
মিথ্যাকরণ (Falsification) নীতি সত্য প্রতিষ্ঠার উত্তম পদ্ধতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যার ধারণা মানসিক। সত্য হিসাবে পরিচিত ধারণাগুলো আমাদের স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে। এসবের ব্যতিক্রমকে আমরা মিথ্যা বলি। কিন্তু আমাদের সত্য-মিথ্যার ধারণা কতোটা বাস্তব, তা নির্ভর করে মিথ্যাকরণ পরীক্ষণের ওপর। সত্য হিসাবে বহুল পরিচিত বচন গৃহিত হতে হলে মিথ্যাকরণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। নতুবা সত্য হবে না।
বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদি মিথ্যাকরণ অভীক্ষার (Test) দাবিদার। অস্ট্রীয়-ব্রিটিশ দার্শনিক কার্ল রেইমন্ড পপার (২৮ জুলাই ১৯০২ – ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী (ভিয়েনা সার্কেলের পরখনীতি) যুক্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা দার্শনিক হিসাবে গণ্য করা হয়। তিনি প্রায়োগিক মিথ্যাকরণের (empirical falsification) পক্ষে ছিলেন। মিথ্যাকরণ পরীক্ষণ দ্বারা একটি তত্ত্বের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, “সমস্ত রাজহাঁস সাদা।” একথা মিথ্যা হবে, যদি কোথাও একটা কালো রাজহংসের দেখা মেলে। অর্থাৎ এ প্রমাণ দ্বারা “সমস্ত রাজহাঁসই সাদা নয়” সত্যে উপনীত হওয়া যায়। পপারের মতে, বিজ্ঞানের উচিৎ একটি তাত্ত্বিক অনুমান ক্রমাগতভাবে সমর্থন করে সত্যে পরিণত করার পরিবর্তে মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করা। আমরা সেসব কথাই যথার্থ বলি, যা মিথ্যা না-হওয়ার যোগ্য বা মিথ্যা নয়। কথার বাস্তবতা নিরূপণ করা হয় এভাবেই।
প্রথমত : বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো মূলত অস্থায়ী (provisional), যা মিথ্যাকরণ (Falsification) পরীক্ষা দ্বারা সত্য হয়। এজন্য গাণিতিক প্রমাণ সবচে’ নির্ভরযোগ্য। সুতরাং বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় হিসাব-নিকাশ এত জরুরি।
পপারের মতে একটি তত্ত্বীয় বৈজ্ঞানিক ধারণা কতটা সত্যাশ্রয়ী, তা ঠিকভাবে প্রমাণ করতে মিথ্যাকরণ পদ্ধতি একটি নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা। যেকোনও বৈজ্ঞানিক বক্তব্য যদি মিথ্যা প্রমাণ না করা যায়, তবে তা সত্য। একটি নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মিথ্যা বা সত্য প্রমাণের জন্য বিভিন্ন বর্ণনা দেওয়া যায়। গণিত এক্ষেত্রে সবচে’ সফল পদ্ধতি। গণিত দ্বারা প্রমাণিত সত্যকে মিথ্যা বানানো প্রায় অসম্ভব। গণিত একটি তত্ত্ব বা ঘোষণার সত্য বা মিথ্যা প্রমাণের সবচে’ নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
২০২৪ঃ যখন বাংলাদেশ ধ্বংস হলো (অধ্যায় ২ – পর্ব-২)
