। শিক্ষা কি শুধু জীবিকার জন্য?
গতানুগতিক শিক্ষা আমাদের শেখায় কীভাবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। কীভাবে জীবিকা অর্জন করতে হয়। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ শুধু জীবিকা অর্জনের জন্য জন্মায়নি। তার একটি পেশা আছে, কিন্তু একটি বিবেকও আছে। তার কিছু অধিকার আছে, কিন্তু কিছু দায়িত্বও আছে। তার বর্তমান আছে, কিন্তু সেই বর্তমানের নিচে রয়েছে একটি অতীত। আর সেই অতীতের সবচেয়ে বড় নাম পিতা-মাতা। তাই শিক্ষার চূড়ান্ত পরীক্ষা সার্টিফিকেটে নয়-চরিত্রে।
একজন মানুষ কত বড় ডিগ্রি অর্জন করেছে, তা তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে। কিন্তু বৃদ্ধ মায়ের পাশে সে কতক্ষণ বসে থাকে সেটি তার মানবিকতার পরিচয় দেয়। ধর্মের শিক্ষা কোথায় হারিয়ে গেল? এখানে আমাদের নিজ নিজ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার কথাও নতুন করে ভাবতে হবে। এটি কোন একটি ধর্মের প্রশ্ন নয়। প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া, অন্যকে বিচার করার জন্য নয়, নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য। কারণ ধর্মীয় শিক্ষা শুধু উপাসনার পদ্ধতি শেখায় না; মানুষকে কৃতজ্ঞতা, সংযম, ন্যায়, দয়া, দায়িত্ব এবং মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্যের কথাও স্মরণ করায়। গতানুগতিক শিক্ষা শেখায় কীভাবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে-এই প্রতিষ্ঠার অর্থ কী? আমি যা অর্জন করছি, তা কীভাবে ব্যবহার করব? আমার সাফল্যের পথে কারা ত্যাগ করেছে? আমার ওপর কার অধিকার আছে? আমার কাজের নৈতিক পরিণতি কী? অতএব আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কথা নয়। একটি মানুষকে দক্ষ করে, অন্যটি তাকে দায়িত্বশীল হওয়ার কথা স্মরণ করায়। একটি জীবিকা গড়ে, অন্যটি জীবনকে অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষা যদি শুধু মুখস্থ কিছু বাক্য ও আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তার আত্মা হারিয়ে যায়। সন্তান যদি প্রার্থনা করতে শেখে, কিন্তু মায়ের চোখের জল দেখতে না শেখে, তবে শিক্ষার কোথাও একটি বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
এর জন্য সন্তান কি একাই দায়ী?
না। বরং এখানে আমাদের সবচেয়ে বেশি আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। সন্তান আত্মকেন্দ্রিক হয়ে জন্মায় না। সে প্রথমে পরিবারকে দেখে। তারপর সমাজকে দেখে। তারপর পৃথিবীকে চিনতে শেখে। সে দেখে বাবা-মা নিজেদের বাবা-মায়ের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করেন। দেখে প্রতিবেশীর বিপদে দরজা খোলা হয় কি না। দেখে অর্থের জন্য নীতি বিসর্জন দেওয়া হয় কি না। দেখে দুর্বল মানুষকে সম্মান করা হয় কি না। দেখে অন্যায় হলে প্রতিবাদ করা হয়, নাকি সুবিধার জন্য নীরব থাকা হয়। তাই শিশুর প্রথম পাঠ্যবই কোন বই নয়-তার পরিবার। তার প্রথম শিক্ষক কোন বিশ্ববিদ্যালয় নয়-তার বাবা-মা। তার প্রথম নৈতিক বিদ্যালয় কোন প্রতিষ্ঠান নয়-তার ঘর। আমরা সন্তানকে কী বলেছি, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে আমাদের কী করতে দেখেছে।
বৃদ্ধাশ্রম একটি ভবন নয়, একটি সামাজিক প্রশ্ন?
বৃদ্ধাশ্রমকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে আমরা এর গভীর অর্থ বুঝতে পারব না। বৃদ্ধাশ্রম আসলে আমাদের সমাজের একটি আয়না। সেখানে বসে থাকা একজন বৃদ্ধ মা যেন প্রশ্ন করেন-আমি কি তোমাকে শুধু বড় করেছি, নাকি মানুষও করেছি? একজন বৃদ্ধ বাবা যেন প্রশ্ন করেন-তোমার ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে আমার যে বর্তমানটুকু হারিয়ে গিয়েছিল, তার মূল্য তুমি কখনো বুঝেছ? তবে এটাও সত্য বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মানেই সন্তান নিষ্ঠুর, এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। বাস্তব জীবনে অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, পারিবারিক সংঘাত, নিরাপত্তা, প্রবাসজীবনসহ নানা জটিলতা রয়েছে। তাই বৃদ্ধাশ্রমকে অন্ধভাবে নিন্দা করা সমাধান নয়। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়
কেন এমন একটি সমাজ তৈরি হলো, যেখানে কখনো কখনো নিজের সন্তানের ঘরের চেয়ে একটি প্রতিষ্ঠান একজন বৃদ্ধ মানুষের কাছে বেশি নিরাপদ হয়ে ওঠে? বৃদ্ধাশ্রমের দরজা খোলার আগে কোন দরজাটি বন্ধ হয়েছিল?
