নর্থ আটলান্টিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, যেটি সংক্ষেপে ন্যাটো (NATO) হিসেবে বহুল আলোচিত এবং পরিচিত, সেই ন্যাটো চুক্তির বহুল আলোচিত একটি শর্ত যা চুক্তির ৫ ধারায় লিপিবদ্ধ আছে যেখানে বলা হয়েছে, “চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর কোনো একটি শত্রুর দ্বারা আক্রমণের শিকার হলে ন্যাটোভূক্ত প্রতিটি দেশ আক্রান্ত হয়েছে বলে গণ্য করা হবে এবং ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিবে।
সম্মিলিত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়ে ন্যাটোভূক্ত রাষ্ট্রগুলো জোটবদ্ধ হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষা কল্পে যে অসাধারণ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলো, তা বিরল একটি চুক্তি।
সবল, দূর্বল, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো বহি:শক্তির আক্রমণ থেকে একে অপরকে রক্ষা করার জন্য লক্ষ্য স্হির করে চুক্তি স্বাক্ষর করায় ন্যাটো বিশ্বে একটি শক্তিশালী সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্হার আওতায় রয়েছে বিধায় ওই চুক্তিভূক্ত দেশগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্বের নিরাপত্তায় আত্মবিশ্বাসী এবং নিরাপদ মনে করে। ন্যাটো চুক্তির বহুল আলোচিত ৫ ধারার কারণে ন্যাটো জোটকে একটি শক্তিশালী জোট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যৌথ নিরাপত্তার এই ধারণাটি ইতিপূর্বে বা এর পরবর্তীতে কোনো রাষ্ট্রসমূহ গ্রহণ করেনি। তবে অতি সম্প্রতি এশিয়ার তথা মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার তিনটি রাষ্ট্র,– সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত ও রক্ষার জন্য, বিদেশি আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ নিজ নিজ দেশের পক্ষে মক্কায় ওই চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যেটি, “মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি” হিসেবে পরিচিত, -যাকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে কৌশলেগত মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মাধ্যমে তিনটি মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ত্রিদেশীয় নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হয়েছে। সুতরাং ইসলামের পবিত্রতম শহরে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি প্রতিরোধ ব্যবস্হা। আধুনিক যুগে এই প্রথমবার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তির তিনটি নির্দিষ্ট মেরু -আর্থিক, সামরিক ও জনসংখ্যাগত বৃহৎ তিনটি রাষ্ট্র একক প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে একত্রিত হয়েছে, যা গভীর তাৎপর্য বহন করে সংঘাতপূর্ণ বিশ্বব্যবস্হায়।
এই চুক্তি বিশ্বে বহুল আলোচিত হয়ে ওঠেছে এই কারণে যে, ন্যাটো চুক্তির অনুকরণে ত্রিদেশীয় ওই চুক্তিতে ন্যাটোর ৫ অনুচ্ছেদের অনুরূপ একটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করে বলা হয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরকারী কোনো রাষ্ট্র বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রমণের শিকার হলে চুক্তিভূক্ত তিনটি দেশ আক্রান্ত হয়েছে বলে গণ্য করে সম্মিলিত ভাবে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিবে। বিশ্লেষকরা এই প্রতিরক্ষা জোটকে ‘ইসলামিক ন্যাটো” হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান স্পষ্ট করে বলেেছেন, কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এই জোট গঠিত হয়নি। বরং এই তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্হিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য এই ত্রিদেশীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে–বলেছেন তুর্কির কমিউনিকেশন ডাইরেক্টর বোরহানেত্তিন ডুরান।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ চুক্তি স্বাক্ষরের একদিন পরেই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে তাদের মধ্যেকার সকল মতপার্থক্যের অবসান ঘটিয়ে ন্যাটোর আদলে একটি সামরিক জোট গঠনের আহবান জানিয়েছেন। জিও নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, মক্কায় স্বাক্ষরিত চুক্তিটি একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য ইসলামী দেশগুলোকেও এর অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত করা উচিত। এটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ক্লাব হওয়া উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জনাব আসিফ। সূত্র : দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। ৮ আগষ্ট ২০২৬। তিন দেশের মধ্যেকার ওই চুক্তিটি কোনো হেলাফেলার বিষয় হবেনা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যদি চুক্তির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জন করতে সচেষ্ট হয় তিনটি দেশ এবং যদি অন্য মুসলিম দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এটির সদস্য হিসেবে, তাহলে সত্যিকার অর্থে একটি ইসলামিক ন্যাটো জোট হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। যে তিনটি রাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তাদের একত্রিত শক্তি সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারলে এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলো এই জোটে একত্রিত হলে জোটটির বড়সড় শক্তি হয়ে আত্মপ্রকাশের সুযোগ রয়েছে এবং সত্যিকারঅর্থে এটি ইসলামিক ন্যাটো হওয়ার পথ খোলে যেতে পারে। অর্থাৎ এই জোটটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে মুসলিম দেশগুলোর মর্যাদা এবং সম্মান বৃদ্ধি পাবে। ইসলামী ন্যাটো হয়ে ওঠবে বিশ্বের অন্যতম শক্তি, -মনে করেন বিশেষজ্ঞজনেরা।
