অতি সম্প্রতি কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মব ও কিশোর গ্যাং উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাড়ছে ভয় এবং আতংক। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে একের পর এক মব সৃষ্টিসহ ছিনতাই, চুরি-ডাকাতি, দখল-চাঁদাবাজি এখন নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ১০ মাসে সারাদেশে ‘মব’ সৃষ্টি করে অন্তত ১৭৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘মব ভায়োলেন্সের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও কার্যকর কোনো ফল হচ্ছে না। সরকারি তথ্য বলছে, গত মে মাসে সারাদেশে সংঘটিত হয়েছে ২ হাজার ৮০৯টি মারাত্মক অপরাধ। যা গত বছরের তুলনায় অন্তত ৫৬৪টি বেশি। মব এবং কিশোর গ্যাং কোনভাবেই আমাদের কাম্য হতে পারে না। তবুও যারা শুধু মাত্র নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য মব সৃষ্টি করছে তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসার জরুরী।
বর্তমান সমাজে এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির নাম হয়ে উঠেছে মব ও কিশোর গ্যাং। মব ও কিশোর গ্যাং এক আতংকের নাম। দিন দিন মব ও কিশোর গ্যাং ভয়ংকর থেকে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। সময়ের পরিস্থিতি দেখে মনে হয় মব ও কিশোর গ্যাং পারিবারিক, সামাজিক বিশৃঙ্খলায় স্থায়ী আকার ধারণ করবে। বাড়ছে ব্যাক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক সংকট। কিছু মানুষ তার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এক উদ্ভু পরিস্থির মধ্যে মব ও কিশোর গ্যাংকে কাজে লাগাচ্ছে।
বর্তমানে মব ও কিশোর গ্যাং আমাদের সমাজে এক ভয়ংকর আতঙ্কের রূপ ধারণ করেছে। দিন দিন এই গ্যাংগুলো আরও বেপরোয়া ও সহিংস হয়ে উঠছে। তারা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতায়ও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে। যা কেবল ব্যক্তি নয়, বরং পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য চরম হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গ্যাং কালচারের ফলে সমাজে বেড়ে যাচ্ছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা।
শারীরিক শিক্ষা সুস্থ জাতি ও উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি
কিশোরদের এধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া তাদের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকার করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে এ থেকে উদ্ভূত অপরাধ, মাদকাসক্তি ও সহিংসতার কারণে সমাজে দেখা দিচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক অস্থিরতা। মব এক দল উন্মত্ত জনগোষ্ঠী, যারা আবেগে ও উত্তেজনায় আইন নিজ হাতে তুলে নেয়। অন্যদিকে কিশোর গ্যাং হলো সংঘবদ্ধ কিশোর অপরাধী দল, যারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক সেবন ও বিক্রয়, সন্ত্রাস, এমনকি খুনের মতো অপরাধেও জড়িত হচ্ছে। মব ও কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা সমাজে বাড়াচ্ছে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তাহীনতা। অনেক পরিবারই তাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে—ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মব ও কিশোর গ্যাংকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক স্বার্থ, প্রতিপক্ষকে দমন কিংবা সম্পদ দখলের মতো উদ্দেশ্যেও এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এই গ্যাং সংস্কৃতি এখন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকেও চরমভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে।
রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ফায়দা তুলতে তারা এই গ্যাংগুলোকে একপ্রকার ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে।এতে সমাজে একধরনের অঘোষিত নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও কমে যাচ্ছে। বর্তমান সমাজে একটি ভয়াবহ ও ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে মব ও কিশোর গ্যাং। দিন দিন এদের কার্যক্রম ভয়ংকর থেকে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।
মব মানে উত্তেজিত জনতার একগুঁয়ে প্রতিক্রিয়া, যা অনেক সময় আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়ার মতো সহিংসতায় রূপ নেয়। অপরদিকে, কিশোর গ্যাং বলতে বোঝায় কিশোর বয়সী ছেলেদের গঠিত একধরনের অপরাধী দল, যারা নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ে—যেমন: ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক সেবন ও বিক্রি, সন্ত্রাস, এমনকি খুন পর্যন্ত।
