
মহাবিশ্বে যেসব বিষয় ঘটে চলছে, তাই বাস্তবতা। এটা কখনও আমাদের জ্ঞান, বিশ্বাস বা ধারণা সাপেক্ষ নয়। একটি বাস্তব ঘটনা আমরা যেভাবে নিরূপণ করি, যদি সেটা কীভাবে হলো (How) প্রশ্নের উত্তরে যৌক্তিক হয়, তবে তা বাস্তবতার চিত্র বলা যেতে পারে। বাস্তবতার ব্যাপারে যে যার অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুসারে ব্যাখ্যা দেয়— তর্কে জয়ী হতে যে যার ব্যাখ্যার যথার্থতা প্রমাণে প্রচুর উদাহরণ ও অভিসম্বন্ধ (Reference) উত্থাপন করে। তবে এ সংক্রান্ত যে ব্যাখ্যাগুলো তাত্ত্বিক, প্রমাণিত হওয়ার আগপর্যন্ত যতই যৌক্তিক মনে হোক, সেসব বাস্তবতা নয়। তবে মহাবিশ্ব কীভাবে (How) অস্তিত্বে এলো, এই তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নের ভিতর বাস্তবতার চিত্র খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অবশ্য আদিকাল থেকেই বেশিরভাগ মানুষের চিন্তায় ভর করে আছে, মহাবিশ্ব কী জন্য (Why) হলো, তার উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে। মহাবিশ্ব বাস্তবতার একটা উদ্দেশ্য আছে, এটা একটা অবাস্তব চিন্তা, যে সম্পর্কে বাস্তব জগতে কোনোকিছুই খুঁজে পাওয়ার উপায় নাই— অন্ধকার কালো বিড়ালহীন কক্ষে, বিড়াল খুঁজে ঘাম ঝরানোর মতো! আর “কীভাবে হলো” এই প্রশ্নের উত্তর, প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই রয়ে গেছে : মহাকর্ষ, বস্তুজগতের আপেক্ষিকতা, পরমাণু, অণু এবং মহাবিশ্বের মৌলকণা ও প্রাকৃতিক বল— এসবই বাস্তবতার প্রমাণযোগ্য চিত্র। এসব নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করা যায় না। এই প্রবন্ধের শিরোনাম “বাস্তবতার চিত্র”; তাই এ নিয়ে লিখতে গেলে নিশ্চয়ই উক্ত বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করতে হবে। যা প্রসঙ্গক্রমে একে একে বর্ণনা করবো। তবে আলোচনার প্রারম্ভেই “সময়ের” একটা বর্ণনা দেওয়া হলো।
আমরা বুঝি যে, ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাই অতীত, মানে সময়ের পূর্ববর্তী অংশ। কিন্তু অতীত বলতে আমরা যা বুঝি, বাস্তবে তা হলো মহাবিশ্বে বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার সমষ্টি। মহাবিশ্বে আলোর গতি ধ্রুবক (Constant) হলেও এই গতির একটা নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে (সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল)। এই অর্থে আমরা যা দেখি তাই অতীত। এমন হিসাবে মহাবিশ্বের দৃশ্যমান চাঁদ, সূর্য, গ্যালাক্সি এমনকি আমার প্রতিবেশে এইমাত্র দেখা সমস্ত ঘটনাও অতীত বা অতীত হতে চলছে। অর্থাৎ প্রতিটি বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে পড়তে একটা সময় নেয়, হোক এই সময়টা কয়েক ন্যানোসেকেন্ডের চেয়েও স্বল্প বা সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, সপ্তাহ, মাস, শতাব্দী, এমনকি এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দূরত্ব ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের (Classic Physics) ব্যাখ্যায় পুরো দুনিয়াটাই অতীত। আর বর্তমানের ঘটনাগুলো হলো, আলোর গতি ও আমাদের দেখার অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি বিশেষ অবস্থা, যা স্বল্পস্থায়ী, অল্পক্ষণের মধ্যেই অতীত হয়ে যায় এবং এই অবস্থাগুলো লেখা হলেই ইতিহাস হয়। আর ভবিষ্যতে যেসব ঘটনা ঘটবে, সেগুলো বর্তমানে এসে অতীত না হওয়া পর্যন্ত ইতিহাস নয়। ভবিষ্যতের বিশেষ দিনগুলো ক্যালেণ্ডারে নির্ধারণ করা গেলেও তা ভবিষ্যদ্বাণী। যা না ঘটার সম্ভাবনাও থাকে! তবে আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতায় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত— সবগুলোরই অস্তিত্ব রয়েছে।
মহাবিশ্বের বিশাল দূরত্বের কারণে অন্যকোনও গ্রহ বা নক্ষত্রের “বর্তমান” সময়টা আমরা দেখতে পাই না; যেমন : ঠিক এই মুহূর্তে মঙ্গল বা বৃহস্পতি গ্রহদুটির অভ্যন্তরীণ অবস্থা কী, তা আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন বিন্দুতে এই মুহূর্তে কী ঘটছে, তাই জানতে পারি না, অন্যান্য গ্রহে বা নক্ষত্রমণ্ডলের বর্তমানটা দেখার তো প্রশ্নই ওঠে না। মহাবিশ্বের প্রতিটি বিন্দুতেই ঠিক এই মুহূর্তে নানাবিধ ঘটনা ঘটছে। তাই “বর্তমান” একটিমাত্র ঘটনার নয়, বরং জানা-অজানা অগণিত ঘটনার ক্ষণ। আশপাশে যা কিছু ঘটছে এবং এখনই যেসব ইন্দ্রিয়গোচর হচ্ছে, তাই আমাদের বর্তমান। তাই বলতে হবে যে, বর্তমান বলতে আমরা যা বুঝি, সেটা পর্যবেক্ষক সাপেক্ষ। আর ভবিষ্যৎ বলতে বুঝায়, যা পরে ঘটে বর্তমানে এসে অতীতেই চলে যায়। মূলত যে ঘটনাগুলো এখনও ঘটেনি, কিন্তু সময়ের প্রবাহে সামনে ঘটবে, তাই ভবিষ্যৎ। তবে দূরের নক্ষত্রলোকের যে আলো এখনও আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়নি, সেই আলোয় যা ঘটবে তা পুরাপুরি আমাদের জন্য ভবিষ্যতের অংশ নয়, বরং একে বলা হয় “Absolute Elsewhere” বা আমাদের বর্তমানের বাইরের একটি স্থানকাল অঞ্চল। তবে দর্শনের পরিভাষায় এটি ভবিষ্যতেরই অংশ। কারণ ওই ঘটনাটি আমাদের বাস্তবতায় প্রবেশ করবে তখনই, যখন আলোটি আমাদের চোখে এসে পৌঁছাবে। অর্থাৎ আমাদের অভিজ্ঞতার ডায়েরিতে তা “ভবিষ্যত” হিসাবেই যুক্ত হবে।
বড় জগতে (Macro Realm) অতীতে কোনোকিছু করা যায় না। বরং সকল কাজই হয় ভবিষ্যতের জন্য। এই অনুযায়ী এমুহূর্তে যা ঘটমান, সেটাকে আমরা বর্তমান বলি। অতঃপর সেটাই অতীত ইতিহাস হয়ে যায়। এর অর্থ, অতীত, বর্তমান ভবিষ্যত হলো, সময়ের একমুখী ধারা, যার অস্তিত্ব আমরা সর্বদাই দেখি। সময়ের এই ধারায় সবকিছুই ঘটে। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলে যে,মহাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা (Entropy) সর্বদাই বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার কারণে সময় কেবল একমুখী। মহাবিশ্ব ব্যবস্থায় (System) সবকিছু অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে প্রবাহিত হয় এবং মধ্যবর্তী সময়টা হলো বর্তমান। আর আমাদের কর্মফল যাই হোক, তা অতীতে ফিরে গিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। বরং বর্তমানে বসেই আমরা ভবিষ্যতের জন্য কাজ করি, যা তাৎক্ষণিকভাবেই অতীত হয়ে যায়। তবে আমাদের পরিকল্পনার সাথে যেসব ভবিষ্যদ্বাণী থাকে, হুবহু সেই মোতাবেক কাজ হয় না; ফাঁক থেকেই যায়।
কার্যত চিরায়ত বলবিদ্যা অনুসারে, বাস্তবতার চিত্র নিয়ে উপরুল্লেখিত “সময়”-এর যে আলাপ হলো, তা অতি সরল। তাই জগতের অতিপারমাণবিক অবস্থাও এই বাস্তবতার চিত্রের ব্যাখ্যায় আসতে হবে। নইলে তা কখনও বাস্তবতার চিত্র নয়। কারণ মহাবিশ্বের বস্তুজগত শুরু হয়েছে অতিপারমাণবিক বা কোয়ান্টাম অবস্থা থেকে। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান (Classic Physics) দৃশ্যমান বড় বস্তুগুলো নিয়ে কাজ করে এবং এর আলোকে বাস্তবতার ব্যাখ্যাগুলো কণাবাদী বলবিদ্যায় (Quantum Mechanics) এসে বড় রকমের ধাক্কা খায়। যেমন, কোয়ান্টাম স্তরে “যা ঘটে গেছে” কেবল তাই অতীত নয়। বরং ক্ষুদ্র কণা জগতের অতীত নির্ধারিত হয় বর্তমানে। অর্থাৎ একটি কণা পর্যবেক্ষণ করার আগপর্যন্ত সেটা কোন পথ দিয়ে গিয়েছে (মানে তার অতীত) সুনির্দিষ্ট থাকে না। বরং সে একই সাথে সকল সম্ভাব্য পথে থাকে। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা অনুসারে, “বর্তমান মুহূর্তের পর্যবেক্ষণই কণার অতীত ইতিহাসকে নির্ধারণ করে” (জন হুইলারের Delayed-choice experiment)। তাই অতীতকে একমাত্র বা ধ্রুব বাস্তবতা বলা বিজ্ঞানের কণাবাদী স্তরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অধিকন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অনুসারে, সময়ের ইতিহাস নির্দিষ্ট কোনও একটি বা দুটি পথের সমষ্টি নয়, বরং অগণিত ঘটনার সমন্বিত রূপ।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের “হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি” এবং গণিতের “কেওয়াস থিওরি” (Chaos Theory / Butterfly Effect)। এই তত্ত্বগুলো প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের যেকোনও ব্যবস্থার (System) ভবিষ্যতের নিখুঁত ফলাফল আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। প্রকৃতিতে সবসময়ই একটি ক্ষুদ্রতম অনিশ্চয়তা বা পার্থক্য (Fluctuation) থেকে যায়। ভবিষ্যত মৌলিকভাবেই অনিশ্চিত। কিন্তু দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বলে যে, আমাদের প্রতিটি কাজের জন্য পরিকল্পনা করতে হয় এবং ভবিষ্যত ফলাফল প্রায়শই পরিকল্পনায় যে ফলাফলের প্রত্যাশা থাকে, তার কাছাকাছি যায়। অর্থাৎ আমাদের যে কোনও কাজের পরিকল্পনায় একটা লক্ষ্যমাত্রা থাকে। এই লক্ষ্যমাত্রার মাঝেই ভবিষ্যদ্বার্তা থাকে। কিন্তু প্রতিটি পরিকল্পনা মাফিক কাজের ফলাফল কি হুবহু প্রত্যাশা মতো হয়? হয় না, কিছুটা পার্থক্য রয়ে যায়। প্রসঙ্গত আমাদের কাজের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তার ফলাফল একশোভাগ পরিকল্পনা মাফিক হয় না, তাইলে প্রাকৃতিক ঘটনাসমূহ সম্পর্কে আমাদের পূর্বাভাসগুলো শতভাগ নিখুঁত হবে কীকরে? সুতরাং ভবিষ্যত আমাদের নিকট অনিশ্চিত। আর এই বাস্তবতা চিত্র কীভাবে (How) ঘটে গেছে, তা যেকোনও রকমের বিশুদ্ধ ধারণা নিরপেক্ষ প্রকৃতির ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করেই আমরা পেতে পারি। (যদিও ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো পূর্বাভাস মতো ফলাফল পাওয়া নির্ভর করে আমাদের পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতার ওপর।)
