
“সুস্থ দেহে সুস্থ মন”—এই চিরন্তন প্রবাদটি মানবজীবনের এক গভীর সত্যকে ধারণ করে। মানুষ কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই পূর্ণতা লাভ করে না; তার শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব। আর এই পূর্ণাঙ্গ বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলা। একটি জাতিকে সুস্থ, কর্মক্ষম, দায়িত্বশীল, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলা এখনো শিক্ষার মূলধারায় যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা লাভ করতে পারেনি।
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাবও দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা এখন মাঠের চেয়ে মোবাইল স্ক্রিনেই বেশি সময় কাটায়। একসময় গ্রামের মাঠে, শহরের খোলা প্রাঙ্গণে শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি কিংবা হাডুডু খেলার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত পরিচিত। আজ সেই মাঠগুলো অনেক জায়গায় বিলীন হয়ে গেছে বহুতল ভবন, মার্কেট কিংবা আবাসিক প্রকল্পের ভিড়ে। ফলে শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও মানসিক অবসাদের মতো সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আত্মবিশ্বাসহীনতা, একাকীত্ব ও হতাশাও বাড়ছে। অনেক কিশোর-কিশোরী মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং, সহিংসতা ও অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। কারণ খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়; এটি মানুষের মনকে সুস্থ রাখে, ইতিবাচক চিন্তা তৈরি করে এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন গঠনে সহায়তা করে।
শারীরিক শিক্ষা সাধারণ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরীর ও মন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শরীর সুস্থ না থাকলে মনও সুস্থ থাকে না। তাই শারীরিক শিক্ষা ছাড়া শিক্ষা কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী বইয়ের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি খেলাধুলার মাধ্যমে নেতৃত্ব, সহনশীলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ববোধ, দলগত চেতনা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা লাভ করে। খেলাধুলা মানুষকে পরাজয় মেনে নিতে শেখায়, আবার কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের অনুপ্রেরণাও দেয়।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জে.বি. ন্যাশ বলেছেন, “শারীরিক শিক্ষা গোটা শিক্ষার এমন এক দিক, যা মাংসপেশির সঠিক সঞ্চালন ও এর প্রতিক্রিয়ার ফলে ব্যক্তির দেহ ও স্বভাবের পরিবর্তন সাধন করে।” দার্শনিক সি.এ. বুচারের মতে, “শারীরিক শিক্ষা হলো শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সুনির্বাচিত শারীরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে একজন মানুষকে শারীরিক, মানসিক, আবেগীয় ও সামাজিকভাবে পরিপূর্ণ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।” এই উক্তিগুলো থেকেই বোঝা যায় যে, শারীরিক শিক্ষা কেবল শরীরচর্চার বিষয় নয়; এটি একজন মানুষের সামগ্রিক বিকাশের অন্যতম প্রধান উপাদান।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। জাপান, আমেরিকা, জার্মানি, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। জাপানে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ থাকে। আমেরিকায় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জার্মানদের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো—“আমরা হাসপাতাল চাই না, আমরা খেলার মাঠ চাই।”
এই একটি বাক্যের মধ্যেই সুস্থ জাতি গঠনে খেলাধুলার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ তারা জানে, খেলার মাঠ বাড়লে হাসপাতালের প্রয়োজন কমে যায়।
বিশ্বের অনেক দেশে খেলাধুলা জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি, ফিটনেস সেন্টার, ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন এবং খেলোয়াড়দের পেশাগত উন্নয়ন একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে খেলাধুলাকে এখনো অনেকে শুধুই “অতিরিক্ত কার্যক্রম” হিসেবে মনে করেন। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শারীরিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শারীরিক শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অনেক বিদ্যালয়ে নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, নেই প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম, এমনকি অনেক জায়গায় নিয়মিত শরীরচর্চার কার্যক্রমও পরিচালিত হয় না। কলেজ পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। শরীরচর্চা শিক্ষক থাকলেও তাদের জন্য নির্দিষ্ট পাঠ্যবই, শ্রেণি কার্যক্রম কিংবা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা নেই। ফলে শারীরিক শিক্ষা কার্যত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—কলেজ পর্যায়ের শরীরচর্চা শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও অবমূল্যায়নের শিকার। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েও তারা অনেক ক্ষেত্রে “অশিক্ষক” পদমর্যাদায় কর্মরত। একই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষকরা পদোন্নতির সুযোগ পেলেও শরীরচর্চা শিক্ষকেরা কর্মজীবনের শেষ পর্যন্ত পদবঞ্চিত অবস্থায় থেকে যান। এটি শুধু একজন শিক্ষকের প্রতি অবিচার নয়; এটি শারীরিক শিক্ষা বিষয়টির প্রতিও চরম অবহেলা।
অথচ একজন শরীরচর্চা শিক্ষক কেবল খেলাধুলা শেখান না; তিনি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, সময়ানুবর্তিতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক সময় বন্ধুর মতো হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা মানসিক সংকটও সহজে একজন ক্রীড়া শিক্ষকের কাছে প্রকাশ করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, জাতীয় দিবস উদযাপন, প্যারেড, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও শরীরচর্চা শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সময়ে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলাকে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শারীরিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করলেই হবে না; এটিকে পাবলিক পরীক্ষার অংশ হিসেবেও রাখতে হবে। কারণ যে বিষয় মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত থাকে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটি গুরুত্ব পায় না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, আধুনিক ক্রীড়া সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। শহরাঞ্চলে যেখানে মাঠের সংকট রয়েছে, সেখানে সরকারি উদ্যোগে উন্মুক্ত খেলার স্থান সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ও ভার্চুয়াল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
বিশেষভাবে কলেজ পর্যায়ে “শারীরিক শিক্ষা” বিষয়টি চালু করা এখন সময়ের দাবি। শরীরচর্চা শিক্ষকদের “প্রভাষক” পদমর্যাদা প্রদান এবং পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষককে অবমূল্যায়ন করে কখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত হলে শারীরিক শিক্ষাও শিক্ষার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। শারীরিক শিক্ষা কেবল শরীরচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্বাস্থ্য সচেতনতা, পুষ্টি, প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়মিত খেলাধুলা মানুষকে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখে, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করে। একটি সুস্থ ও দক্ষ যুবসমাজ গঠনের জন্য শারীরিক শিক্ষার বিকল্প নেই।
আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নাগরিক, প্রশাসক, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। যদি আমরা একটি সুস্থ, সচেতন, দক্ষ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। শারীরিক শিক্ষা ছাড়া শিক্ষা কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। একটি জাতির উন্নয়ন, সুস্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সরকার, শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক ও সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শারীরিক শিক্ষাকে অবহেলা নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই গড়ে উঠবে একটি সুস্থ, সবল, সুশৃঙ্খল, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com























