সম্ভবত প্রথমে বন্ধ হয়েছিল কথোপকথনের দরজা, তারপর সহমর্মিতার, তারপর কৃতজ্ঞতার। তারপর পারিবারিক সময়ের। সবশেষে খুলেছে বৃদ্ধাশ্রমের দরজা। আমরা শেষ দৃশ্যটি দেখি, কিন্তু তার আগের দৃশ্যগুলো দেখি না। একটি সম্পর্ক সাধারণত একদিনে ভেঙে যায় না। অনেক সময় তার ভাঙন শুরু হয় একটি অবহেলা দিয়ে। একটি অপমান দিয়ে। একটি “আজ সময় নেই” দিয়ে, একটি ফোন না করা দিয়ে, একটি অসুস্থ শরীরের পাশে না বসা দিয়ে, তারপর একদিন দেখা যায়-ঘর আছে, কিন্তু ঘর নেই।
আমাদের আবার কী শিখতে হবে?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, আধুনিকতা থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু তার পাশে থাকতে হবে পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, মানবিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ। নিজ নিজ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মানবিক দিক। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্ব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-আত্মসমালোচনার শিক্ষা। সন্তানকে শুধু জিজ্ঞেস করা হবে না-পরীক্ষায় কত পেয়েছ? বরং কখনো জিজ্ঞেস করা হোক-আজ তুমি কাকে সাহায্য করেছ? আজ তুমি কার কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করেছ? আজ তুমি তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলেছ? আজ তুমি নিজের কোন ভুল স্বীকার করেছ? তখন হয়তো শিক্ষার সংজ্ঞাই বদলে যাবে। শেষ প্রশ্নটি তাই আমাদের সবার জন্য
কেন বৃদ্ধাশ্রম?
কেন আইন?
কেন আদালত?
কেন একজন পিতা-মাতার অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রকে বলতে হবে সন্তান, তোমার দায়িত্ব পালন করো?
কোথায় হারিয়ে গেল সেই শিক্ষা, যা একসময় আইন ছাড়াই মানুষকে দায়িত্বশীল করত?
উত্তর শুধু সন্তানদের মধ্যে খুঁজলে হবে না। উত্তর খুঁজতে হবে পরিবারে, বিদ্যালয়ে, সমাজে, আমাদের সংস্কৃতিতে, আমাদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় এবং সবচেয়ে বেশি-নিজেদের মধ্যে। কারণ জাতির উন্নতি শুধু মাথাপিছু আয় দিয়ে মাপা যায় না। পরিবারের উন্নতি শুধু বড় বাড়ি দিয়ে মাপা যায় না। শিক্ষার উন্নতি শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে মাপা যায় না। সভ্যতার উন্নতি মাপা যায় তার দুর্বল মানুষের সঙ্গে সে কেমন আচরণ করে, তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার চোখে কতটা নিরাপত্তা আছে, এবং তার সন্তানরা কতটা মানুষ হয়ে উঠেছে-তা দিয়ে। আমরা এমন শিক্ষা চাই না, যা শুধু সন্তানকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করবে। আমরা এমন শিক্ষা চাই, যা তাকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তার শিকড়ের দিকে ফিরিয়ে দেবে। যে শিক্ষা বলবে-তুমি যত ওপরে উঠবে, তত গভীরে তোমার শিকড়কে মনে রেখো। কারণ শিকড় শুকিয়ে গেলে বৃক্ষ যতই উঁচু হোক, তার পতন অনিবার্য। আর আমাদের সমাজের শিকড় হলো-পরিবার, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ। আইন থাকবে অসহায় পিতা-মাতার শেষ আশ্রয় হিসেবে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে আইন শেষ প্রহরী হতে পারে, প্রথম শিক্ষক নয়। যেখানে সন্তান পিতা-মাতার পাশে থাকবে শাস্তির ভয়ে নয়-কৃতজ্ঞতার কারণে। দায়িত্বের চাপে নয়-ভালোবাসার টানে। সেদিন হয়তো বৃদ্ধাশ্রম থাকবে, কিন্তু তা আর সন্তানের অবহেলার প্রতীক হবে না। আইন থাকবে, কিন্তু তার প্রয়োজন কমে আসবে। আর কোন এক সন্ধ্যায় বৃদ্ধ মা দরজার দিকে তাকিয়ে থাকবেন না সন্তান আসবে কি না। দরজা খুলে সন্তান নিজেই বলবে-মা, আমি এসেছি। সেই একটি বাক্যের জন্য কোন আদালতের রায় লাগে না, লাগে শুধু একটি শিক্ষিত হৃদয়। যে সমাজে পিতা-মাতার শেষ বয়সটি সন্তানের ঘরেই নিরাপদ, সে সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অর্থনীতি নয়, তার বিবেক। সেই বিবেকটিই আমাদের আবার জাগাতে হবে।





















