প্রসঙ্গত এরিস্টোটলের মতে, মহাবিশ্ব বাস্তবতার একটা নেপথ্য কারণ ও উদ্দেশ্য আছে। আর ছোট-বড় প্রতিটি পদার্থই এই কারণে উদ্দেশ্যের দিকে যায়। সুতরাং প্রতিটি বড় বস্তু ছোট বস্তুর তুলনায় আগে ধাবিত হয়। এই ধারণা অনুসারে, একটি ভারী বস্তু (ধরা যাক ১০ কেজি) একটি হালকা বস্তুর (ধরা যাক ১ কেজি) চেয়ে একই সাথে ছাড়লে ১০ গুণ দ্রুত মাটিতে পড়বে। আর এসবই কেবল বিশুদ্ধ চিন্তা দিয়ে বোঝা যায়, কোনও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন নাই। কিন্তু গ্যালিলিও এরিস্টোটলের এরকম বিশুদ্ধ যুক্তি অনুসরণ না করে, নিজেই বিভিন্ন সাইজের বস্তু উপর থেকে নিচে একই সাথে ছাড়েন। এই পরীক্ষায় তিনি দেখেন যে, একটি ভারী বস্তু ও একটি হালকা বস্তুকে একই সাথে উপর থেকে ছেড়ে দিলে তারা ঠিক একই সময়ে একসাথে মাটিতে পড়ে। বস্তুর ওজন বা ব্যাসার্ধ ছোট-বড় হওয়ার কারণে তাদের পতনের গতিতে কোনও পার্থক্য হবে না। গ্যালিলিওর মূল কৃতিত্ব ছিল এটি দেখানো যে, ভর বা আকার আলাদা হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর মহাকর্ষ সবাইকে সমানভাবে টানে (Equivalence Principle)। এই পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, মহাবিশ্বের বাস্তবতায় ঘটনাগুলো কীকরে ঘটে, তা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের দ্বারা বোঝা যায়। অথচ এরিস্টোটল নিশ্চিত ছিলেন যে, মহাবিশ্বের বাস্তবতা কেবলই বিশুদ্ধ চিন্তা ব্যবহার করে জানা সম্ভব, কোনও পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই। ধরুন আপনার মেধা ও অভিজ্ঞতা সাপেক্ষে মহাবিশ্ব বাস্তবতার একটি চিত্র আঁকলেন। সেটা বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করলো। তাই তা বাস্তবতার চিত্র হয়ে গেলো! এরিস্টোটলের ভৌতজগতের বাস্তবতার চিত্র ভাবনা এরকম ছিল। তাঁর পদার্থবিদ্যা ছিল মূলত দর্শন ও উদ্দেশ্যবাদ নির্ভর (Teleological)। তিনি মনে করতেন পাথর নিচে পড়ে কারণ পাথরের “উদ্দেশ্য” হলো তার প্রাকৃতিক স্থান অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে যাওয়া। কিন্তু গ্যালিলিও এবং পরবর্তীতে নিউটন দেখান যে, বিজ্ঞান কোনও উদ্দেশ্য (Why) খোঁজে না। বরং মহাকর্ষ কীভাবে (How) কাজ করে তা সমীকরণ দিয়ে বের করে। আধুনিক বিজ্ঞানের কথা হলো, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে কোনও মহাজাগতিক উদ্দেশ্য আছে কি-না, তা বিজ্ঞান গবেষণার পরিধির বাইরে। কেননা বিজ্ঞান মহাবিশ্বের বাস্তবতার চিত্রটা কী হতে পারে, তার ওপর কাজ করে। আর এটা কেবলই বস্তুজগতের পর্যবেক্ষণ দিয়েই অনুভব করা সম্ভব। এর বাইরে যদি কোনও উদ্দেশ্য থাকে, তা কে কীভাবে জানবে?
মহাবিশ্বের বাস্তবতায় “সময়” চতুর্থ মাত্রা হিসাবে স্থানে (Space) বস্তুজগতের প্রতিটি সদস্যের জন্য একটা নির্দিষ্ট সীমা তৈরি করে। যেটাকে আমরা বয়স বলি; যেমন : বলা হয়, “মহাবিশ্বের বয়স কতো?“ ত্রিমাত্রিক বস্তুজগৎ (দৈর্ঘ্য প্রস্থ ও উচ্চতা) স্থান ও কালের মধ্য দিয়ে চলার ফলে যে বয়স লাভ করে, সেটাই ক্ষণস্থায়ী চতুর্থ মাত্রা বা সময়। আর বস্তুর ভর সাপেক্ষে স্থানে যে আপেক্ষিক বক্রতা তৈরি হয়, তার নাম স্থানকাল (Spacetime)। এই অর্থে সময় স্থানের সাথেই জড়িয়ে আছে। যা মূলত ভর ও গতি সাপেক্ষে চলে। সুতরাং মহাবিশ্বের বস্তুজগতের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বাইরে সময়ের নিরপেক্ষ অস্তিত্ব কোথায়! কার্যত মহাবিশ্বের ঘটনাগুলোর প্রতিটি সদস্যই অতীতের একটা পর্যায় থেকে শুরু হয়ে ভবিষ্যতের পানে আপেক্ষিক গতিতে বিবর্তনের নানান স্তর পার হয়ে অন্য একটা পর্যায় এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবয়ব ধারণ করে। একঅবস্থা থেকে অন্যঅবস্থার মধ্যবর্তী এই সময়টুকুকে আমরা বয়স বলি। এই ঘটনাগুলো না থাকলে সময়ের হিসাব কী?! তবে বয়স পূর্বনির্ধারিত কি-না, সে প্রশ্নে আবারও উপরুল্লেখিত মহাবিশ্বের সৃষ্টির উদ্দেশ্যের দিকে ফিরতে হবে। কিন্তু প্রমাণ করার সম্ভাবনা নাই এমনসব বিষয় বিজ্ঞান গবেষণার মধ্যে পড়ে না।
তবে মহাবিশ্বের সময়ের বাস্তবতা আমরা যেমন দেখি, “অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে একমুখী যাত্রা।“ গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি যাই আমাদের কাছে দৃশ্যমান, তার সব এভাবেই চলমান। কারণ এরা অতীতের একটা সময় সৃষ্টি হয়েছে এবং এদের থেকে যে সময় আলো আমাদের দিকে আসা শুরু করেছে, তা আমাদের এই মুহূর্তে অতীত হলেও প্রতিটির একটা বর্তমান মুহূর্ত অবশ্যই রয়েছে; যেমন : চাঁদ থেকে যে আলো আমাদের চোখে পড়ে, তার শুরু এক সেকেন্ড আগে, তদ্রূপ সূর্যের আলো আমাদের গায়ে পড়ে ৮-মিনিট পর। আর আমাদের নিকটতম নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টোরি থেকে যে আলোক রশ্মি এখন আমাদের চোখে পড়ছে, তার শুরু ৪.৩০-বছর আগে। এমনও হতে পারে অগণিত খগোল বস্তু একটা সময় শুরু হয়ে ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ওসব বস্তুর জীবনচক্রের কোনও মুহূর্তের আলোক রশ্মি এখন পর্যন্ত আমাদের চোখে পড়েনি, তবে ভবিষ্যতে পড়বে। আর যে খগোল বস্তু থেকে আলো পালাতে পারে না (Black Hole/কৃষ্ণগহ্বর), সেগুলোর প্রভাব টেলিস্কোপের দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায়, তাদের চতুর্দিকের বাস্তবতার চিত্র কী, সেটা পর্যবেক্ষণ করে। কৃষ্ণগহ্বর আমরা দেখতে পাই না বটে। কিন্তু এর চতুর্দিকে যে ঘটনা দিগন্তের (Event Horizon) তৈরি হয়, সেটা আলোকিত, তাই খোদ কৃষ্ণগহ্বর না-দেখা গেলেও এর প্রভাব টের পাওয়া যায় (ঘটনা দিগন্ত হলো স্থানকালে আলোর সেই পথ, যা কৃষ্ণগহ্বর থেকে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছে, কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। কারণ কোনোকিছুই ঘটনা দিগন্ত পেরিয়ে কৃষ্ণগহ্বর থেকে কখনও বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না।)
বর্তমান হলো সময়ের একটা আপেক্ষিক মাত্রা, যা অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী হলেও বিভ্রম (illusion) নয়। অর্থাৎ ত্রিমাত্রিক বস্তুর আবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে যে চতুর্থ মাত্রা আমাদের কাছে ক্ষণিকের জন্য অনুভূত হয়, সেটাই বর্তমান সময়। এরচে’ ক্ষণিকের অতিথি না-থাকলেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে সময়ে যেসব ঘটনা মহাবিশ্বে ঘটে, সেগুলো অনিশ্চিত। নিউটনীয় কাঠামোতে আমরা ত্রিমাত্রিক স্থান (3D Space: x, y, z) এবং সময়কে (t) আলাদাভাবে বিবেচনা করি। এখানে সময়কে স্থানের লম্ব বা সমকোণীয় (Orthogonal) ধরা হয় এর দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের কারণে।
প্রথমত সময় স্থান নিরপেক্ষ : আপনি স্থানে যেকোনও দিকে (ডানে, বামে, ওপরে, নিচে) যত দ্রুতই গতিশীল হোন না কেন, তা সময়ের প্রবাহকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না। সময় একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন অক্ষ হিসেবে কাজ করে, ঠিক যেভাবে গ্রাফ পেপারে X-অক্ষের পরিবর্তন Y-অক্ষকে প্রভাবিত করে না (তারা একেঅপরের ওপর ৯০ ডিগ্রি কোণে বা লম্বে থাকে)।
দ্বিতীয়ত সর্বজনীন বা পরম সময় (Absolute Time) : নিউটনের মতে, পুরো মহাবিশ্বের জন্য একটি মাত্র ঘড়ি রয়েছে। স্থান ও গতির পরিবর্তন নির্বিশেষে মহাবিশ্বের সর্বত্র সময় সমান গতিতে চলে। অর্থাৎ সময়ের প্রবাহ সবার জন্য এক এবং অভিন্ন (Universal)। এই হিসাবে, আপনি যদি একটি অতিদ্রুত রকেটে চড়ে মহাকাশে ঘুরে আসেন, তবে আপনার হাতের ঘড়ি এবং পৃথিবীতে থাকা আপনার বন্ধুর ঘড়িতে ঠিক একই সময় পার করবে। কারণ সময় সবার জন্য এক এবং এটি স্থানের গতির সাথে লম্ব বা স্বাধীন।
কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বে নিউটনের এই ‘স্বাধীন ও পরম’ সময়ের ধারণা ভেঙে পড়ে। আইনস্টাইন দেখান যে, সময় স্থানের সাথে লম্বভাবে আলাদা কোনও অক্ষ নয়, বরং তারা মিলেমিশে স্থান ও কাল (Space–Time) নামের একটি চতুর্মাত্রিক (4D) জাল বিস্তার করেছে। তাঁর মতে, আপনি আলোর কাছাকাছি গতির বাহনে মহাবিশ্ব ভ্রমণে আপনার জন্য সময় ধীর হয়ে যাবে (Time Dilation)। পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখবেন আপনার ৩-বছরের শিশুকন্যা বুড়ো হয়ে গেছে এবং বয়সের ভারে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, নাকে অক্সিজেন পাইপ লাগানো। কিন্তু আপনি যুবকই রয়ে গেছেন। এ সময় কন্যাকে যদি অভ্যাসবশত মা বলে সম্বোধন করেন, তবে সবাই বিশ্বাস করবে যে, আপনি ওর বাবা নয়, বরং ও আপনার মা। অর্থাৎ আপনার গতি আপনার সময়ের অক্ষকে বাঁকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতা প্রমাণের জন্য যে ধরনের প্রকৌশলগত সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, তা পৃথিবীতে আজও অর্জিত হয়নি!
