মার্কিন সামরিক বাহিনী শনিবার জানিয়েছে, ইরানের এক হামলায় জর্ডানে তাদের দুজন সদস্য নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন। এদিকে, টানা সপ্তম রাতের মার্কিন হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, “সংঘাত বাড়ানোর চেষ্টার” জন্য যুক্তরাষ্ট্র মূল্য দিবে।
এক মাস আগে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত সপ্তাহে ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হামলা তীব্রতর করেছে, যা সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শুক্রবার দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং তৃতীয় একজন মার্কিন সেনা সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। এই ঘোষণার ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিহত মার্কিন সেনা সদস্যের সংখ্যা বেড়ে ১৬-তে দাঁড়িয়েছে, এবং ৪২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এক্স-এ পোস্ট করেছেন: “ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন, বীরেরা। তোমাদের এই আত্মত্যাগ আমাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে।”
ইরানের সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অন্যান্য অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার পর শনিবার ইরান সৌদি আরবসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য উপসাগরীয় মিত্র ও জর্ডানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে মনে হচ্ছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক লিখিত বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির বারবার মার্কিন লঙ্ঘন প্রমাণ করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর “সম্পূর্ণ মূল্যহীন এবং বিশ্বাসযোগ্যতাহীন”।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এখন যেহেতু মার্কিন শত্রু সংঘাত বাড়িয়ে আরও বড় মূল্য ও অপমানের শিকার হতে চাইছে, তাদের জানা উচিত ইরানের মহৎ জাতি এবং প্রতিরোধ ফ্রন্ট তাদের জন্য অবিস্মরণীয় শিক্ষা প্রস্তুত রেখেছে।” খামেনির অবস্থান এখনও রহস্যে ঘেরা।
ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও তার আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোকে অকার্যকর করার আশায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা দিয়ে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তার ফলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই শুরু হয়েছে।
বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরবে ইরানি হামলার খবর
শনিবার কুয়েত ধারাবাহিক হামলার শিকার হয়। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী জানায়, তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে এবং এই হামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে কয়েকজন দমকলকর্মী ও তেল খাতের কর্মী আহত হয়েছেন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানিয়েছে, তারা কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক সহায়তা কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে এবং আলি আল সালেম বিমান ঘাঁটির একটি রাডার স্থাপনা ধ্বংস করেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী, কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন পরে জানায়, তাদের একটি তেল স্থাপনা “বারবার ইরানি হামলায়” ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
কুয়েতে হামলা চালানোর পাশাপাশি, আইআরজিসি বাহরাইনের শেখ ইসা বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত একটি স্থান এবং একটি গোয়েন্দা তথ্য কেন্দ্রকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভির তথ্যমতে, গার্ডস বাহিনী শনিবার ভোরে জর্ডানের আল আজরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে অন্তত দুটি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং আরও তিনটি বিমান ধ্বংস করেছে।
সৌদি আরবের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শনিবার ভোরে আল-খারজ এবং ইয়ানবুর বাসিন্দাদের আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। রিয়াদের পূর্বে অবস্থিত আল-খারজে মার্কিন সেনাদের জন্য একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, অন্যদিকে লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত ইয়ানবুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল আছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিন মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে প্রথম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়নি কী কারণে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং সরকারি গণমাধ্যম দপ্তর এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
আইআরজিসি সৌদি আরবের ওপর কোনো হামলার কথা উল্লেখ করেনি।
প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই
এর আগে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায় তারা ইরানের নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক রসদ পরিকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সামুদ্রিক সক্ষমতায় হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, শনিবার ভোরে হরমুজ প্রণালীর সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশে মার্কিন বিমান হামলায় তিনজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। এছাড়া দুটি সেতু ও একটি সড়ক সুড়ঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, শনিবার বিকেলে যুক্তরাষ্ট্র একই প্রদেশে আরও বিমান হামলা চালিয়েছে, তবে এতে কোনো বেসামরিক হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
শনিবার ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে দেশটিতে মার্কিন হামলায় ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ করা হয়।
উভয় পক্ষই নৌ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে; যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা নৌ অবরোধ আরোপ করছে এবং ইরান বলছে, তারা প্রণালীটিতে চলাচল সংক্রান্ত তাদের নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
শনিবার সৌদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে সকল হামলা এবং সামুদ্রিক চলাচলে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে এবং কোনো শর্ত বা মাশুল ছাড়াই প্রণালীটি খোলা রাখতে আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস একটি নোটে জানিয়েছে, ওমানের উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ও সামরিক বাহিনী একটি ঘটনায় জড়িত ছিল, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
শুক্রবার তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে, কারণ তার রিপাবলিকান পার্টি নভেম্বরের কংগ্রেসীয় নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।































































