চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম সুপারিশ করেছে, এটা এতদিনে সবারই জানা। গত শনিবার (২১শে জুন) পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইশহাক দার নিজেই এ খবর নিশ্চিত করেছেন এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘর্ষ নিরসনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তানের এই পদক্ষপকে ‘স্ট্র্যাটেজিক অপরচুনিজম’ বা কৌশলগত সুবিধাবাদের আর একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলেই বর্ণনা করছেন – তবে একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দক্ষিণ এশিয়াতে আরও দুটি দেশ – ভারত ও বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুতর তাৎপর্য বহন করছে।
২০২৪: যখন বাংলাদেশ ধ্বংস হলো -৪র্থ পর্ব
আন্তর্জাতিক পত্রিকা দ্য সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের মতে, ইসলামাবাদ যে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আবার গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে এবং স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে – এই পদক্ষেপ তারই প্রমাণ এবং এই গোটা বিষয়টা যথারীতি ভারতকে উদ্বেগে ফেলেছে।
অন্য দিকে বাংলাদেশের ওপরেও এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে বাধ্য – কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্রমেই নিবিড় থেকে নিবিড়তর হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা রাখাইনের জন্য প্রস্তাবিত মানবিক করিডরের মতো যে সব ইস্যুতে মার্কিন স্বার্থ জড়িত আছে বলে মনে করা হয় তাতে এই সিদ্ধান্ত ছায়াপাত করতেই পারে।
পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গত সপ্তাহে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে পাকিস্তানের সফররত সেনাপ্রধান, জেনারেল (অধুনা ফিল্ড মার্শাল) আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন, সেটা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ছিল একটি বিশেষ ঘটনা। তিনিই যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ থামিয়েছেন, ট্রাম্পের সেই দাবিকেই একরকম প্রতীকি বৈধতা দিয়েছিল সেই মধ্যাহ্নভোজ।
এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্য কাজ আছে, এই যুক্তি দেখিয়ে হোয়াইট হাউসে আসার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ভারত অবশ্য পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিরতির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আদৌ কোনও ভূমিকা থাকার কথা আগাগোড়াই অস্বীকার করে এসেছে।
৪৩৬৫ কোটি টাকার অস্ত্র পাবে ইজ়রায়েল! হামলা চালাতে ‘বম্ব গাইডেন্স কিট’ দিতেও সায় ট্রাম্পের
এই পটভূমিতে জেনারেল মুনিরের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আউটরিচ’কে অনেক বিশ্লেষকই ইরানের সঙ্গে তাদের সংঘাতে পাকিস্তানের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। ওই মধ্যাহ্নভোজের পর দিনই যদিও ইরানের ওপর মার্কিন হামলার নিন্দা করে পাকিস্তান বিবৃতি দিয়েছে, তারপরও ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা পর্যবেক্ষকদের নজর এড়াচ্ছে না।তবে তারা এটাও বলছেন, এই সম্পর্ক হবে অবশ্যই ‘ট্রানস্যাকশনাল’ – অর্থাৎ দেনাপাওনা ভিত্তিক।
যেমন, আমেরিকার জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উদয় চন্দ্রার মতে, ‘দু’পক্ষের মধ্যে যে রফাই হোক, সেটা সম্ভবত আর্থিক সহায়তা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের মধ্যেই সীমিত থাকবে। অন্যদিকে, এর বিনিময়ে আমেরিকার শর্ত থাকবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সক্রিয় জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর কাজকর্মে রাশ টানতে হবে।’
লন্ডন-ভিত্তিক লেখক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ প্রিয়জিৎ দেবসরকার অবশ্য মনেই করেন না পাকিস্তান এরকম কোনও কথা দিলেও তা শেষ পর্যন্ত রাখবে। এবং আমেরিকার দিক থেকেও এ ব্যাপারে কোনও ‘এনফোর্সমেন্ট’ ও তদারকি বিশেষ একটা থাকবে না। দ্য সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে তিনি বলেন. ‘পাকিস্তান তাদের দেশের জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করতে আদৌ কিছু করবে কি না, তা নিয়ে রীতিমতো সন্দেহ আছে। এবং ওই অঞ্চলে ভবিষ্যতে যে কোনও ধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপের ব্যাপারে ভারতকেও এখন অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে।’
ভারত কেন বিচলিত বোধ করছে?