উল্লেখ্য উপরে আমি বলেছি যে, আমাদের কাজের ফলাফল হুবহু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মাফিক সবক্ষেত্রেই হয় না। তবে যেসব কাজে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে, সেগুলো পরিকল্পনা মতো নিখুঁত করতে হয়। নইলে পুরো প্রকল্পটাই বিফল হয়। যেমন, পদ্মাসেতুর অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে এর সূক্ষ্মতম ত্রুটিগুলোকে হিসাবে এনে। এইভাবে একটা দ্বি-তল বিমান কিংবা একটা রকেট নির্মাণ করা হয়। তারপরও বাস্তবতা হলো একটা রকেট উড্ডয়নের সময় অথবা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশকালে আগুন লেগে ধ্বংস হতে পারে। কিংবা একটা বিমান ক্রাশ করতে পারে। তবুও এরকম ধ্বংসের কারণগুলো ভবিষ্যতে রকেট বা বিমান তৈরিতে কাজে লাগে। অর্থাৎ আমাদের যেসব কাজের পরিকল্পনা আমরাই করি, তাঁর ওপর আমাদের বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ থাকে। তাই মনে হয় আমাদের প্রকৌশলগত কাজগুলো নির্ভুল। সুতরাং প্লেন ক্রাশ হয় জেনেও আমরা নির্ভয়ে আকাশ ভ্রমণ করি। এরকম বাস্তবতা হলো, আমাদের ধরে নেওয়া কিছু বিশ্বাস। অতঃপর যে মানব তৈরি যানবাহনের দুর্ঘটনার শিকার হয়, তার নিকট আত্মীয়রা বোঝে যে, বাস্তবতা কী নিঠুর ও বিষয় নিরপেক্ষ। মানুষের এরকম দুর্বলতার কারণে সে এরকটা অতিপ্রাকৃতিক সত্তার প্রতি নতি স্বীকার করে চলে। আর এই সুযোগে একদল সুবিধাবাদী লোক নিজস্ব আর্থিক স্বার্থ এইসব মানবিক দুর্বলতার মধ্যে খুঁজে পায়।
কিন্তু যেসব প্রাকৃতিক ঘটনা একদম অজ্ঞাত, সেগুলোর কারণ ও ভবিষ্যদ্বাণী করা তাৎক্ষণিকভাবে প্রায়ই সম্ভব নয়। তবে অতীতের ঘটনাগুলোর বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে এরকম প্রাকৃতিক নিয়মের কিছু কিছু বর্ণনা বা পূর্বাভাস দেওয়া যায়; যেমন : আমাদের দৃশ্যমান জগতের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এর শুরুর (বিগ ব্যাং-এর প্রথম প্রহরের (Planck Epoch) কথা বাদ দিয়ে) প্রথম তিন মিনিট কেমন হওয়া উচিৎ, তার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করা যায়। কিন্তু ১ম প্রহরে অপেক্ষবাদ বা কণাবাদী বলবিজ্ঞানের সমস্ত সূত্র ভেঙে পড়ে। কেননা তখন মহাবিশ্ব একটা অনন্য (Singularity) অবস্থায় ছিল। যেখানে সবকিছু এত কাছাকাছি এবং এত ঘন অবস্থায় ছিল যে, সে বিষয় আমাদের যেকোনও সমীকরণ বা ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। যা মূলত প্ল্যাঙ্ক টাইম বা বিগ ব্যাং-এর প্রথম 10-43 সেকেন্ড। কিন্তু সেই অতিক্ষুদ্র মুহূর্তটি পার হওয়ার পর থেকেই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অত্যন্ত সফলভাবে মহাবিশ্বের রূপরেখা ও বিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে পারে— মহাজাগতিক স্ফীতি (Inflation), কণাদের জন্ম (Baryogenesis) এবং বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস (BBN) এর মাধ্যমে। কিন্তু চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের ন্যায় যেসব প্রাকৃতিক ঘটনা আমাদের নিকট নতুন নয়, সেগুলোর পূর্বাভাস মহাবিশ্বের অতীতের বাস্তবতা অনুসারে গণনা করে দেওয়া যায়। এমনকি একশো বছর পরের চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব।
বাস্তবতার চিত্র ‘এমন কেন হয় (How)’ দর্শন অনুসারে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা হলে, সেটা প্রায় সবক্ষেত্রেই নির্ভুল হয়। অন্যথায় তা হয় ভ্রান্ত ও অন্ধত্ববাদ (Dogmatism)। উল্লেখ্য ১৯২২-সালে নাসার চন্দ্র এক্সরে অবজারভেটরি একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, মহাশূন্য পুরাপুরি নিস্তব্ধ নয়। সেখানের কিছু কিছু অঞ্চলে তরঙ্গের মতো বিকট শব্দ টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে। পারসিউস গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে প্রচুর পরিমাণে উত্তপ্ত গ্যাস এবং প্লাজমা রয়েছে। সেখানকার একটি ব্ল্যাকহোল থেকে নির্গত শক্তি এই গ্যাসের মধ্যে চাপ তরঙ্গ (Pressure Waves) তৈরি করে, যা মূলত শব্দ তরঙ্গের মতোই। এই তরঙ্গগুলো মানুষের কান দিয়ে শোনার ক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৫৭ অকটেভ নিচে ছিল। নাসা গাণিতিক পদ্ধতিতে এই উপাত্তগুলোকে (Data) মানুষের শ্রবণযোগ্য কম্পাঙ্কে রূপান্তর করেছে, যাকে ‘সোনিফিকেশন’ বলে। এটি মহাজাগতিক ধূলিকণা ও গ্যাসের ঘর্ষণের এক ধরনের গম্ভীর নিনাদ। এই খবরের সূত্র ধরে একটা টিভি চ্যানেল প্রচার করে যে, আকাশে ফেরেস্তারা সর্বদা জেকের করে, আর এটাই নাকি এই তরঙ্গ ধ্বনি। অর্থাৎ এরা এই শব্দের কারণ ও উদ্দেশ্য জেনে ফেলেছে! এ ধরনের ভ্রান্ত বিশ্লেষণের সাথে মহাবিশ্বের বাস্তবতার কোনও সাদৃশ্য নাই।
প্রকারন্তরে সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, মাস, বছর কিংবা শতাব্দী— এ সবই একেকটা রশ্মির মতো— এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে মিলিত হয়। ধরে নিলাম যে, “সময়” মহাবিস্ফোরণ থেকে শুরু হওয়া একটা কাল্পনিক লম্ব। এই লম্বকে কেটে কেটে ছোট-বড় নানান পরিমাপের রশ্মি বানালে যা হয়, তাই হলো সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা ইত্যাদি। স্থানকালের প্রতিটি বিন্দুতে বস্তুসাপেক্ষ সময় সৃষ্টি হয়! অর্থাৎ গ্রহ, নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি যাই বলা হোক, তারা নিজের কক্ষপথে চলছে। এই কক্ষপথগুলো হলো ত্রিমাত্রিক স্থানের (3D Space) একটি জ্যামিতিক পথ। মহাজাগতিক বস্তুসমূহ যখন কক্ষপথে চলে, তখন এদের গতি এবং মহাকর্ষের তীব্রতা সাপেক্ষে নিজস্ব সময় (Proper Time) প্রভাবিত হয়। এর ফলে প্রতিটি খগোল (Selestial Sphere/Heavenly Body) বস্তুর সময় ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই একটা গ্রহের ঘড়ির সময় অন্যটার সমকক্ষ কখনও হবে না। এতেই প্রমাণিত হয় যে, বাস্তবে মহাজাগতিক ঘড়ি (Universal Clock) বলতে কিছু নাই, যেটাকে একটা লম্বের সাথে তুলনা করা যাবে। যেমনটা নিউটনীয় বলবিদ্যায় মানা হতো। তবে এসব সময়ের ব্যাখ্যা আমরা কেবল মহাবিশ্বের বড় বস্তুগুলোর বিষয়ে দিতে পারি। কিন্তু কোয়ান্টাম জগত এত্থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে শনাক্তের আগমুহূর্ত পর্যন্ত কণাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করা যায় না। অর্থাৎ কণাবাদী বলবিজ্ঞানে অতীত নির্ভর করে বর্তমান পর্যবেক্ষণের ওপর। কেননা কণার সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা অতীত শনাক্ত করা তখনই সম্ভব, যখন আপনি কোনও যন্ত্র বা আলো (ফোটন) দিয়ে কণাটিকে পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপ করবেন।
কণাদের ওয়েভফাংশন কলাপ্স (Wavefunction Collapse) নামে একটা ব্যাপার আছে। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণের আগে কণাটি একটি বিন্দু হিসেবে থাকে না, সেটি তরঙ্গের মতো মহাবিশ্বের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ওয়েভফাংশন বলা হয়। কণাটি তখন একই সাথে সম্ভাব্য সবজায়গায় অবস্থান করে। আপনি যখনই কণাটির অবস্থান মাপার চেষ্টা করবেন, অমনই তার সেই ছড়িয়ে থাকা তরঙ্গের রূপটি মুহূর্তে ভেঙে গিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট বিন্দুতে রূপ নেয়। তখন কণাটির একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান পাওয়া সম্ভব। তবে এখানে একটি শর্ত হলো, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি অনুসারে, আপনি যত নিখুঁতভাবে একটা কণার অবস্থান নির্ণয় করবেন, ঠিক ততটাই তার ভরবেগ অনিশ্চিত হয়ে যাবে। তাইলে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মহাবিশ্বের কণাবাদী চরিত্র খুবই বৈচিত্রময়। বাস্তবতার এই চিত্র আপনি যতই বুঝতে পারবেন, ততই বিস্মিত হবেন, যে আমাদের দৃশ্যমান মহাজগতের বড় বস্তুদের সাথে এই উপ-পারমাণবিক কণাদের কী বিরাট ব্যবধান। যদিও এই বৈচিত্র না থাকলে, মহাবিশ্ব হয়তো অস্তিত্বেই আসতো না। এই কথার সারমর্ম হলো, মহাবিশ্বের বাস্তবতায়, বড় বস্তুজগতে কাজ করে আপনি যে ফলাফল আশা করবেন, একই কাজ কণাদের জগতে করে একই ফলাফলের আশা করতে পারবেন না!