২+২=৪ কেউ সত্য নয় বলবে না। যদি কেউ ২+২=৫ বলে, তবে তা গণিত নয়। গাণিতিক জ্ঞান প্রয়োগ করে বস্তুজগতের পরিমান নির্ধারণ করা হয়। যদিও গাণিতিক জ্ঞান আমাদের ধারণাগত। ২+২=৪ শিখেছি বলে সত্য। ২+২=৫ যদি আমরা শিখতাম, তবে তাই সত্য হতো। তবে গণিত আমরা যেভাবেই জানি, সেটা প্রাকৃতিক। প্রাকৃতিক প্রতিটি বস্তুর অস্তিত্বের সাথে সংখ্যার ধারণা রয়েছে। সংখ্যাই গণিতের মূল। একমন চাল কিনতে হলে একমনের বাটখারা দিয়ে মাপি। কিন্তু দোকানদারের কথা মত একমন চালের বস্তা ঘরে এনে মেপে যদি ৩৮-কেজি পাই, তবে ধরে নিতে হবে, দোকানদার মিথ্যা বলেছে। কিন্তু যদি দোকানেই চালের বস্তাটা ৪০-কেজি বাটখারা দিয়ে মাপা হতো, তবে ঠক হতো না। বস্তু্র অস্তিত্বের সাথে সংখ্যা যে সহজাত, তা এরকম একটা সাধারণ যুক্তিতে প্রমাণ হয়। সুতরাং হিসাব ছাড়া বিজ্ঞান চলে না বা বিজ্ঞানে বিশ্বাসের অবকাশ নাই। সুতরাং গণিত প্রয়োগ দ্বারা একটি বৈজ্ঞানিকতত্ত্ব মিথ্যাকরণের প্রচেষ্টা সঠিক ও নির্ভুল নীতি।
দ্বিতীয়ত : রাজনৈতিক তত্ত্বগুলো মিথ্যা প্রমাণের অংক নাই। রাজনীতি হচ্ছে মানবসমাজ পরিচালনা করার সবচে’ বড় পদ্ধতি। এর জন্য দর্শন থাকলেও বিজ্ঞানের মতো কোনও সমীকরণ নাই। কেননা রাজনীতি দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশ এবং বাদানুবাদের ওপর চলে। এক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক ভাষণ আগে মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করতে হবে। নইলে তা মিথ্যা হলে জাতির জন্য চিরকাল অমঙ্গলের কারণ হয়।
অবশ্য যে রাজনৈতিক ক্রমাধারা একটি সাময়িক সমাধানের জন্য গৃহিত হয় এবং তার পিছনে নির্দিষ্ট ব্যক্তিস্বার্থ থাকে; অতঃপর সময়ের ব্যবধানে জাতির জন্য অমঙ্গলজনক হয়, তা পরিশেষে সত্য হিসাবে গৃহিত হয় না। আর একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের সাথে সাথে যদি মিথ্যাকরণের চেষ্টা করা হয়, তবে তা সত্য না মিথ্যা মীমাংসা হয়ে যাবে। ফলে বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য বেড়িয়ে আসবে, অপেক্ষা করতে হবে না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর যথার্থতা গ্রহণে বিলম্ব ঘটা দেশের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং এগুলো মিথ্যাকরণের প্রচেষ্টায় দেরি করতে নেই। বিলম্বে প্রমাণিত রাজনৈতিক মিথ্যাচার জাতীয় চরিত্রের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে!
রাজনীতিতে মিথ্যাকরণ প্রক্রিয়া সবচে’ বেশি প্রভাব বিস্তার করে। দেশের জনগণ যদি একজন নেতার প্রতিশ্রুতিমূলক ভাষণ সত্য মনে করে তার পক্ষে রায় দেয়; অতঃপর তার কর্মকাণ্ড জাতির বিরুদ্ধে যায়, তবে ধরে নিতে হবে যে, তার সমস্ত ভাষণ মিথ্যা ছিলো; যেমন: দ্বিজাতি তত্ত্ব। মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব (মুসলিম ও অন্যান্য জাতি) অনুসারে উপমহাদেশ বিভাজন করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র গঠন হয়। এ কথা শুনে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মন্তব্য করেন, “পাকিস্তান তো নয় ফাঁকিস্থান।” তাতে তখনকার বঙ্গীয় জনপদের মুসলিম লীগের লোকেরা নজরুলের ওপর ক্ষেপেছিলো। কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভ্রম কাটে ঢাকায় জিন্নাহ্’র দেওয়া একটি ভষণে— উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা! কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়!