পাকিস্তান ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমশ যে আবার একটা ভরসা ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, এটা অবশ্যই দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে ভারতের নীতি-নির্ধারকদের কপালে। ভারতের সুপরিচিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘এই উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো, ভারত মনে করছে এর ফলে কাশ্মির ইস্যু আবার আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় জায়গা করে নিতে পারে এবং সেটা একটা বড় ঝুঁকি।’
ভারত চিরকাল বলে এসেছে, কাশ্মির বিতর্ক এমন একটি বিষয় যেটা (সিমলা চুক্তির আধারে) কেবলমাত্র ভারত ও পাকিস্তানের নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই নিরসন করতে হবে, এখানে বাইরের তৃতীয় কোনও দেশের কোনও ভূমিকা থাকতে পারে না।
গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারত এই তত্ত্বটা মোটামুটি সফলভাবে প্রতিষ্ঠাও করতে পেরেছে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন সেটাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন।
নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে মনে করা যেতেই পারে কাশ্মির যে একটি দ্বিপাক্ষিক ইস্যু, ভারতের এই দীর্ঘদিনের অবস্থান গুরুত্ব হারাচ্ছে। ভারত আমেরিকাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে খুবই আনপ্রেডিক্টেবল (যার কাজকর্ম কিছুই আঁচ করা যায় না) প্রমাণ করে দিযেছেন এবং তার সঙ্গে এনগেজ করা (ভারতের পক্ষে) খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
বিশ্বনেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের মতো ‘ধারাবাহিকতার অভাব’ যে আর কারওরই নেই, সেটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন তিনি। এবং পাকিস্তানের সঙ্গে এই মানুষটির ঘনিষ্ঠতা ও হৃদ্যতা ভারতের জন্য ক্রমশই অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের কীসের মাথাব্যথা?
আপাতদৃষ্টিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের এই ‘মাখামাখি’তে বাংলাদেশের হয়তো প্রত্যক্ষভাবে কোনও ‘স্টেক’ বা স্বার্থ নেই, কিন্তু পরোক্ষভাবে অবশ্যই আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রবলভাবেই আছে।
প্রিয়জিৎ দেবসরকারের কথায়, ‘শীতল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান যেভাবে ‘সিয়াটো’ বা ‘সেনটো’-র মতো কমিউনিজম-বিরোধী চুক্তিকে সামিল হয়েছে আবার পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও বেইজিং-এর মধ্যে জটিল ভারসাম্যের খেলা খেলে চলেছে তা থেকেই বোঝা যায় তারা তাদের অস্থিতিশীলতাকেই একটা প্রভাব হিসেবে কাজে লাগানোর কৌশলটা শিখে গেছে।
’ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য পাকিস্তানের মনোনীত করাটাও তার মতে নিছক কোনও প্রতীকি সৌজন্য পদক্ষেপ নয়, বরং বিশ্বে পাকিস্তানের ভাবমূর্তিকে ‘রিক্যালিব্রেট’ করার একটি চতুর চাল এবং আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন চ্যানেল খোলার চেষ্টা। তিনি আরও বলছেন, ‘গত অগাস্ট থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দৃশ্যতই পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব যেভাবে এখন পাকিস্তানের সুরে সুর মেলাচ্ছেন সেটাকে আমি একাত্তরে অর্জিত সার্বভৌমত্বের সঙ্গে প্রতারণা বলেই মনে করি!’
প্রিয়জিৎ দেবসরকারের কথায়, ‘পরিষ্কার করে বললে বলতে হয় ঢাকা ও ইসলামাবাদের এই ঘনিষ্ঠতা নিছক কোনও কূটনৈতিক রিক্যালিব্রেশন নয়, বরং এটা বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের আত্মপরিচয় ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে একটা অতি বিপজ্জনক ফাটকা।’
‘ওয়াশিংটনের প্রতি পাকিস্তানের এই দরদ অবশ্যই বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করবে, যাদেরকে তারা ‘অল ওয়েদার ফ্রেন্ড’ বলে বর্ণনা করে থাকে এবং তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক লাইফলাইনও সেই চীনই। এদিকে বাংলাদেশও চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে খুব সূক্ষ ভারসাম্যের খেলা খেলছে – ফলে ঢাকাও এই জটিল কূটনীতির আবর্তে পড়ে যেতে পারে সেই আশঙ্কা থাকছেই!’
অতএব পাকিস্তানের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশে এখন আরও বেশি করে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খুঁজবে বলে এই পর্যবেক্ষক মনে করেন। তবে সেটা কোন মূল্যের বিনিময়ে, প্রশ্ন সেটাই।























