আইনস্টাইনের বিশেষ অপেক্ষবাদ অনুসারে সময় হলো বস্তুসাপেক্ষ। গতি ও মহাকর্ষের ওপর ভিত্তি করে সময়ের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মহাবিশ্বে যে বস্তুর গতি ও ভর যত বেশি, তার জন্য সময় তত ধীর হয়ে যায় (Time Dilation)। তাই গ্রহ, নক্ষত্র, কৃষ্ণগহ্বর ইত্যাদি খগোল বস্তুর গতি ও ভর সাপেক্ষে অভ্যন্তরীণভাবে এদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন ঘড়ি হতে হবে। পৃথিবী সাপেক্ষ ঘড়ি হাতে দিয়ে বৃহস্পতিতে অবতরণ করলে, একজন নভোচারী বৃহস্পতি পৃষ্ঠের সাথে সময় মিলাতে পারবে না, বরং কয়েক ন্যানোসেকেন্ড ধীরে চলবে! সময়ের বাস্তবতা হলো মহাজাগতিক কোনও একক ঘড়ি নেই, বস্তু সাপেক্ষ। স্থানকালে আমাদের মহাজাগতিক বাহন পৃথিবী গ্রহ এগিয়ে চলছে এবং স্থানকালের বক্রতার কারণে নিজস্ব সময় লাভ করছে, পিছনে রেখে যাচ্ছে নিজস্ব ইতিহাস! যে ইতিহাসের শুরু এ গ্রহ সৃষ্টির প্রারম্ভিক (Primordial) অবস্থায় এবং শেষ হয়েছে এইমাত্র বা পুরাঘটিত অতীতে (Past Parfect)। এই অর্থে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বলতে আমরা যা বুঝি, তার অস্তিত্ব শেষমেষ অতিতেই ঠাঁই হয়। এই ধারণা আসলে আইনেস্টাইনের Block Universe বা স্পেসটাইম কন্টিনিউয়াম তত্ত্বের সাথে সহমত পোষণ করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ একই সাথে মহাবিশ্বের চারমাত্রিক কাঠামোতে (4D Fabric) অস্তিত্বশীল। যেখানে ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নির্ধারিত (Deterministic)। ভবিষ্যৎ বলতে যা আসবে, তা ইতোপূর্বে স্থানকাল চাদোয়ায় অপেক্ষা করছে, মানে পূর্বনির্ধারিত। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স ব্লক ইউনিভার্সকে অনুসরণ করে না। কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ আগে থেকে নির্ধারিত নয়। ভবিষ্যৎ হলো অসংখ্য সম্ভাবনার জাল (Probabilities)। যতক্ষণ না কোনও ঘটনা ঘটছে (Wavefunction Collapse হচ্ছে), ততক্ষণ ভবিষ্যতের কোনও সুনির্দিষ্ট অস্তিত্বই নেই। তাই বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যৎ অতীতে ঠাঁই নেওয়ার আগে তা একটি সম্ভাবনা মাত্র, কোনও নিরেট বাস্তবতা নয়।
উল্লেখ্য আমি উপরে অতীতের কোয়ান্টাম ব্যাখ্যায় বলেছিলাম যে, পর্যবেক্ষণের আগপর্যন্ত অতীতের বাস্তবতা নেই; আবার ভবিষ্যতও সম্ভাবনাময় জাল— এটি মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটি ব্যাপার মনে হলেও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে তা পরীক্ষিত সত্য। আপনি যতক্ষণ একটি কণা পর্যবেক্ষণ না করছেন, ততক্ষণ তার কোনও একটি সুনির্দিষ্ট অতীত ইতিহাস তৈরি হয় না। বরং কণাটির অতীত তখন কোটি কোটি সম্ভাব্য ইতিহাসের একটি ঘোলাটে মেঘ (Superposition)। আপনার বর্তমান মুহূর্তের পর্যবেক্ষণই অতীতকে বাধ্য করে যেকোনও একটি সুনির্দিষ্ট রূপে নির্ধারিত হতে। অর্থাৎ কণাবাদী স্তরের বাস্তবতা হলো, “বর্তমান অতীতকে নির্ধারণ করে!” জন হুইলারের বিলম্বিত সিদ্ধান্ত পরীক্ষা (Delayed-Choice Experiment) এখানে স্মর্তব্য। তিনি একটি পরীক্ষার প্রস্তাব করেছিলেন, যা পরবর্তীতে গবেষণাগারে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। এই পরীক্ষায় দেখা যায়, একটি আলোর কণা (ফোটন) অতীতকালে একটি চিড়/ফুটো (Slit) দিয়ে তরঙ্গের মতো এসেছে, নাকি কণার মতো এসেছে, তা নির্ধারিত হয় বর্তমান মুহূর্তে বিজ্ঞানী কীভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে তার ওপর! আর রিচার্ড ফাইনম্যান দেখিয়েছেন, একটি কণা যখন অতীতে বিন্দু ‘ক’ থেকে যাত্রা করে বর্তমানে বিন্দু ‘খ’-তে এসে পৌঁছায়, এটা কোনও একটি নির্দিষ্ট পথ দিয়ে আসে না। বরং সে একই সাথে মহাবিশ্বের সব পথ দিয়ে আসে।
আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আইনস্টাইনের ব্লক ইউনিভার্স বা স্পিনোজার দর্শন ছিল, আগে থেকে রেকর্ড করা একটি সিনেমার রিলের মতো। কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স বলে, ভবিষ্যত কোনও নিরেট কিছু নয়, বরং এক বিশাল সম্ভাবনাময় জগৎ (Probability Grid)। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে শ্রোডিঙ্গার সমীকরণ অনুসারে, কোনও কণার ভবিষ্যত অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায় না। এই সমীকরণ কেবল বলে যে, ভবিষ্যতে কণাটি এখানে থাকার সম্ভাবনা ৪০%, অন্যকোথা ৩০% আর অন্য কোনোখানে ৩০%। ভবিষ্যত মুহূর্তটি আসলে কোনও একটি একক ঘটনার ফলাফল নয়। ভবিষ্যত হলো এই সবকটি সম্ভাবনার একসাথে টিকে থাকা এক রহস্যময় অবস্থা। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যখনই ভবিষ্যত মুহূর্তটিতে পৌঁছান এবং চোখ খোলেন (পর্যবেক্ষণ করেন), অমনই সম্ভাবনার সেই বিশাল জালটি মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে একটি মাত্র বাস্তবতায় রূপ নেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ওয়েভফাংশন কলাপ্স। আপনি হয়তো কণাটিকে এখানে দেখতে পেলেন; আর সাথে সাথে বাকি ৭০% সম্ভাবনা (অন্যকোথা বা অন্য কোনোখানে) মহাবিশ্ব থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেল।
উল্লেখিত কোয়ান্টাম ব্যাখ্যায় “সময়” পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষ মনে হলেও নিশ্চিতভাবে এর একটা শুরু ছিল। যাকে আমরা ইতিহাসের শুরু বলতে পারি। অর্থাৎ সময়ের শুরু বিগ ব্যাং থেকে, যা আজ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত। এর আগে বলেছিলাম যে, বিগ ব্যাং-এর প্রথম প্রহরে মহাবিশ্ব এক অনন্য (Singularity) অবস্থায় ছিল। যেখানে ভৌতজগতের সবকিছু অবর্ণনীয় ঘনত্বে এবং কল্পনাতীত কাছাকাছি ছিল। তাই সেই অনন্যতার ব্যাপারে আমাদের যেকোনও ব্যাখ্যা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। এর পরের ঘটনা সম্পর্কে আমাদের পক্ষে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হতে পারে। এখানে স্টিফেন হকিং-এর একটি বিবরণ প্রসঙ্গক্রমে প্রণিধানযোগ্য : তিনি বিগ ব্যাং-এর ১০০ সেকেন্ড থেকে ৩ মিনিট পর্যন্ত কী ঘটেছিল, তা বর্ণনা করেছেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়েই আমাদের বর্তমান মহাবিশ্বের সমস্ত রাসায়নিক উপাদানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এর প্রধান দিকগুলোর বিশ্লেষণ হলো :
[প্রোটন+নিউট্রন] ──> (১০০ সেকেন্ড) ──> [ডিউটেরিয়াম] ──> [হিলিয়াম (২৫%)] + [লিথিয়াম/বেরিলিয়াম (সামান্য)] └──> বাকি প্রোটনসমূহ ──> [সাধারণ হাইড্রোজেন (৭৫%)]
মহাবিস্ফোরণের (Big Bang) প্রায় একশো সেকেন্ড পর, তাপমাত্রা কমে এক হাজার মিলিয়ন ডিগ্রিতে নেমে আসে, যা সবচে’ উত্তপ্ত নক্ষত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার সমান। এই তাপমাত্রায় প্রোটন এবং নিউট্রনগুলোর কাছে শক্তিশালী নিউক্লীয় বলের (strong nuclear force) আকর্ষণ থেকে মুক্ত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত শক্তি অবশিষ্ট ছিল না এবং তারা একত্রে যুক্ত হয়ে ডিউটেরিয়ামের (ভারী হাইড্রোজেন) পরমাণুর নিউক্লিয়াস তৈরি করতে শুরু করে, যা একটি প্রোটন এবং একটি নিউট্রন ধারণ করে। অতঃপর ডিউটেরিয়ামের নিউক্লিয়াসগুলো আরও প্রোটন ও নিউট্রনের সাথে যুক্ত হয়ে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরি করে, যা দুটি প্রোটন, দুটি নিউট্রন ধারণ করে এবং লিথিয়াম ও বেরিলিয়ামের মতো কয়েকটি ভারী উপাদানের সামান্য পরিমাণও ধারণ করে। এখন যে কেউ হিসাব করে দেখতে পারেন যে, এই “হট বিগ ব্যাং মডেল” অনুযায়ী প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রোটন ও নিউট্রন হিলিয়াম নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত হয়েছিল, যার সাথে ছিল সামান্য পরিমাণ ভারী হাইড্রোজেন এবং অন্যান্য উপাদান। অবশিষ্ট নিউট্রনগুলো ভেঙে প্রোটনে পরিণত হয়েছিল, যা মূলত সাধারণ হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াস।
উল্লেখিত অনুচ্ছেদ থেকে জানা গেলো বস্তুজগত শুরুটায় (অতীত) কেমন ছিল। অতঃপর যা হয়েছে তারই বর্তমানরূপ স্থানকালে বিরাজমান এই মহাবিশ্ব, যেখানে আমাদের অস্তিত্ব। ক্ষুদ্র অতিপারমাণবিক কণা থেকে অকল্পনীয় ভরযুক্ত ব্লাকহোল বা কোয়েজার— এ সবই বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী অবস্থা। অর্থাৎ যা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে সেগুলো। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, উপরে মহাজাগতিক ঘড়ি নাই বলেছি, সেটা নিউটনের পরম সময়কে আইনস্টাইনের বিশেষ অপেক্ষবাদে এসে ভেঙে পড়ে তার বিশ্লেষণে। তবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ একটা মহাজাগতিক সময়ের হিসাব করেন। বিগ ব্যাং থেকে সময় এগিয়ে চলছে, তার একটি মহাজাগতিক সময় হিসাব রাখার প্রয়োজনে। যদিও স্থানীয়ভাবে প্রতিটি গ্রহ-নক্ষত্রের সময় ভিন্ন, তবুও সামগ্রিকভাবে পুরো মহাবিশ্বের একটি গড় সময় হিসাব করা যায়। একে বলা হয় কসমিক টাইম। মহাবিস্ফোরণ (Big Bang) থেকে আজ পর্যন্ত মহাবিশ্বের যে বয়স (প্রায় ১৪-বিলিয়ন বছর), তা এই কসমিক টাইম অনুসারেই মাপা হয়।
