সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সমাজে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সংবাদ শিরোনামে প্রায়ই দেখা যায়—“রাজধানীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড”, “বিমানবন্দরে আগুন”, “কারখানায় প্রাণহানি”, বিদ্যালয়ে অগ্নিকান্ড, চট্টগ্রামের বহুতল ভবনে অগ্নিকান্ড, চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ড, বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড বাজার পুড়ে ছাই ইত্যাদি। একসময় এসব খবর ছিল ব্যতিক্রম; এখন তা যেন দৈনন্দিন ঘটনার মতো।
প্রশ্ন উঠছে—এগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র, স্বার্থ বা উদ্দেশ্যের ফল? বাংলাদেশের নগরজীবনে অগ্নিকাণ্ড এখন এক আতঙ্কের নাম। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ ঘাটতি। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নেই, জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ, বৈদ্যুতিক তারের জট, পুরনো সংযোগ, রাসায়নিক দ্রব্যের অবৈধ মজুদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক বিপজ্জনক বাস্তবতা। দমকল বিভাগ প্রায় প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের পরই বলে—“সরু রাস্তা ও পানির অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হয়েছে।” অথচ এসব সমস্যা বছরের পর বছর অপরিবর্তিত। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিন্তু রিপোর্ট হারিয়ে যায় প্রশাসনিক গহ্বরে। দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা হয় না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এক লাখ ২১ হাজারের বেশি। এর মধ্যে তদন্তে দেখা গেছে, অন্তত ৯৯০টি আগুন লাগানো হয়েছিল উদ্দেশ্যমূলকভাবে—অর্থাৎ প্রতিশোধ, শত্রুতা বা সংঘাতের কারণে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে সাত শতাধিক, ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। শুধু ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মোট ২৬,৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ১৪০ জন নিহত এবং ৩৪১ জন আহত হয়েছেন—দিনে গড়ে প্রায় ৭৩টি। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের “Kacchi Bhai” রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন নিহত হন। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজারে কেমিক্যাল গোডাউনে বিস্ফোরণে ২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। উভয় ঘটনায়ই পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। প্রায় সব অগ্নিকাণ্ডের পেছনে এক ভয়ানক অবহেলার চিত্র স্পষ্ট। ভবনমালিকরা নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অনাগ্রহী, কারণ তা ব্যয়বহুল। তদারক সংস্থাগুলো ঘুষ বা প্রভাবের কারণে চোখ বুজে থাকে। ফলে আইন থাকে কাগজে, বাস্তবে অনিয়ম চলে অবলীলায়। বছরের পর বছর জমতে থাকা এই ঝুঁকিই একদিন আগুন হয়ে পুড়িয়ে দেয় মানুষ, স্বপ্ন, জীবন ও সংসার।
সব অগ্নিকাণ্ড যে দুর্ঘটনা, তা নয়। অনেক ঘটনার পেছনে কাজ করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের জটিল উদ্দেশ্য। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে বীমার টাকা আদায় করেন; পুরনো ভবন পুড়িয়ে নতুন প্রকল্প বা নির্মাণের সুযোগ তৈরি করেন। পুরনো মার্কেট বা ভবন “আগুনে পুড়ে গেলে” নতুন করে নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়, যা প্রভাবশালী মহলের জন্য লাভজনক। কোথাও আগুন ব্যবহার হয় দুর্নীতির কাগজপত্র বা অবৈধ পণ্যের গুদাম ধ্বংস করতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়। আবার কোথাও এটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল। এসব প্রমাণ করে—আগুন কেবল দুর্ঘটনা নয়, অনেক সময় এটি হয় পরিকল্পিত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার, যেখানে একের ক্ষতি অন্যের লাভে রূপ নেয়।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, অগ্নিকাণ্ড এখন “ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি”। যখন নিরাপত্তা মানদণ্ড মানা হয় না, আইন প্রয়োগ হয় না, দুর্নীতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে—তখন দুর্ঘটনা ও পরিকল্পিত ঘটনার মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। আমরা দেখি এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া কোনো অগ্নিকাণ্ডের তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি, জড়িতদের কোন বিচারের আওতায় নেওয়া হয়নি। এই যখন অবস্থা তখন নতুন নতুন অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা সতর্ক করে বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গার্মেন্টস কারখানা ও বিমানবন্দর এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশের তৈরি পোশাক খাত ও অর্থনীতির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন, অগ্নিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর দেখা যায় একই দৃশ্য—রাজনৈতিক নেতাদের সহমর্মিতা, দমকল কর্মীদের প্রশংসা, ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ বরাদ্দ। কিন্তু কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন হয় না। ফলে আগুন নিভলেও সমস্যার আগুন জ্বলতে থাকে। অগ্নিকাণ্ড রোধে এখন সময় এসেছে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও নাগরিক সচেতনতার যুগপৎ উদ্যোগের। প্রতিটি ভবন, মার্কেট ও কারখানার জন্য অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা উচিত। নিয়মিত পরিদর্শন ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল, কলেজ, অফিস ও কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা শিক্ষা ও মহড়া চালু করা দরকার। অগ্নিকাণ্ড কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি সমাজের অবহেলার প্রতিচ্ছবিও। আমরা অনেকেই অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবহার জানি না, নিয়মিত তা পরীক্ষা করি না, গ্যাস বা বৈদ্যুতিক ত্রুটি উপেক্ষা করি। এই অসচেতনতা দুর্ঘটনাকে আমন্ত্রণ জানায়। অগ্নিকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনাই আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে—আমরা কি নিরাপত্তাকে সত্যিই গুরুত্ব দিচ্ছি, নাকি কেবল শোকের রাজনীতিতেই আটকে আছি? অবহেলা, দুর্নীতি ও পরিকল্পিত স্বার্থ—সব মিলিয়ে এই আগুন যেন আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার ভেতরকার আগুনেরই প্রতিচ্ছবি। এই আগুন নিভবে না শুধু দমকলের পানি দিয়ে; নিভবে সততা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে। পরিকল্পিত হোক বা দুর্ঘটনাজনিত—প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরাপত্তা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি ভবন/কারখানার জন্য অগ্নি–নিরাপত্তা সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক এবং অনলাইন রেজিষ্ট্রি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। নিয়মিত অডিট ও জরিমানা— তদারকি সংস্থাগুলোর ঝুঁকি রিলিফ না থাকলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি বড় অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন অনলাইনে প্রকাশ ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দণ্ডবিধি প্রয়োগ। স্কুল-কলেজ, কারখানা ও মার্কেটে বার্ষিক অগ্নিনির্বাপক মহড়া বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ার জন্য কর-ছাড় বা সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে, যাতে ভবনমালিকরা নিরাপত্তা বিনিয়োগে উৎসাহ পান।
সুধীর বরণ মাঝি
শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, চাঁদপুর
ই-মেইল: shudir_chandpur@yahoo.com































