মব লিঞ্চিং বা কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতায় অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসন ঘটনাস্থলে দেরিতে পৌঁছে বা আইনি পদক্ষেপে ঢিলেমি দেখায়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। মব বিচার হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘বিকল্প বিচার’ ব্যবস্থা। অথচ এটি সমাজের জন্য ভয়ানক বিপদ। একইভাবে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেক সময় কম বয়স দেখিয়ে ছাড় পেয়ে যাওয়ার সুযোগ নেয়। আবার কখনো কখনো ‘ক্ষমতাবান’ ব্যাক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় এরা আইনের হাত থেকে রেহাই পায়। তাই আইনের প্রয়োগ হতে হবে একদিকে কঠোর, অন্যদিকে মানবিক। অপরাধী কিশোরদের শুধুমাত্র সাজা নয়, পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে।
এ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন সচেতন পরিবার, দায়িত্বশীল শিক্ষা ব্যবস্থা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সমাজের সবস্তরে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা, পরিবারে মূল্যবোধের শিক্ষা, বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা, এবং সময়োপযোগী আইন প্রয়োগ। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং অনলাইন কিংবা অফলাইনে কী ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও হতে হবে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল।
কিশোরদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। মব ও কিশোর গ্যাংকে শুধু আইন দিয়ে দমন করা সম্ভব নয়, এ জন্য চাই সামগ্রিক সামাজিক আন্দোলন ও দায়িত্ববোধ। তবেই গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও মানবিক সমাজ। শিক্ষা মানুষের চারিত্রিক গঠন ও নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের অনেক কিশোর প্রয়োজনীয় নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও সহানুভূতির শিক্ষা তারা পাচ্ছে না। অনেক স্কুলেই শৃঙ্খলা নেই, সহপাঠীদের মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের গ্যাংবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং বাহুবলে সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রবণতা বাড়ছে।
শিক্ষকেরা যদি শুধু পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টে সন্তুষ্ট থাকেন, কিন্তু ছাত্রের মনোজগতের পরিবর্তনের দিকে নজর না দেন—তাহলে এই গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার রোধ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে অনেক অভিভাবকই সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দিতে পারছেন না। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে, সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে নজরদারির অভাব দেখা যাচ্ছে। আবার অনেক পরিবারে সহিংসতা, কলহ বা অবহেলা কিশোরদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, যা তাদের ভুল পথে ঠেলে দেয়। সন্তান যদি সঠিক দিকনির্দেশনা না পায়, তাহলে বাইরে সহজেই ভুল বন্ধু, মাদক, সহিংসতা বা গ্যাংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। তাই পরিবারের উচিত—ভালোবাসা, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
এই সমস্যা পুরো সমাজের। শুধু পরিবার, শিক্ষক বা পুলিশ নয়—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন, যার ভিত হবে—সচেতন পরিবার, দায়িত্বশীল শিক্ষা, কঠোর ও মানবিক আইন প্রয়োগ, এবং সর্বস্তরে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা।
স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো—অন্যায় দেখেও চুপ থাকা। কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠে এলাকাভিত্তিক, পাড়াভিত্তিক বা স্কুলের অভ্যন্তরে। স্থানীয় মানুষ, শিক্ষক, ইমাম, সমাজকর্মী—এরা যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তাহলে দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা করা সহজ হয়। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাং সদস্যদের গৌরবময় করে না তুলে, বরং ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরা জরুরি। একই সঙ্গে সমাজে ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক দূরবৃত্তায়ন বন্ধ করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুরতে হবে।
মব ও কিশোর গ্যাং কোনো তাৎক্ষণিক সমস্যা নয়—এটি একটি গভীর সামাজিক ব্যাধি, যার শিকড় গেঁথে আছে আমাদের শিক্ষা, পরিবার, আইন এবং সমাজের ভেতরেই। তাই এই সংকট মোকাবিলায় চাই সম্মিলিত উদ্যোগ, সুপরিকল্পিত শিক্ষা, সজাগ পরিবার, কার্যকর আইন এবং সচেতন সমাজ। তাহলেই আমরা গড়ে তুলতে পারব একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মানবিক বাংলাদেশ।
,


























