অন্যদিকে যে বস্তুর ভর ও গতি যত বেশি, সেই বস্তুর অভ্যন্তরীণ সময় ততবেশি ধীর। যেমন, পৃথিবীর ঘড়ির সময় বৃহস্পতির সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। তবে মাত্র কয়েক ন্যানোসেকেন্ড হওয়ার কারণে, এই পার্থক্য মানুষের ইন্দ্রিয়গোচর হবে না; কেবল পারমাণবিক ঘড়িতে এই পার্থক্য ধরা পড়বে। বস্তু যতবেশি ভরযুক্ত ও দ্রুত গতিবেগ সম্পন্ন হবে, তার গায়ে ‘সময়’ তত ধীর লাগবে। মহাবিশ্বে সবচে’ ভরযুক্ত বস্তু আমাদের জানা মতে ব্লাকহোল। তাই এখানের সময় যে ধীর লয়ে চলে, সেটা মানুষ অনুভব করতে পারবে।
উপরে বাস্তবতার একটি মহাজাগতিক ব্যাখ্যা নিউটনীয় বলবিদ্যা ও আইনস্টানের অপেক্ষবাদ অনুসারে দিয়েছিলাম এবং কণাবাদী বলবজ্ঞানের সাথে এগুলোর বৈসাদৃশ্য কী, তারও আংশিক ব্যাখ্যা করেছি। এখন বাস্তবতার কয়েকটি তত্ত্বীয় বিবরণ দেওয়া যাক। আমাদের মনের ধারণা, ইচ্ছা বা বিশ্বাস নিরপেক্ষ বা স্বাধীন অস্তিত্ব যার আছে, তাই বাস্তবতা। মহাজগতের অতীতে যাকিছু ঘটেছে, এই মুহূর্তে যাকিছু ঘটছে আর ভবিষ্যতে কী ঘটবে, সেসবের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ পুরাপুরি না থাকলেও বাস্তবতাকে আমরা বিভিন্নভাবে বর্ণনা করতে পারি। বাস্তবতার ব্যাখ্যায় আমরা অনেক মতামত পাই। নিচে এর ওপর আলোকপাত করা হলো:
প্রথমত বস্তুগত বাস্তবতা : পদার্থ, শক্তি, স্থানকাল, মহাকর্ষ, কোয়ান্টাম জগত প্রভৃতির পরিমাপ ও ব্যাখ্যা পদার্থবিজ্ঞান আমাদের দেয় যে, আমরা এসব নিয়ে চিন্তা না-করলেও বাস্তবে এরা কাজ করে।
দ্বিতীয়ত অভিজ্ঞতামূলক বাস্তবতা : আমরা যেভাবে জগতকে অনুভব করি— রং, স্বাদ, ব্যথা, সুখ ইত্যাদি। এগুলো মূলত আমাদের মস্তিষ্কের ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যাগুলো বাইরের জগতের সাথে মিলে যায় বলেই আমাদের অস্তিত্ব টিকে আছে।
তৃতীয়ত সামাজিক/সাংস্কৃতিক বাস্তবতা : অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, জাতি, ধর্ম, নৈতিকতা ইত্যাদি মানুষের সম্মতিতে তৈরি। এগুলোকে আমরা বাস্তব বলি, কারণ আমরা এগুলো ছাড়া চলতে পারি না। বরং এগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখি, মেনে চলি এবং সেই অনুযায়ী কাজ করি। কিন্তু এসব একটিও প্রাকৃতিক নিয়মের মতো অপরিবর্তনশীল নয়।
চতুর্থত : দার্শনিক বাস্তবতা বা Realism অনুসারে, বাস্তবতা আমাদের মনের বাইরে রয়েছে। এর একটা হলো আদর্শবাদ (Idealism)— এই মতাদর্শ বলে যে, বাস্তবতা চেতনা বা ধারণার ওপর নির্ভরশীল। অন্যটি হলো, প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি— এই মতাদর্শ অনুসারে বলা হয় যে, যা কাজ করে এবং ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম, তাই বাস্তবতা। সনাতন বলবিজ্ঞান এই পথে চলে।
এখন আসি বাস্তবতার আসল কথায়। আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে, বাস্তবতা সম্ভবত কোয়ান্টাম ক্ষেত্র ও স্থানকালের সৃষ্ট। আমাদের চেতনা সেই বাস্তবতারই অংশ, কিন্তু পুরাপুরি নয়। আমরা বাস্তবতার পুরোটা জানতে বা বুঝতে পারি না, কেবল মডেল গঠন করতে পারি, যা ক্রমশ বাস্তব হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য উপরে বাস্তবতাকে অতীত থেকে শুরু করে একমুখী চলা সময়কে বলেছিলাম, যা মহাবিশ্বের বস্তুরাজির আবর্তনের ফলে একগুচ্ছ ঘটনার ইতিহাস তৈরি করে। তবে এই ইতিহাস কেবল একটি মাত্র পথের শেষ নয়, বরং বহুমাত্রিক পথের সমষ্টি। তবে বাস্তবতা সম্পর্কে সনাতনী ব্যাখ্যা একপাক্ষিক ছিল। বাস্তবতা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের (১১ মে, ১৯১৮ – ১৫ মে, ১৯৮৮) ব্যাখ্যা থেকে। তাঁর মতে, বাস্তবতা হলো এমন এক বিস্ময়কর ও জটিল ব্যবস্থা, যা আমাদের সাধারণ ধারণার চেয়ে অনেক বেশি অদ্ভুত। তিনি প্রকৃতিকে বোঝার জন্য গাণিতিক নিয়মের চেয়েও গভীর কৌতূহল এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। এর পেছনের ভাষা হলো গণিত। আমাদের কাজ শুধু সেই নিয়ম বা প্যাটার্ন খুঁজে বের করা। বাস্তবতার প্রকৃতি বুঝাতে ফাইনম্যান কয়েকটি মৌলিক ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রথমত সম্ভাবনার সমষ্টি (Path Integral Formalism) : আমরা জানি যে বস্তুজগৎ শুরুতে কেবল কণা অবস্থায় বিরাজমান ছিল। সেখান থেকেই পরমাণু, অণু এবং প্রথম গ্যাসীয় বস্তু হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের উত্থান ঘটে। অতঃপর অন্যান্য মৌল ও যৌগের গাঠনিক প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং সেই অবস্থার মধ্য থেকেই নেবুলা, নক্ষত্র, গ্রহ প্রভৃতি কিংবা দৃশ্যমান বস্তুরাজির উৎপত্তি। তবে উল্লেখিত কণা মানে অতিপারমাণবিক কণার (Quantum Particle) কথা বলা হয়েছে। যার দ্বারাই ভরযুক্ত বস্তুদের জন্ম হয়েছে (যেমন : গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সির, কোয়েজার, নেব্যুলা কিংবা আমরা)। অর্থাৎ কোয়ান্টাম স্তরে বলবাহী ও ভরবাহী কণাদের নড়াচড়া, মিলন ও বিচ্ছেদের মাধ্যমে মহাবিশ্বের বস্তুজগৎ অস্তিত্বে এসেছে। তবে এই সৃষ্টি কোনও একক পথে হয়নি, তা বস্তুজগতের প্রতি আমাদের অন্তর্দৃষ্টি দিয়েই বোঝা যায়। এ প্রসঙ্গে রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যান বলেছেন যে, কোয়ান্টাম স্তরে একটি কণা (যেমন একটি ইলেকট্রন) ‘ক’ বিন্দু থেকে ‘খ’ বিন্দুতে যাওয়ার জন্য কেবল একটি পথ ব্যবহার করে না, বরং একই সাথে মহাবিশ্বের সম্ভাব্য সব পথই (এমনকি অবাস্তব বা অসম্ভব পথগুলোও) ব্যবহার করে! আমাদের দৃশ্যমান সামষ্টিক বাস্তবতা হলো এই সমস্ত সম্ভাব্য পথ বা ইতিহাসের গাণিতিক সমষ্টি (Sum Over History)।
দ্বিতীয়ত তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা (Web-Particle Duality) : আমাদের মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে তরঙ্গ অথবা কণা, এই দু’ভাবে বিচার করতে অভ্যস্ত। কিন্তু রিচার্ড ফাইনম্যান স্পষ্ট করেছেন যে, অতিপারমাণবিক কণারা বিলিয়ার্ড বল কিংবা পানির ঢেউ— উভয়ের একটারও মতো আচরণ করে না। বরং এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নিয়মে চলে, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো শব্দ নাই। কেননা আমরা এমন কোনও বস্তু দেখি না, যেটা একই সাথে একটা পিংপং বল কিংবা তরঙ্গরূপে চলে। এর উদাহরণ দেওয়ার মতো বস্তু আমরা কখনও দেখিনি। তাই কাউকে বস্তুকণাদের ব্যতিচারের বাস্তবরূপকে হুবহু বুঝানো যায় না। তবে এর প্রভাবের বর্ণনা দেওয়া যায়। অতিপারমাণবিক কণাদের আচরণের বাস্তবতা যে আসলেই দ্বৈত, এ প্রসঙ্গে বাকিবল দ্বি-চিড় পরীক্ষার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা প্রয়োজন : ১৯৯৯ সালে বিজ্ঞানী অ্যান্টন জেইংলার ও মার্কাস আর্ন্ড-এর নেতৃত্বে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল পদার্থবিজ্ঞানী একটি প্রতিবন্ধক (Partition) লক্ষ্য করে ফুটবল আকৃতির একগুচ্ছ অণু নিক্ষেপ করেছিলেন। ষাটটি কার্বন পরমাণু দিয়ে গঠিত এই অণুগুলোকে মাঝেমধ্যে বাকিবল (Buckyballs) বলা হয়; কারণ স্থপতি বাকমিনস্টার ফুলার এই আকৃতির কতগুলো ভবন নির্মাণ করেছিলেন। ফুলারের ভূ-তত্ত্বীয় গম্বুজগুলো সম্ভবত পৃথিবীতে বিদ্যমান ফুটবলের আকৃতির সবচে’ বড় বস্তু ছিল। আর বাকিবলগুলো ছিল সবচে’ ছোট।