তিনটি দেশের জোটেই ব্যাপক শক্তি সমাবেশ একত্রিত হয়েছে বলে মনে করেন সচেতন মহলের নাগরিকজনেরা। চুক্তির পক্ষের তিনটি রাষ্ট্র একক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় ওঠেছে এখনই। কেননা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প ও ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তার অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং পাকিস্তানের বিশাল সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ও বৃহৎ আকারের সশস্ত্রবাহিনীর শক্তির সমাবেশ একত্রিত হয়েছে তিন দেশের ওই জোট গঠনের চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে।এই চুক্তির মাধ্যমে তাদের অভিন্ন কৌশলত স্বার্থ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামি সংহতির অটুট বন্ধনের সম্মিলন ঘটেছে বলে অভিমত, যা ভবিষ্যতে তিন দেশের ব্যাপক শক্তির উত্থানের সম্ভাবনাকে দৃঢ়তা দিয়ে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকেও ওই শক্তি জোটে সম্মিলন ঘটিয়ে বিশ্বব্যবস্হায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সূযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এইসব এখনও অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে।
৭ আগষ্টের টিআরটি ওয়ার্ল্ড এর সূত্রে তুরস্কের অভিমত হচ্ছে, তিন দেশের মধ্যে পৃথক চুক্তি আগে থেকেই রয়েছে এবং নতুন এই ত্রিদেশীয় যৌথ চুক্তির উদ্দেশ্য হলো তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার ও নিবিড় করা। বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন যে, ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি শুধু তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি আদর্শ মানদণ্ড হয়ে ওঠতে পারে। কেননা, এই চুক্তির লক্ষ্য হলো যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্হা জোরদার করা।
এই ত্রিদেশীয় চুক্তির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্হা জোরদার ও শক্তিশালী করা এবং এর কোনো একটি দেশেও যদি সশস্ত্র আক্রমণ করা হয়,তবে চুক্তিভূক্ত তিনটি রাষ্ট্রকেই আক্রমণ করা হয়েছে বলে গণ্য করে তিন দেশই যৌথভাবে শত্রুর মোকাবিলা করবে। তবে নিউইয়র্ক টাইমস এই বলে মন্তব্য করেছে, ওই অঞ্চল সন্ত্রাস কবলিত এবং সশস্ত্র প্রবণ অঞ্চল। তাই কিভাবে এইসব বিষয়ের মোকাবিলা করবে ত্রিদেশীয় জোট, তা বোধগম্য নয়। সূত্র ; ০৭. ০৮. ৩০২৬ এর নিউইয়র্ক টাইমস।
তিন দেশের জোট সবেমাত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এবং তাদের যাত্রাপথের কৌশল কী হবে, মধ্যপ্রাচ্যে এর কিধরণের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে তা নিয়ে অস্পষ্টতা দুর হওয়ার মতো অবস্থা দেখা যায়নি। তবে ইরান ওই চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছে, যদিও চুক্তির পক্ষের তিন দেশই স্পষ্ট করে বলেছে, ইরানকে বা অন্যকোনো রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেনি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই জোট সম্পর্কে কোনো মন্তব্য আসেনি। মন্তব্য করেনি চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য বিশ্বশক্তিগুলো। তবে আল-জাজিরাকে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আলেক্স আলফিরাজ সাসিয়ার্স বলেছেন তিন দেশের মধ্যেকার এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চ্যালেজ্ঞ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর মতে, এই চুক্তি সৌদি আরবের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি ও শক্তিশালী করবে। আল-জাজিরা ০৮.০৮.২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন জোটের ভূমিকা কী হবে সেটি দেখার বিষয়। অন্যদিকে নবগঠিত জোটের সদস্য রাষ্ট্র পাকিস্তানের সীমান্তে রয়েছে দেশটির চিরশত্রু ভারত। ইতিপূর্বে পাক-ভারত যুদ্ধ যেমন হয়েছে, তেমনি সীমান্ত সংঘাত লেগেই আছে দেশ দটির মধ্যে। ভারতের প্রতি এই নতুন জোটের সম্পর্ক কেমন হবে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আরও অনেক প্রশ্ন, অনেক সমস্যা রয়েছে নবসৃষ্ট এই জোটের সামনে। সবকিছু বিবেচনায় রেখে জোটের ভবিষ্যতে ভূমিকা কী হবে বা সেটি টিকে থাকতে পারবে কি-না তা নিয়ে সিদ্ধান্তমূলক উপসংহারে পৌঁছানোর আগে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারা যায় না।
অ্যাডভোকেট আনসার খান, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক





























