উল্লেখ্য, বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সবাই যদি নজরুলের মতো আগেভাগে জিন্নাহ ও তার চেলা চামুণ্ডাদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পারতো, তবে দীর্ঘ পঁচিশ বছরযাবত এজাতিকে পাকিস্তানিদের নির্যাতন ও নিপীড়ন সইতে হতো না। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বাঙালির মৃত্যু হতো না।
১৯৫২-সালে পূর্ববঙ্গে ভাষা আন্দোলন হয় এবং তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১-সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ দ্বারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হয়। তথাপি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে স্বাধীন বাঙালি তাদের আসল চরিত্র প্রকাশ করে। সদ্যস্বাধীন দেশে অরাজক অবস্থা সৃষ্টি করে। চুরি, ডাকাতি, লুটতরাজ, চোরাচালানি, সন্ত্রাস ইত্যাদি দেশকে অশান্ত করে তোলে! ফলে শৃঙ্খলা আনতে তখনকার সরকার বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু বাকশাল বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অতঃপর দেশে শান্তি ফেরাতে একদল পথভ্রষ্ট সেনাকর্তা, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। দেশব্যাপী প্রচার করে যে, এই হত্যাকাণ্ড দেশের সবসমস্যার সমাধান করবে! তারপর দেশে আবার স্বাধীনতা পূর্বকালীন সেনাশাসন প্রতিষ্ঠা হয়। সেনা শাসকরা প্রচার করতে থাকে যে, দেশ থেকে ইসলাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ভারতের তাবেদার রাষ্ট্র বানানো হয়েছে ইত্যাদি নানান মিথ্যা প্রপাগান্ডা। কিন্তু বাঙালির কোনও নেতা ওসব বক্তব্য তখন তাৎক্ষণিকভাবে মিথ্যা প্রমাণে সচেষ্ট হয়নি।
কিন্তু ওসব ভুয়া কথা বলে দেশে পুরানো স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিট বিনষ্ট করে পাকিস্তানি কায়দায় সংবিধানে সংশোধন আনে। ফলে দেশ পৌরাণিক ধারার দিকে প্রত্যাবর্তন করে এবং তা আজও অব্যাহত আছে! যেসব মূলনীতির ওপর স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়, সেসব থেকে দেশ ধীরে ধীরে অন্যদিকে মোড় নেয়। যেদিকে দেশের স্বকীয়তা নাই। বরং নীচ সংস্কৃতি চর্চার অভয়াশ্রমে পরিণত করার বহুরূপী ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে দেশের মানুষের নৈতিকচরিত্র গঠিত হয়নি। অসাম্য, বিচারহীনতা, দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, সামাজিক অবক্ষয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে!
উল্ল্যেখ্য, ১৯৭৫-খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের যুক্তি তৎকালীন সেনা স্বৈরশাসকদের মিথ্যা ডমাডোল ছিলো। এ দেশবাসীর কাছে আজও তা স্পষ্ট নয়! আওয়ামী লীগের লোকেরা উক্ত হত্যাকাণ্ড থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করে। আর বিরোধীরা এখনও বলে যে, ১৯৭৫-এর বর্বরতা সময়ের দাবি ছিলো। মূলত এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, একটি কথিত বচন সত্য বানাতে হাজারটা অপ্রমাণিত যুক্তি উপস্থাপন করা সত্ত্বেও তথাকথিত “সময়ের দাবি” মিথ্যাকে সত্য বানানো যায় না। কিন্তু দুর্ভাগা এজাতি সেই কথিত যুক্তিকে ১৯৭৫-সালেই মিথ্যাকরণ অভীক্ষার সম্মুখীন করতে পারতো। তাইলে দেশের অবস্থা আজ এমন হতো না।
পরিশেষে, মিথ্যাকরণ নীতি দ্বারা প্রমাণিত সত্য চিরদিনের। এছাড়া যত বড়ো ধারণকৃত বিষয় হোক, একদিন তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। যে জাতি তাৎক্ষণিকভাবে মিথ্যাকরণ নীতি দ্বারা সবকিছু মীমাংসা করতে পারে, তারা বিশ্বের বুকে খুব সহজে সভ্য ও উন্নত হতে পারে।


























