এই পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা কথিত বাকিবল অণুগুলোকে নিক্ষেপ করার জন্য যে প্রতিবন্ধক নির্মাণ করেছিলেন, সেটিতে দুটি চিড় বা সূক্ষ্ম ফুটো (slit) ছিল, যার মধ্য দিয়ে বাকিবলগুলো পার হতে পারে। তবে বাকিবল অণুগুলোর ব্রগলি তরঙ্গদৈর্ঘ ছিল অতিশয় ক্ষুদ্র— প্রায় ২.৫ পিকোমিটার (2.5 x 10-12 M), যা একটি কার্বন পরমাণুর চেয়ে ১০০-গুণ ছোট। তাই সাধারণ কোনও পার্টিশন দিয়ে এই পরীক্ষা সম্ভব ছিল না। তাই বিজ্ঞানীরা সিলিকন নাইট্রেড দিয়ে গঠিত পার্টিশন (Drefraction Grating) ব্যবহার করেন। যার প্রতিটি চিড়ের (ফুটো) ব্যাসার্ধ ছিল ৫০-ন্যানোমিটার এবং একটা থেকে অন্যটার দূরত্ব ছিল ১০০-ন্যানোমিটার। এর ঠিক পিছন বরাবর একটি পর্দা টানানো হয়, যাতে নির্গমনশীল অণুগুলো পর্দার ওপর পড়ে এবং শনাক্ত ও গণনা করা যায়। প্রসঙ্গত চিড় অতিক্রম করে অণুগুলো কোথায় গিয়ে পড়ছে তা কিন্তু সাধারণ পর্দায় দেখা সম্ভব ছিল না। এজন্য একটি অভিনব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীরা স্ক্রিনের সামনে একটি লেজার রশ্মি স্থাপন করেন। লেজারটি বাকিবল অণুগুলোকে আয়নে (Ion) রূপান্তরিত করে। অতঃপর একটি মাস স্পেক্ট্রোমিটারের মাধ্যমে সেই আয়নগুলোকে নিখুঁতভাবে গণনা করা হয়। এই পরীক্ষায় ব্যবহৃত বাকিবলগুলো ছিল ৬০টি কার্বন পরমাণু দিয়ে গঠিত একটি বিশাল ত্রিমাত্রিক অণু (C60), যা দেখতে হুবহু ফুটবলের ন্যায়। প্রতিটি ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় ১৩ লক্ষ গুণ ভারী ছিল।
আমরা যদি আসল ফুটবল নিয়ে এমন সমরূপ একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে চাই, তবে একজন আনকোরা খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হবে, যার লক্ষ্য কিছুটা নড়বড়ে, কিন্তু আমাদের পছন্দসই একটি নির্দিষ্ট গতিতে ক্রমাগত বলে কিক করার সক্ষমতা তার রয়েছে। আমরা এই খেলোয়াড়কে দুটি ফুটোযুক্ত (slit) একটি দেওয়ালের সামনে দাঁড় করাবো। দেওয়ালের ওপাশে এর সমান্তরালে আমরা একটি বেশ লম্বা জাল স্থাপন করবো। খেলোয়াড়ের বেশিরভাগ শর্টই দেয়াল আঘাত করে পিছনের দিকে ফিরে আসবে। তবে কিছু কিছু শর্ট কোনও-না-কোনও ফুটো গলে জালে গিয়ে পড়বে। এই পর্যায় দেওয়ালের ফুটোদুটি যদি বলের আকারের চেয়ে সামান্য বড় হয়, তবে ওপাশে খুবই সোজা দুটি বলের ধারা গঠিত হবে। আর যদি আগের ফুটোদুটি চেয়ে আরেকটু বড় হয়, তবে বলের ধারাদুটি কিছুটা দু’দিকে ছড়িয়ে পড়বে। আমরা এখন যদি একটি ছিদ্র বন্ধ করে দেই, তবে এই বন্ধ ফুটো দিয়ে বলের ধারা আর ওপাশে যেতে পারবে না। কিন্তু অপর ফুটো থেকে বল যাওয়ার ধারা বন্ধ হবে না। আমরা যদি বন্ধ ফুটোটি আবার খুলে দেই, তবে তা ওপাশের যেকোনও নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে পড়া বলের সংখ্যা কেবল বাড়িয়ে দেবে। কারণ তখন যে ছিদ্রটি খোলা ছিল, তা দিয়ে পার হওয়া সমস্ত বলের সাথে, পুনরায় খুলে দেওয়া ফুটো থেকে আসা অন্যান্য বলও পিছনের জালে পড়তে দেখবো আমরা। অন্যকথায়, উভয় ফুটো খোলা থাকা অবস্থায় আমরা যা পর্যবেক্ষণ করি, তা হলো দেওয়ালের প্রতিটি ফুটো আলাদাভাবে খোলা থাকা অবস্থায় যা দেখা যায়, তার সমষ্টি। এটি সেই বাস্তবতা যার সাথে আমরা দৈনন্দিন জীবনে অভ্যস্ত।
কিন্তু অস্ট্রিয়ার গবেষকরা বাকিবল অণুগুলো নিক্ষেপ করার ফলশ্রুতি তদ্রূপ ছিল না। অস্ট্রিয়ার পরীক্ষায়, দ্বিতীয় ছিদ্রটি খুলে দেওয়ার ফলে পর্দার কিছু বিন্দুতে অণু পৌঁছানোর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু অন্যান্য বিন্দুতে সংখ্যাটা হ্রাস পেয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, পর্দায় এমন কিছু স্থান দেখা যায় যেখানে উভয় ছিদ্র খোলা থাকা অবস্থায়ও কোনও বাকিবল পড়েনি। অথচ দুটোর একটি কিংবা অন্য ছিদ্রটি খোলা থাকা অবস্থায় সেখানে আনকোরা খেলোয়াড়ের শর্ট করা বলগুলো জালে পড়েছিল। আর বাকিবল পরীক্ষায় দ্বি-চিড় প্রতিবন্ধকের পিছনের পর্দার পুরো চিত্রটি ব্যতিচার (interference) বিন্যাসের বা তরঙ্গের মতো লাগছিল! এটি খুবই অদ্ভুত বলে মনে হয়— দ্বিতীয় ছিদ্রটি (slit) খুলে দেওয়া সত্ত্বেও কেমনে নির্দিষ্ট কিছু বিন্দুতে কমসংখ্যক অণু পতিত হলো? মোটকথা এতবড় ও জটিল একটি রাসায়নিক অণুকেও যখন জোড়া চিড় বা গ্রেটিংয়ের ভিতর দিয়ে পাঠানো হয়, সেটিও তরঙ্গের মতো আচরণ করে এবং স্ক্রিনে ফাইনম্যানের তত্ত্ব অনুযায়ী ব্যতিচার প্যাটার্ন )Interference Pattern) তৈরি করে।
১৯৪০ সালে রিচার্ড ফাইনম্যান কোয়ান্টাম ও নিউটনীয় জগতের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ অন্তর্জ্ঞান লাভ করেছিলেন। দ্বি-চিড় পরীক্ষায় ব্যতিচার রহস্য এ ব্যাপারে তাঁকে আরও আগ্রহী করে তোলে। তবে দুর্ভাগ্যবশত ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকিবল পরীক্ষার প্রায় একযুগ আগে তিনি মারা যান। এই পরীক্ষা দেখলে হয়তো তিনি আরও জানতেন যে, কণাবাদী ব্যাতিচার শুধু অতিপারমাণবিক কণারাই (যেমন ইলেকট্রন বা ফোটন) করে না। বরং পরমাণু এমনকি ৬০-টি পরমাণু দিয়ে গঠিত বিশাল আকারের কণাদের দ্বারাও একই কাজ সম্ভব। অবশ্য এর পর আরও বড় কণা দিয়ে একই পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, এব্যাপারে পরে আসছি।
কোয়ান্টাম দ্বি-চিড় পরীক্ষায় দুটি ফুটো (slit) খোলা রেখে যখন বস্তুকণারা যায়, তখন যে বিন্যাসটি আমরা পাই, তা কিন্তু পরীক্ষাটি দুবার চালানো (একবার একটি ফুটো খোলা রেখে এবং আরেকবার শুধু অন্য ফুটোটি খোলা রেখে) থেকে প্রাপ্ত বিন্যাস দুটির যোগফল নয়। এর বদলে যখন উভয় চিড় খোলা থাকে, তখন আমরা পিছনের পর্দার ওপর আলোকোজ্জ্বল এবং অন্ধকার ব্যান্ডের (light and dark bands) একটি অনুক্রম (series) দেখতে পাই এবং কিছু অঞ্চল দেখা যায়, যেখানে কোনও কণা গিয়ে পড়ে না। এর মানে হলো, কেবল এক নম্বর চিড়টি খোলা থাকলে কণাগুলো অন্ধকার ব্যান্ড যে অঞ্চলে হয়েছে, দুই নম্বর চিড়টি খোলা রাখা অবস্থায়ও বাকিবল অণুগুলো সেখানে পড়েনি। এটা মনে হয় যেন, উৎস থেকে পর্দায় যাওয়ার যাত্রাপথের কোনও এক পর্যায়ে কণাগুলো উভয় চিড় সম্পর্কেই তথ্য সংগ্রহ করে। এই ধরনের আচরণ দৈনন্দিন জীবনে আমাদের চারপাশের বস্তুগুলোর আচরণের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাস্তব জীবনে একটি বল দুটি চিড়ের যেকোনও একটির মধ্য দিয়ে পথ অনুসরণ করে। কিন্তু অন্যটার কী হলো, তা দ্বারা প্রভাবিত হয় না। অর্থাৎ আমাদের দেখা বাস্তবতা হলো একমুখী। আর কোয়ান্টাম জগতের বাস্তবিতা হলো বহুমুখী।
উল্লেখ্য দ্বি-চিড় পরিক্ষা কেবল যে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানীরা ১৯৯৯ সালে চালিয়েছেন তা নয়। এই পরীক্ষা প্রথম চালিয়েছিলেন বিজ্ঞানী থমাস ইয়াং ১৮০১-সালে, আলো (ফোটন কণা) দিয়ে। তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রাসার লাভ করেনি। এতে তিনি কণার তরঙ্গ-রূপ প্রথম দেখতে পান। ১৯০৯-সালে জি আই টেইলর আলোর কণার নাম ফোটন জানতে পেরে, আলোর তীব্রতা খুবই কমিয়ে দ্বি-চিড় পরীক্ষা চালান। তিনিও একই তরঙ্গ দেখতে পান। ১৯৬১-সালে বিজ্ঞানী ক্লাউস জনসন বিজ্ঞানী লুই আই ব্রগলির ভাষ্যমতে সমস্ত উপ-পারমাণবিক কণারই তরঙ্গ-রূপ রয়েছে শুনে, ইলেকট্রনের দ্বারা এই পরীক্ষা চালান এবং ফলাফল একই হয়। বিজ্ঞানী পিয়ার জিওর্জিও মার্লি ১৯৭৪-সালে ও আকিরা তোনোমুরা ১৯৮৯-সালে হিটাচি ল্যাবরেটরিতে এই দ্বি-চিড় পরীক্ষা চালান এবং ব্যতিচার ফলাফলই দেখতে পান। রিচার্ড ফাইনম্যান তাঁর নোবেল লেকচারে যে কাল্পনিক চিন্তা করেছিলেন, একটি ইলেকট্রন একসাথে সব পথে যায়, দ্বি-চিড় উল্লেখিত প্রতিটি পরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়। উভয় বিজ্ঞানী এক এক করে সিঙ্গেল ইলেকট্রন ফায়ার করেন। দেখা গেল, প্রতিটি ইলেকট্রন নিজেই নিজের সাথে ব্যতিচার ঘটিয়ে পর্দায় বিন্দু বিন্দু দাগ ফেলে অবশেষে সম্পূর্ণ ডোরাকাটা প্যাটার্ন তৈরি করেছে। ১৯৭০-সালে এই পরীক্ষা ভারী কণা নিউট্রন দিয়ে করা হয়। ইলেকট্রনের সফলতার পর বিজ্ঞানীরা পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রন কণা দিয়ে এই পরীক্ষা চালান। নিউট্রন ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় ১৮৩৮ গুণ ভারী। এত ভারী ও চার্জহীন একটি কণাও কোয়ান্টাম তরঙ্গের নিয়ম মেনে দ্বি-চিড় পরীক্ষায় ব্যতিচার বৈশিষ্ট তৈরি করে। অতঃপর ১৯৮০-এর শেষ দিকে বিজ্ঞানীরা উপ-পারমাণবিক কণা বাদ দিয়ে ভারী কণা দিয়ে এই পরিক্ষা শুরু করেন। পরমাণুর ভিতরে নিজস্ব নিউক্লিয়াস এবং ইলেকট্রনের কক্ষপথের মতো জটিল অভ্যন্তরীণ গঠন থাকে। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রমাণ করে যে, সামগ্রিকভাবে পরমাণু, অণু বা তারচে’ ভারী বস্তুকণারা ফাইনম্যানের “সমস্ত পথের সমষ্টি” নিয়ম মেনে চলে এবং ব্যাতিচার বৈশিষ্ট্য তৈরি করে।
তৃতীয়ত গাণিতিক সত্য বনাম মানসিক প্রতিচ্ছবি : বাস্তবতাকে মানুষ মনের মধ্যে একটি ছবির মতো কল্পনা করতে চায়। ফাইনম্যান তাঁর নোবেল লেকচারে বলেছিলেন যে, প্রকৃতিকে বর্ণনা করার জন্য কোনও একক মানবিক বিবরণ বা মডেল নিখুঁত হবে না। সমীকরণগুলো যেভাবে কাজ করে এবং পরীক্ষার মাধ্যমে যা প্রমাণিত হয়, সেটাই আসল বাস্তবতা। তা আমাদের মস্তিষ্কের কাছে যতই অদ্ভুত লাগুক না কেন!
