নবপ্রজন্মের হিন্দু শিশু-কিশোরদের মাঝে সেবার মানষিকতা, আত্মবিশ্বাস ও সনাতনী ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসেক্সের বার্কিংসাইডে আয়োজন করা হয় শিক্ষামূলক কর্মসূচী বিদ্যাযাত্রা ২০২৬-এর। ৬সেপ্টেম্বর রোববার ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৭০জন শিশু-কিশোর দিন ব্যাপী এই কর্মসূচীতে অংশ নেন।
দিনের শুরুতে বিদ্যাযাত্রার আয়োজক শুচিশ্মিতা মৈত্র (অহনা) অংশগ্রগনকারী সবাইকে স্বাগত জানান। এরপর স্বর্নীল মৈত্র (স্বর্গ) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা থেকে পাঠ করে। তারপর শান্তনু দাস, স্পর্শিয়া দাস, মি. সুবাশ দাস, স্বর্নীল মৈত্র ও শুচিশ্মিতা মৈত্র ভজন ও আরতি পরিবেশন করেন। প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সবাই একসঙ্গে দিনের কার্যক্রম শুরু করেন।
এরপর শিশু কিশোরদের জন্য বিভিন্ন ধরনের আনন্দ ও অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম এর আয়োজন করা হয়। “Who Am I? – Dharmic Edition”-এ তারা রাম, হনুমান, সরস্বতী, গঙ্গা, হোলি ও দীপাবলি সম্পর্কে ধারনা দেয়া হয়। তাদের এসবের গুরুত্ব সম্পর্কে খোঁজ নিতে এবং পরে অন্যদের সামনে নিজেদের শেখা বিষয়গুলো তুলে ধরতে উৎসাহিত করা হয়। এর মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস, নিজে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সবার সামনে কথা বলার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
এতে ছিল “Rishi’s Mystery Box”। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা স্পর্শের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় বস্তু চিনে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং পরে হিন্দু ধর্মে সেগুলোর অর্থ ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন ।
খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমের সেশনটি পরিচালনা করেন মি. বিক্রম ব্যানার্জি ও মিস ওজস্বী ব্যানার্জি। তারা শিশু কিশোরদের বিভিন্ন মজার, প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক খেলাধুলায় যুক্ত করেন। এই সেশনটি পুরো দিনের কার্যক্রমে বাড়তি আনন্দ ও উদ্দীপনা যোগ করে।
দিনটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল অতিথি বক্তা হিসেবে মি. ধ্রুব ছত্রালিয়া BEM-এর আবারও অংশগ্রহণ। গত বছরের বিদ্যা যাত্রাতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। ধ্রুবজি খুবই সুন্দর ও চিন্তাশীল একটি সেশন পরিচালনা করেন, যেখানে তিনি তরুণদের হিন্দু দর্শন নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করেন। শুধু কী বিশ্বাস করি তা নয়, কেন বিশ্বাস করি – সেটিও বোঝার ওপর তিনি গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি অভিভাবকদের সঙ্গেও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে নতুন প্রজন্মকে বড় করে তোলা নিয়ে কথা বলেন। এরপর তিনি জনপ্রিয় “Dharma Courtroom” সেশন পরিচালনা করেন। এখানে তরুণরা আইনজীবীর ভূমিকা নেয় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক করে। এর মধ্যে ঈশ্বর একজন নাকি অনেক – এই প্রশ্নও ছিল।
এই কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা যুক্তি দিয়ে কথা বলা, অন্যের মতামত শোনা, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সবার সামনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার অনুশীলন করে। প্রতিটি বিতর্কের শেষে ধ্রুবজি একটি ‘Dharma verdict’ দেন এবং বিভিন্ন যুক্তিকে সনাতন ধর্মের বিস্তৃত দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেন।
তরুণরা Dharma Compass Game-এও অংশ নেয়। এখানে তাদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতি দেওয়া হয় এবং জিজ্ঞেস করা হয়, সেই পরিস্থিতিতে কোন ধর্মীয় নীতি তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। চারটি মূল নীতি ছিল – সেবা, সত্য, সংঘ এবং শক্তি। এর মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্ত ও চ্যালেঞ্জে হিন্দু মূল্যবোধ কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
এরপর অংশগ্রহণকারীরা “Vidya Yatra Council: Charity Force”-এ যোগ দেয়। এখানে তাদের ভাবতে বলা হয়, নিজেদের কমিউনিটিতে তারা কী পরিবর্তন বা উন্নতি দেখতে চায়। এই কার্যক্রম থেকে পাওয়া সবচেয়ে ভালো সেবামূলক ধারণাগুলোর একটি ভবিষ্যতে তরুণদের নেতৃত্বে একটি কমিউনিটি সেবা প্রকল্পে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে তরুণরা শুধু অনুষ্ঠানের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং সেই ভাবনাকে বাস্তব কাজেও রূপ দিতে পারবে।
দিনের শেষে সবাই মিলে নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবনা ভাগ করে এবং একসঙ্গে “সরস্বতী নমস্তুভ্যম” প্রার্থনা করে। অংশগ্রহণকারীদের মা সরস্বতীর উদ্দেশে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লিখতেও বলা হয়। সেখানে তারা নিজেদের আশা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতে কেমন মানুষ হতে চায় – সেসব লিখে। চিঠিগুলো একটি ‘Wish Box’-এ রাখা হয়, যা জ্ঞান, স্বপ্ন ও ব্যক্তিগত বিকাশের প্রতীক হিসেবে রাখা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই চিঠিগুলো আবার তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
বিদ্যা যাত্রা ২০২৬-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে ধর্ম সম্পর্কে শেখা শুধু শোনা বা মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তরুণদের খোঁজ নেওয়া, প্রশ্ন করা, বিতর্ক করা, কথা বলা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজেরাই কমিউনিটির জন্য নতুন কাজের ধারণা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে পুরো কর্মসূচিতে তাদেরই কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছিল।
দিনটি শেষ হয় নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়ে – ধর্মের শিকড়ে দৃঢ় থাকতে হবে, নিজের পরিচয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, প্রশ্ন করতে ও শিখতে সাহসী হতে হবে এবং বৃহত্তর সমাজের সেবায় এগিয়ে আসতে হবে।

































































