
শুনেছি স্বর্গগতরা নাকি ফেলে আসা বংশধরদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড দেখতে পায়। তদ্রূপ কিছু হলে তারা হয়তো নিজেদের অতীত কৃতকর্মের সাথে বর্তমান দুনিয়ায় চলমান ঘটনাগুলোর তুলনা করছে।
জীবদ্দশায় ঘটনো নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হচ্ছে। অথবা বর্তমানে ঘটে চলা বর্বরতাগুলোর প্রতি তারা চরম ঘৃণা প্রকাশ করছে।
উদাহরণস্বরূপ তৈমুর লং-এর বর্বরতা : মুলতানবাসীরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। এর প্রতিশোধ নিতে ওখানে সে গণহত্যা চালায়। অতঃপর অন্যদের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে সে কর্তিত মানবমুণ্ড দিয়ে প্রায় পঞ্চাশ ফুট উচ্চ পিরামিড বানায়। ওটা যে কতবড় বর্বরতা ছিল, তৈমুর এখন হয়তো স্বর্গে বসে হয়তো ভাবছে। আর তার গত হওয়ার পরে দুনিয়ায় ঘটমান গণহত্যাগুলোর সাথে নিজের গণহত্যার সাথে তুলনা করছে।
হিরোসিমা নাগাসাকির এটমবোমে ঘটা গণহত্যা, ৭১এ বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের বর্বরতম গণহত্যা, ফিলিস্তিনে চালমান গণহত্যা, আইএসআই কর্তৃক হত্যাকাণ্ড, বার্মা সরকারের রহিংগা গণহত্যা ইত্যাদি মানবতাবিরোধী বর্বরতম ঘটনাগুলো প্রাসঙ্গিক এখানে। এসব হত্যাকাণ্ড দেখে তৈমুর হয়তো ভাবছে, ঐতিহাসিকরা কেবল তারই বদনাম করে। অথচ তার পরবর্তী নরপতিরা কীসব জঘন্য হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে— মুলতান গণহত্যা এগুলোর তুলনায় কি খুববেশি ভয়াবহ?!
প্রকৃতপক্ষে গণহত্যা (এবহড়পরফব) মানুষ কিছুই শিখায় না! কারণ এমন বর্বরতা তো কেবল মানুষই ঘটায়। দুনিয়ায় গণনিধন মানবসমাজের বাইরে চলে না! যন্ত্রকৌশল কাজে লাগিয়ে দুনিয়ার একমাত্র মানুষই সমরাস্ত্র বিজ্ঞানে উৎকর্ষতা এনেছে। যেন মানুষ হত্যা মানুষের অভিষ্ঠ লক্ষ্য। এছাড়া যুদ্ধের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে মন্তব্য করার মতো জননেতা ইতিহাসে খুব কম রয়েছে। এমনকি কবি, বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিকও খুববেশি নেই। তাঁদের কেউ যুদ্ধের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে ব্যক্তিগতভাবে নিরাপদে থাকতে পারেন না! সে যেই হোক। এমনকি তাঁদের ইতিহাসে তথ্যবিভ্রান্তি থাকে! এর বাস্তব নজির যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক বিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহেইমারের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা।
১৯৪৫-সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারমাণবিক বোমার আঘাতে হিরোসিমা, নাগাসাকির ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে ওপেনহেইমারের অনুসূচনা হয়। তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রকল্পের (গধহযধঃঃধহ চৎড়লবপঃ) দায়িত্বে ছিলেন। অতঃপর পার্লহারবারে বিমান আক্রমণের প্রতিশোধ হিসাবে জাপানের উপরুল্লেখিত শহরদুটোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু বোমা হামলা চালায়। ফলে সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। এমন ধ্বংসের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নাই। এ সাফল্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আরও শক্তিশালী বোমা (হাইড্রোজেন বোমা) তৈরিতে