চতুর্থত অনিশ্চয়তা ও অজ্ঞতার গ্রহণযোগ্যতা : বাস্তবতা সম্পর্কে ফাইনম্যানের দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিরাট অংশজুড়ে ছিল ‘অনিশ্চয়তা’। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিজ্ঞান সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না, বরং সত্যের সন্ধান করে। এক্ষেত্রে তাঁর মতামত হলো, “ভুল উত্তর নিয়ে জীবন কাটানোর চেয়ে, উত্তর না-জেনে সংশয়ের মধ্যে বসবাস অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।“ এটা ছিল ফাইনম্যানের জীবন দর্শন। তিনি মানুষের তৈরি কোনও ধারণার ছকে বাস্তবতাকে বেঁধে রাখার পক্ষপাতি ছিলেন না। সকল প্রকার প্রথাগত অন্ধবিশ্বাস ও ধারণা ত্যাগ করে প্রকৃতির নিজস্ব গাণিতিক ও কোয়ান্টাম রূপকে মেনে নেওয়ার পক্ষেই তিনি ছিলেন।
বহুপথ প্রসঙ্গে স্টিফেন হকিং-এর ভাষ্য হলো : চিরায়ত পদার্থবিদ্যায় গতির একটি প্রধান শর্ত হলো, বস্তুর একটি সুনির্দিষ্ট গতিপথ (Trajectory) থাকবে। আপনি যদি একটি ফুটবলকে কিক করেন, সেটি খোলা স্থানে একটি নির্দিষ্ট বাঁকা পথ ধরে লক্ষ্যবিন্দুতে পৌঁছাবে। কিন্তু কোয়ান্টাম স্তরে কণাগুলোর কোনও নির্ধারিত অবস্থান থাকে না। উৎস থেকে ছোঁড়ার পর এবং পর্দায় গিয়ে আঘাত করার আগের মধ্যবর্তী সময়ে কণাটি ঠিক কোথায় ছিল, এই প্রশ্নের কোনও একক উত্তর কোয়ান্টাম ফিজিক্সে নাই। কিন্তু ফাইনম্যান এ প্রসঙ্গে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর তৈরি করেন, যার অর্থ দাঁড়ায় “সব পথই সঠিক”। অন্যরা যখন ভাবছিলেন যে, তদ্রূপ কিছু হলে, কণাটির হয়তো কোনও নির্দিষ্ট পথ নেই, ফাইনম্যান তখন এক ব্যাখ্যা দেন, “কণাটির কোনও পথ নেই ব্যাপারটি তা নয়, বরং এর সম্ভাব্য সব পথই সঠিক!” কণাটি একই সাথে চিড়-১ দিয়েও যায়, চিড়-২ দিয়েও যায়, আবার একই সাথে ল্যাবরেটরির ছাদ ছুঁয়েও পর্দায় পৌঁছায়। যেহেতু কণাটি একই সাথে সবগুলো পথ দিয়ে যায়, তাই সে একই সাথে জানতে পারে দুটি চিড়ই খোলা আছে নাকি একটি বন্ধ। আর একারণেই পর্দায় ব্যতিচার বিন্যাস তৈরি করা কণাটির পক্ষে সম্ভব হয়।
ফাইনম্যানের তত্ত্ব মহাবিশ্ব বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিলেও আধুনিক বিজ্ঞানে পরবর্তী আবিষ্কারগুলো এবং সামসময়িক কয়েকটি তত্ত্বের সাথে এর সূক্ষ্ম অমিল বা সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত কোয়ান্টাম ডিকোহেরেন্সের সাথে অমিল। এই তত্ত্ব অনুসারে, কণাগুলো যখনই একেঅপরের সাথে বা পরিবেশের সাথে ধাক্কা খায়, তখন এই বহুমাত্রিক পথগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং কেবল একটি মাত্র বাস্তব পথ টিকে থাকে। এই কারণেই পরমাণুর স্তরে ফাইনম্যানের বহুমাত্রিক পথ সত্য হলেও আমাদের চারপাশের বড় বস্তুর (যেমন গ্রহ, নক্ষত্র বা মানুষের) ক্ষেত্রে এটি কাজ করে না। চাঁদের পক্ষে একই সাথে হাজারটা পথ দিয়ে ঘোরা সম্ভব নয়। আরও স্পষ্ট বললে, কণারা সংবদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন (Coherence) ও অসংবদ্ধ বা অবিচ্ছিন্ন (Decoherence) উভয় অবস্থায়ই থাকতে পারে। ফাইনম্যানের ব্যাখ্যায় কেবল কণাদের বিচ্ছিন্ন অবস্থার কথা বলা হয়। কিন্তু কণারা বাস্তবে অবিচ্ছিন্ন অবস্থায় না-এলে মহাবিশ্ব এখন একটা কণাবাদী মহাজগৎ অবস্থায় থাকতো। কণাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ছোটাছুটি করতো। ফলে ভৌতজগতের সৃষ্টি হতো না। আর এই লেখাটি লেখার জন্য আমার জন্ম হতো না! মহাবিশ্বের বাস্তবতায় কিছুই নিরবিচ্ছিন্নভাবে সর্বদা বিচ্ছিন্ন বা একা থাকতে পারে না। পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বা ধাক্কা খাওয়ার ফলশ্রুতিতে কণাদের সেই বহুমাত্রিক রহস্যময় পথগুলো একেঅপরকে ধ্বংস করে দেয়। একেই বলে ডিকোহেরেন্স।
দ্বিতীয়ত মহাকর্ষের সাথে অমিল। ফাইনম্যানের এই তত্ত্বটি আলো এবং ইলেকট্রনের জন্য (কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স) নিখুঁতভাবে কাজ করলেও আধুনিক বিজ্ঞানের সবচে’ বড় চ্যালেঞ্জ মহাকর্ষের ক্ষেত্রে এটি আজ পর্যন্ত সফল হয়নি। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা (যা স্থানকালের বক্রতা তৈরি করে) এবং ফাইনম্যানের পাথ ইন্টিগ্রালকে যখন একসাথে মেলানোর চেষ্টা করা হয়, তখন গণিত ভেঙে পড়ে এবং অসীম (Infinity) উত্তর আসে। ঝামেলাটা হলো : আমরা জানি যে মহাকর্ষ কণার নাম গ্রাভিটন (যদিও অনাবিষ্কৃত এখনও)। ফাইনম্যানের হিসাবে গ্র্যাভিটন কণারা যখন অগণিত পথ দিয়ে যাবে, তখন তার নিজের ভরের কারণে চারপাশের স্থানকালকে প্রতি মুহূর্তে বাঁকিয়ে দেবে। স্থানকাল বেঁকে যাওয়ার কারণে কণাটির পথগুলোও বেঁকে যাবে। পথ বেঁকে যাওয়ার কারণে মহাকর্ষের তীব্রতা আরও বেড়ে যাবে এবং স্থানকাল আরও বেশি বাঁকবে। এইভাবে ক্রমশ হিসাব করতে গিয়ে যখন ফাইনম্যানের গাণিতিক যোগফল (Integration) করা হয়, তখন সমীকরণের উত্তর আসে অসীম (Infinity)! পদার্থবিজ্ঞানে অসীম মানে হলো, তত্ত্বটি সেখানে কাজ করছে না কিংবা সমীকরণটি ভেঙে পড়েছে। আলো বা ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে ফাইনম্যান এই অসীমকে একটি বিশেষ গাণিতিক কৌশল (Renormalization) দিয়ে দূর করতে পেরেছিলেন। কিন্তু মহাকর্ষের ক্ষেত্রে এই কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
ফাইনম্যানের এই সীমাবদ্ধতার কারণে আধুনিক বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন যে, মহাবিশ্বের চূড়ান্ত সত্য বুঝতে হলে, আমাদের ফাইনম্যানের “বিন্দু-কণা” (Point-like particles) ধারণার বাইরে যেতে হবে। সামসময়িক বিজ্ঞান এই সমস্যা দূর করতে দুটি প্রধান তত্ত্ব নিয়ে কাজ করছে : প্রথমত স্ট্রিং থিওরি। এই তত্ত্ব বলে যে, মহাবিশ্বের মূল উপাদান কোনও বিন্দু-কণা নয়। বরং এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র শক্তির কম্পনশীল সুতো (String)। কণাগুলো বিন্দু না হয়ে সুতোর মতো প্রসারিত হওয়ায় ফাইনম্যানের সমীকরণের সেই ‘অসীম’ সমস্যাটি দূর হয় এবং মহাকর্ষের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মেলবন্ধন ঘটে। দ্বিতীয়ত লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। এই তত্ত্বের দাবি হলো, স্থানকাল কোনও মসৃণ কাপড় নয়। বরং এটি নিজেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম চক্রাকার ফাঁস (Loop) দিয়ে তৈরি। ফলে মহাকর্ষের একটি সর্বনিম্ন সীমা রচিত হয়। যার কারণে সমীকরণ আর অসীমের দিকে যেতে পারে না। সহজ কথায়, ইলেকট্রন, প্রোটন বা কোয়ার্ক ইত্যাদি কণাগুলো যতই ক্ষুদ্র হোক, লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি অনুযায়ী, স্থানকাল জালের চক্রাকার ফাঁসের (Loop) আকার (প্রায় ১০–৩৫ মিটার বা প্ল্যাঙ্ক স্কেল) এদের (উপ-পারমাণবিক কণাদের) চেয়ে আরও অনেকগুণ ছোট ও সূক্ষ্ম। সুতরাং কোয়ান্টাম ডিকহেরেন্সের সাথে লুপ তত্ত্বের একটা নিগুঢ় সম্পর্ক রচিত হয়েছে। কণারা বিচ্ছিন্নভাবেই স্থানকাল জালের চক্রাকার ফাঁসের আয়তনের চেয়ে অনেকগুণ বড়। তারপর যদি কণাদের অবিচ্ছিন্ন অবস্থা তৈরি হয়, তবে তো কণাবাদী মহাকর্ষের পক্ষে অসীম হয়ে যাওয়ার কোনও চাঞ্চ নাই। আসলে বিজ্ঞানের সমীকরণগুলোতে অসীমের স্থান নেই।
