সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত চারজন সহ পাঁচজন রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার আবিদা ইসলামও। অন্য চারজন অন্তবর্তিকালীন ইউনুস সরকারের আমলে বিশেষ বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রাপ্ত ।
আবেদা ইসলাম একজন পেশাদার কুটনীতিক এবং ক্যারিয়ার ডিপ্লোমেট হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটেনে তাঁর নিয়োগ শুরু থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি অংশের কাছে বিশেষ করে জামাত অনুসারীদের বিতর্কের বিষয় ছিল।
এই অংশটি শুরু থেকেই তাঁকে নিয়ে নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায় তিনি একজন কুটনীতিক হিসেবে পেশাদারিত্বের সাথেই তার দায়িত্বপালন করেছেন। যদিও তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সাথে আমার সরাসরি কোন বৈঠক হয়নি বা আমি সরকারী কোন আমন্ত্রণে হাইকমিশনের কোন অনুষ্ঠানে অংশ নেইনি।
তার পরেও ব্রিটেন প্রবাসীদের একটি অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ উচ্চারিত হয়ে আসছে—লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন, যা মূলত প্রজাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, সেখানে কাঙ্ক্ষিত পেশাদারিত্ব ও সেবামুখিতা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছিল। বিশেষ করে ভিসা, পাসপোর্ট, কনস্যুলার সহায়তা কিংবা কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক—এসব ক্ষেত্রেই অসন্তোষের কথা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
অনেকের মতে, হাইকমিশনের কার্যক্রমে অযোগ্যতা, দলীয়করণ এবং সীমিত কিছু ব্যক্তির প্রভাব প্রবাসীদের বৃহত্তর স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আবেদা ইসলাম এবং তার পূর্বে যারা লন্ডনে দায়িত্ব পালন করেছেন সেইসব তুলনা করলে আমার দৃষ্টিতে তিনি সব সময় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ করেছেন। হাইকমিশনের সেবা সমূহও ছিল আগের চেয়ে অনেক সহজ। কাউকে আমি হাইকমিশনের সেবার মান নিয়ে অভিযোগ করতে শুনিনি। শুধু হাইকমিশনার নয় সকল সেকশনের ষ্টাফরা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ছিলেন নিষ্টাবান। তবে ইউনুস সরকারের সময় কোন কোন সেবার বিষয়ে হাইকমিশনের ষ্টাফরা কিছু করতে পারেননি, নাপারার কারনও ছিল, দেশ থেকে এসব বিষয়ে তাদের সুনিদৃষ্ট কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নেমেই যেভাবে হাইকমিশনার নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তা সরকারের একজন উপদেষ্টার মুখ থেকে এভাবে উচ্চারিত হওয়া মোটেই শুভনীয় নয়, বা যা কুটনৈতিক শিষ্টাচার বলতে যা বুঝায় এর কোনটাই উপদেষ্টার বক্তব্যে উপস্থিত ছিলনা। তার কথার ধরণ এবং অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে তিনি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বক্তব্য রাখছেন।
তাঁর সেই মন্তব্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে আলোচন সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচনার মূল বিষয়টি মূলত বক্তব্যের ভাষা ও উপস্থাপনা নিয়ে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, একজন উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকের বক্তব্য আরও কূটনৈতিক শুলভ এবং পরিমার্জিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে —আসলেই কি বক্তব্যের ভাষা নিয়ে বেশি ব্যস্ততা না বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা?
আমার দৃষ্টিতে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য মূলত লন্ডনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা একটি বাস্তব সমস্যার প্রতিফলন। যেহেতু তিনি নিজেও একজন যুক্তরাজ্য প্রবাসী। তিনি তাঁর সহজ-সরল সিলেটের অঞ্চলিক ভাষায় কথাটি বলেছেন—কিন্তু তার বক্তব্যের মূল বার্তা কি? সেই বার্তাটি হলো—রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই জবাবদিহিমূলক, দক্ষ এবং জনমুখী হতে হবে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু অর্থনৈতিক অবদানের মাধ্যমেই নয়, দেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বৃহৎ বাংলাদেশি কমিউনিটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল।
একটি হাইকমিশন কেবল কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি প্রবাসীদের জন্য রাষ্ট্রের মুখ। এখানেই তারা নাগরিক সেবা পায়, সমস্যার সমাধান খোঁজে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে অনুভব করে। তাই সেখানে যদি অযোগ্যতা, দলীয় প্রভাব বা সেবার ঘাটতির অভিযোগ ওঠে, তবে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়—বরং তা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও প্রবাসীদের আস্থার সঙ্গেও জড়িত।
এই বাস্তবতা বিবেচনায়, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যকে শুধুমাত্র ভাষাগত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে মূল সমস্যাটি আড়াল হয়ে যাবে। বরং এই ঘটনাকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে—যেখানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে আরও পেশাদার, স্বচ্ছ এবং প্রবাসীবান্ধব করে তোলার বিষয়ে নতুন করে চিন্তা করা যায়।
রাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনগুলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্যে নয়। এগুলো প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান দায়িত্ব দেশের স্বার্থ রক্ষা করা এবং বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের সেবা প্রদান করা। বাংলাদেশ জন্মের পর থেকে একটি একটি বিষয় আমরা লক্ষ্য করে আসছি। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বত্র দলীয় প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
শুধু হাইকমিশন কেন? প্রশাসন পুলিশ বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সর্বত্র দলীয় প্রভাব। বাংলাদেশের এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে সরকারী কর্মচারীরা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে। সর্ত্রই দলীয় প্রভাব। যতদিন না সরকারী কর্মচারীরা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারবে এই দেশের অবস্থা আদৌকি পরিবর্তন করা সম্ভব? সরকারী কর্মচারীদের স্বাধীন ভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে দেয়া উচিত, নতুনা কেউ এই জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেবেনা।
এতো গেল হাই কমিশনের কথা, যদি আমরা পুলিশ বিভাগ বা গণমাধ্যমের দিকে থাকাই কি দেখবেন। সাংবাদিকরা কি স্বাধীনভাবে লিখতে পারে বা কথা বলতে পারে? বিশেষ করে ইউনুস আমলে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। পুলিশ হত্যার কি বিচার হয়েছে, বা আদৌ হবে?
যারা সরকারী চাকুরী করেন এই মানুষ গুলো সবচেয়ে বিপদগ্রস্থ, যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তার কথাই তাদের শুনতে হবে। দেশের সর্বত্র পরিবর্তন আনতে রাজনীতিকদের আগে পরিবর্তন হওয়া উচিত? নতুবা আবেদা ইসলামের মতো উদুর পিন্ডি বুদুর ঘাড়ে চাঁপবে? আবেদা ইসলাম একজন পেশাদার কুটনীতিক তাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে, তিনি সরকারী কর্মচারী। আমি জানি তার নিয়োগ হয়েছিল বিগত বিএনপি সরকারের সময়-তিনি ধাপে ধাপে দায়িত্ব পাল করেছেন। বাকি যে চারজন ড. ইউনুসের বিশেষ বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত তাদেরকি অব্যাহতি দেয়া হবে? এই চারজনের রাজনৈতিক পরিচয় আছে, নেই শুধু আবেদা ইসলামের।








