উৎসাহ বোধ করে। কিন্তু তিনি হাইড্রোজেন বোমা প্রকল্পের বিরোধিতা করেন এবং এর দায়িত্ব নিতেও অস্বীকৃতি জানান। এরকম বিরোধিতার কারণে তৎকালীন সরকার তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে অভিযুক্ত করে। অতঃপর ১৯৫৪-সালে আইসেন হাওয়ার প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও কমনিস্টদের দোসর হিসাবে শুনানির আয়োজন করে। শেষমেশ আদালত তাঁর নিরাপত্তা ছাড়পত্র (ংবপঁৎরঃু পষবধৎধহপব) এবং সরকারের উপদেষ্টা পদ বাতিলের নির্দেশ দেয়। বলা হয় যে, সকল সরকারি অভিযোগের আগেই তিনি নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।
বাস্তবে মানুষের কর্মকাণ্ড কখনও শান্তির পক্ষে না। বরং সকল আয়োজন যুদ্ধের পক্ষে। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা বা ক্ষমতার হাত বদলে যাদের ব্যক্তিজীবনে কিছু আসে যায় না, সবার চিন্তা একরকম। কারও মানসিক অবস্থান যুদ্ধের বিপক্ষে না! এমন প্রবণতা দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের মধ্যে পারস্পরিক হিংসাত্মক পরিস্থিতি আরও বেগবান করছে। ধর্মকে বিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে! অথচ মানুষকে নাকি সৃষ্টির সেরা জীব করে স্বর্গ থেকে পাঠানো হয়েছে— কী স্ববিরোধী প্রত্যয়! নিজেরা নিজেদের শ্রেষ্ঠতর ভাবলেই শ্রেষ্ঠ হয় না। এটা একটি অমূলক ভাবনা! আত্মঘাতী প্রাণীর সেরা হওয়ার দাবি আত্মপ্রবঞ্চনা বা হঠকারিতা ছাড়া আরকিছু না!
প্রকারান্তরে মানুষ স্বীয় ধ্বংসলীলার যাবতীয় কৌশল নিজেই তৈরি করে রেখেছে, অন্য কেউ না! টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্তসমস্ত জীবন পার করলেও বন্যরা কখনও সংঘবদ্ধভাবে সমরাস্ত্র সাজে সজ্জিত হয়ে একে অপরের ওপর যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। তাদের এ রকম উদ্ভাবনী ক্ষমতা নেই। সুতরাং অন্যান্য প্রাণী এজগৎ ও জীবনের জন্য মানুষের মতো ক্ষতিকর না। কার্যত ভাইরাস যেমন মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, প্রাণী হয়ে নিজের বাসস্থান ধ্বংস করার জন্য মানুষ এ পৃথিবীপৃষ্ঠে তদ্রূপ ক্ষতিকর!
উল্লেখ্য জীবিত মানুষদের সামান্য অনুভূতি নাই যে, আজ মরলে কাল কেউ মনে রাখে না কিংবা কারও প্রতাপ চিরস্থায়ী না। একদিন সবাইকে সবকিছু ছেড়ে অস্তিত্বহীন হতে হয়! চেংগিস খান, তৈমুর লং, হালাগু খান গজনির মামুদ, হিটলার, মুসিলিনি, আইয়ুব, এহিয়া, জর্জ বুশ কতো বিশাল একেকটা ঐতিহাসিক নাম! জীবদ্দশায় তারা কতো প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর ছিল। তারা কেউ আজ বেঁচে নেই। কথিত শক্তিধর ব্যক্তিদের ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস রয়ে গেছে। আর যুগ যুগ ধরে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশোদ্গার করে যাচ্ছে। সবারই একদিন এদের বাস্তবতায় আসতে হবে, সে যেই হোক! মানুষ কখনও বাস্তবতার চেয়ে শক্তিধর না।
অথচ মানবজাতি কল্পনা পর্যন্ত করে না যে, কিসের আক্রোশে তারা পারস্পরিক সংঘাতে লিপ্ত! ইচ্ছা করলে তারা টিকে থাকার সময়টুকু বৃদ্ধি করতে পারে। হিংসা, যুদ্ধ, বিশৃঙ্খলা বা গণহত্যা চালিয়ে কি স্বর্গসুখ মিলবে? নিশ্চয়ই না। তাইলে মানবজাতির লক্ষ্যটা কী? এরা কি লক্ষ্যভ্রষ্ট?































