তৃতীয়ত ফাইনম্যান নিজে দর্শনের চেয়ে গাণিতিক ফলাফলের ওপর বেশি জোর দিতেন। তাঁর বিখ্যাত নীতি ছিল “Shut up and calculate!” (চুপ থাকো এবং হিসাব করো)। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের বড় একটা অংশ (যেমন তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা) মনে করে যে, কেবল হিসাব মিললেই হবে না, কণাটি বাস্তবে কেন সব পথ দিয়ে যাচ্ছে তার একটি গভীর মহাজাগতিক ও দার্শনিক উত্তর খোঁজা জরুরি।
কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার আদি রূপকারদের একজন ছিলেন ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ (ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স) ও আরউইন শ্রোডিঙ্গার (ওয়েভ মেকানিক্স)। শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ কোয়ান্টাম জগতকে ব্যাখ্যা করে তরঙ্গের মাধ্যমে। ফাইনম্যান এসে গণিত ও ভৌত চিন্তার ধরনটি পুরোপুরি বদলে দিলেন। তিনি তরঙ্গের বদলে কণার ‘যাত্রাপথ এবং তার ইতিহাসের সমষ্টি’ (Sum over Histories)-কে গণিতের মূল ভিত্তি বানালেন। বিজ্ঞানীদের জন্য সবচে’ স্বস্তির বিষয় হলো, ফাইনম্যানের এই নতুন ও সহজলভ্য পদ্ধতির গাণিতিক হিসাবগুলো শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণের ফলাফলের সাথে শতভাগ মিলে যায়। অর্থাৎ পথ ভিন্ন হলেও তারা একই গন্তব্যে পৌঁছান, যার প্রকৃত ব্যাখ্যা আসে মহাবিশ্বের বাস্তবতা থেকে।
মহাবিশ্বের বাস্তবতার চিত্র প্রকৃত অর্থে যে কী পদ্ধতিতে পাওয়া যায়, সেটা কণাবাদী বলবিজ্ঞান না আসলে হয়তো মানুষের পক্ষে জানা হতো না। অগণিত পথ অবলম্বন করেই কেবল একটি সম্ভাবনার প্রকৃত ফলাফল লাভ করা যায়। নির্দিষ্ট কোনও একক ব্যাপার বা পথ এক্ষেত্রে কোনও কাজ করে না। এক্ষেত্রে একটি সাধারণ ধারণা (Macroscopic Idea) হলো, ধরুন আপনি মতিঝিল চিনেন, এর মানে সেখানে পৌঁছানোর সম্ভাব্য প্রতিটি পথই আপনার জানা। অপনি মুগ্ধা, শাহজাহানপুর, মালিবাগ, বিজয়নগর,পল্টন, কমলাপুর, যাত্রাবাড়ি, নবাবপুর, ওয়ারি এমনকি শহিদবাগের চিপা দিয়ে বের হয়ে রাজারবাগের পথ ধরে মতিঝিল যেতে পারেন। অন্যথায় আপনি স্থানটি চিনেন না। কারণ একটি পথ ভুলে যাওয়া বা যেকোনও কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কণাবাদী পদার্থবিজ্ঞানও এরকম, তবে আরেকটু কঠিন করে মহাবিশ্বের বাস্তবতার চিত্র আঁকে, যেটা ফাইনম্যানের “ইতিহাসের সমষ্টি” পদ্ধতি দিয়ে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করা যায়। তবে বাস্তবতার পরিপূর্ণ বা সর্বশেষ চিত্র আঁকা যায় না। কারণ মহাবিশ্বের বাস্তবতায় একটা সমাধান, নতুন করে অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করে; যেমন : ফাইনম্যানের “ইতিহাসের সমষ্টি” বাস্তবতার একটি দারুণ ব্যাখ্যা হলেও তা প্রশ্নাতীত ছিল না। এই প্রশ্ন থকেই কিন্তু লুপ কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি (LQG) এসেছে। মহাবিশ্বের বাস্তবতার চিত্রের ধারাবাহিক বর্ণনা এভাবেই দেওয়া যায়, যা দ্বি-চিড় বাকিবল পরীক্ষার মতো হিজিবিজি লাগলেও ভ্রান্ত বলা যাবে না।
এই প্রবন্ধের শুরুতে বলেছিলাম যে, বাস্তবতার চিত্র আঁকতে হলে, এটা কীভাবে হলো, সেটা আগে জানতে হবে। বাস্তবতার চিত্র কেমন হওয়া প্রয়োজন, তার ব্যাখায় আমি নিউটনীয় বলবিজ্ঞান, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ও আধুনিক কণাবাদী বলবিজ্ঞানের বিশেষ অংশগুলো প্রসঙ্গক্রমে তুলে ধরেছি। তবে এটা মহাবিশ্বের বাস্তবতার নিরেট রূপায়ণ (Model) সরাসরি না-হলেও কাছাকাছি (Approximation) বলা যায়। আর মহাবিশ্বের এমন বাস্তবতা কেন হলো বা এর উদ্দেশ্য কী, সেটা বুঝতে হলে আমাকে ঈশ্বরের সাথে আলাপ করতে হবে। কিন্তু এই কাজ কারও পক্ষে কখনও সম্ভব না। কেননা ঈশ্বরকে যদি মহাবিশ্বের স্রষ্টা ভাবা হয়, তবে তিনি কোনও আপক্ষিক, চতুর্মাত্রিক গুণাবলী সম্পন্ন কিংবা কোনও ওয়েবফাংশন গঠিত নয়, যে তার হদিস পাওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব। অর্থাৎ ভৌতজগতের কোনও রূপায়ণ তার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই মানানসই নয়। এমনকি তাঁর সম্পর্কে চিন্তা পর্যন্ত করা সম্ভব নয়। একটা উদাহরণে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয় তাহলো, বিগ ব্যাং-এর প্রথম প্রহরে যে অনন্য অবস্থা ছিল, তাই আমাদের বোধগম্য নয়। তাইলে সেই অবস্থা যদি ঈশ্বর সৃষ্টি করেন, তবে তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান আরোহন কী করে সম্ভব?
এই প্রবন্ধে আমরা জানলাম যে, বাস্তবতার চিত্র আসলে সময়ের সীমায় আমাদের পরিবেশেই থাকে এবং এটা কীকরে হলো তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থেকেই কেবল মেলে। তবে সময়ের ঘটনাসমূহ গঠিত হয় বহুমুখী অনিশ্চিত পথের সমন্বয়ে সম্ভাবনাময় একটি সমাধানের দ্বারা। কোনও একটিমাত্র নির্দিষ্ট পথ ধরে নয়। অর্থাৎ বাস্তবতার চিত্র হলো একগুচ্ছ ইতিহাসের সমষ্টি। এই ইতিহাসগুচ্ছের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার দ্বারাই আমরা একটি আগন্তুক ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করি। এতদ্ব্যতীত যেসকল বাস্তবতার কথা বলা হয়, তার সবই আসলে একমুখী ও অপ্রমাণিত। একমুখী নীতির দ্বারা জগতের বাস্তবতাকে যাচাই করা হলে ফলাফল কখনও বাস্তবতার চিত্র হয় না, বরং নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে এবং বাস্তবে আমরা তাই দেখি। ফলে মানবসমাজে বিজ্ঞান চিন্তার চেয়ে অন্ধবিশ্বাসের প্রসার ঘটে বেশি। যেটাকে কেবল চিরন্তন নিয়তি বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করা যায়। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র এত্থেকে পুরাপুরি ভিন্ন, যা কোয়ান্টাম স্তরের ইতিহাসগুচ্ছে রয়েছে! যেখানে মহাবিশ্ব অস্তিত্বে এসেছিল।
পরিশেষে আমি বিশ্বাস করি যে, এই প্রবন্ধের প্রতিটি অনুচ্ছেদের তীব্র সমালোচনা হওয়া সম্ভব; যেমন : লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটির সাথে কোয়ান্টাম ডিকহেরেন্সের নিগুঢ় সম্পর্কের কথা বলেছি, যা আসলে এখনও প্রমাণিত নয়। এই তত্ত্ব প্রমাণ করতে যে যন্ত্র লাগবে, তার আয়তন প্রায় একটি গ্যালাক্সির সমান হতে হবে। তাই এসব কেবলই বৈজ্ঞানিক অনুমান, যা কখনও হয়তো প্রমাণিত হবে না। তাতে সমস্যা নাই। বৈজ্ঞানিক চিন্তা যদি সমলোচনা ভয় পায়, তবে সেটা বিজ্ঞান ভিত্তিক ভ্রান্ত বিষয় নিয়ে চর্বিতচর্বণ দ্বারা অন্ধবিশ্বাসের (dogmatism) প্রসার ঘটানো ছাড়া অন্যকিছু নয়। এরকম ভুল পথের চেয়ে শ্বাপদসঙ্কুল সঠিক পথে হাঁটা উত্তম।































































