মানুষ অভ্যাসের দাস—এই সত্যটি যত পুরোনো, ততটাই নির্মম। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক মানুষকে পুড়িয়ে মারার যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে, তা আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—সহিংসতা ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত, উগ্র ও নৃশংস অপসংস্কৃতিতে রূপ নিচ্ছে। যে সমাজে সহিংসতা বারবার ঘটে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না, সেখানে সহিংসতাই শেষ পর্যন্ত ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে। এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
পুড়িয়ে মারা কোনো আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা। মানুষকে জীবন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা মানে কেবল একটি জীবনকে হত্যা করা নয়—এটি মানবিকতা, সভ্যতা এবং রাষ্ট্রীয় শাসনের ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত। এই অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে—আমরা হয় নীরব, নয়তো উদাসীন হয়ে পড়ছি। অথচ নীরবতা এখানে নিরপেক্ষ অবস্থান নয়; এটি কার্যত অপরাধেরই এক প্রকার সহযোগিতা।
মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের পরিসংখ্যান এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। দেশীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)–এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতায় প্রতি বছর গড়ে ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে Human Rights Support Society (HRSS)–এর তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েক মাসের মধ্যেই শতাধিক গণপিটুনির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে নিহত ও গুরুতর আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনার একটি অংশে আগুন ব্যবহার করা হয়েছে—যা সহিংসতার সবচেয়ে চরম ও ভয়াবহ রূপ।
তবে এসব পরিসংখ্যানই শেষ কথা নয়। অনেক ঘটনায় মামলা হয় না, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনার ধরন বদলে নথিভুক্ত হয়। ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তবুও বিদ্যমান তথ্যই দেখায়—সহিংসতা একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
এই সহিংসতার পেছনে বিচারহীনতার ভূমিকা সবচেয়ে গভীর। সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কয়েক মিলিয়নের ঘরে। গুরুতর ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তিতে গড়ে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মধ্যে শাস্তিহীনতার ধারণা তৈরি করে, যা গণপিটুনি ও নৃশংস হত্যাকে উৎসাহিত করে।
আন্তর্জাতিক গবেষণাও এই সম্পর্ককে সমর্থন করে। জাতিসংঘের অপরাধ ও মাদক দপ্তর (UNODC)–এর গবেষণায় দেখা গেছে, যেখানে সহিংস অপরাধে দণ্ডাদেশের হার কম, সেখানে ভিজিল্যান্টি জাস্টিস ও গণপিটুনির প্রবণতা বেশি। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয়।
ডিজিটাল গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এই সহিংসতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বা উসকানিমূলক তথ্য সত্য তথ্যের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে সংঘটিত একাধিক গণপিটুনির ঘটনায় পরবর্তী অনুসন্ধানে প্রমাণ মিলেছে—ঘটনার সূচনা হয়েছিল ভিত্তিহীন অভিযোগ বা অনলাইন গুজব থেকে, যা পরে প্রাণঘাতী রূপ নেয়।
এই সহিংসতার সামাজিক মূল্যও সুদূরপ্রসারী। গবেষণায় দেখা যায়, গণপিটুনি ও চরম সহিংসতা বৃদ্ধি পেলে—সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে,—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা কমে,— এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আইনগত দিক থেকে বাংলাদেশে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান বিদ্যমান। সমস্যা আইনের অনুপস্থিতি নয়; সমস্যা হলো আইনের প্রয়োগে ধারাবাহিকতার অভাব। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গণপিটুনির ঘটনায় গ্রেপ্তার ও দণ্ডাদেশের হার ঘটনার সংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত কম। এই ফাঁকটাই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদসহ (ICCPR) একাধিক মানবাধিকার চুক্তির স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। এসব চুক্তি রাষ্ট্রকে নাগরিকের জীবন রক্ষা ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দেয়। পুড়িয়ে মারার মতো চরম সহিংসতা সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
একটি প্রবাদ আছে— “অন্যের জন্য গর্ত করলে, সেই গর্তেই নিজেকেই পড়তে হয়।” আজ পুড়িয়ে মারার যে উন্মত্ত অপসংস্কৃতি সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা শেষ পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি স্তরকেই গ্রাস করবে। সহিংসতা কখনো সীমারেখা মানে না; একসময় তা নিজের দিকেই ফিরে আসে।
পরিসংখ্যান একা মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে পারে না, কিন্তু দায়িত্ব নির্ধারণে সহায়তা করে। বিদ্যমান তথ্য তিনটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—
প্রথমত, গণপিটুনি ও পুড়িয়ে মারার ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপমুক্ত রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, গুজব ও উসকানিমূলক তথ্য মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সহিংসতা অভ্যাসে পরিণত হয় তখনই, যখন তার শাস্তি অনিশ্চিত থাকে। বর্তমান বাস্তবতা ও পরিসংখ্যান সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে—এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সহিংসতা আরও গভীরে প্রোথিত হবে, যার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকেই। আগুন দিয়ে কোনো সভ্যতা গড়ে ওঠে না। আগুন কেবল ধ্বংস করে। এখনই যদি এই আগুন নেভানো না যায়, তবে একদিন এই আগুনেই আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের মূল্যবোধ এবং আমাদের রাষ্ট্র পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com


























































