
পরিবর্তনের ডাকটা কেবল আবেগতাড়িত ছিল না — তা ছিল বাস্তব প্রত্যাশার আর্তনাদ। মানুষের চোখে ছিল একটি স্বপ্ন: সত্য বলার স্বাধীনতা, জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা, শিক্ষার ন্যায্য মূল্যায়ন এবং সম্প্রীতির ধারায় বেঁধে রাখা একটি মানবিক সমাজ। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। স্লোগান ভুলে কার্যকর পরিকল্পনার দাবি আজ আগের চাইতে জোরালো ও সময়োপযোগী। বাংলাদেশের সংবিধান মৌলিক অধিকারের অধীনে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবতা অনেক দূরে। FAO বলছে প্রায় ২ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে (FAO, 2024)। ঢাকায় বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ লক্ষ (BBS, 2023)। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১.১% — দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এক নম্বর নিচু অংশীদারিত্ব (World Bank, 2024)। বেকারত্ব ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে দাঁড়িয়েছে ৬.২%, তরুণদের মধ্যে তা প্রায় ১২.৩% (BBS Labor Force Survey, 2025)। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪,৫৭২টি (Ain o Salish Kendra, 2025)। এসব কাঁচা আকের পেছনে যে সামাজিক বিস্তার আছে — তাকে অস্বীকার করা যায় না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বৈষম্যহীন সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হলেও বাস্তবিক পক্ষে আমরা এখনো চরম বৈষম্যের চার দেওয়ালেই বন্দি।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ের বিষয় — মব ও সমমনা সহিংসতার অভিঘাত। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, ছিনতাই, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধে মোট ১,৯৪১টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে (Human Rights Watch & Dhaka Tribune সমন্বিত প্রতিবেদন)। বাংলা নিউজ ২৪ জানায়, ২০২৫ সালে মাত্র ১০ মাসে ১৭২টি মব-লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। এমন সংকটের মাজখানে প্রতিদিনের রোজকার জীবনে মৃত্যুর সংবাদ—‘ঘরে লাশ, নদীতে লাশ, খালে লাশ’—এমন ছবি দেখে হারিয়ে যায় সমাজের প্রত্যাশা ও আস্থা। প্রশ্ন করা জরুরি: সমস্যার মূলে আমরা কি পৌঁছাতে পেরেছি? শুধু ব্যক্তির দোষ-দরিদ্রতা নয় — সমস্যা গভীরতর, সেটা ব্যবস্থার, নীতির ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার ভেতরে। যদি প্রতিটি লাশের পাশে লেখা থাকত কেন সে মারা গেছে — ‘রাষ্ট্রীয় অবহেলায়’, ‘সামাজিক অবহেলায়’, ‘অর্থনৈতিক অন্যায়ে’ — তখন হয়তো আমরা বুঝতাম মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আপাত ব্যর্থতার প্রতিফলন। দেশের ১০ভাগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু ৯০ভাগ ধর্মীয় সংখ্যাগুরু মানুষের কাছে নিরাপদ নয়। এটা সত্যিই আমাদের জন্য লজ্জার নয় ?
স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা যে সরকারই আসুক, তাকে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর গণতান্ত্রিক কাঠামোতে কাজ করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে আইনের শাসন পুনরুদ্ধার হবে। নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ও বিরোধী কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র কেবল খালি শব্দ থাকবে। প্রশাসনিক সংস্কার ও পুলিশের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অপরাধী যেইই হোক—ক্ষমতার ছায়ায় নয়, আইনের সামনে দাঁড়াতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসন যেসব রাজনৈতিক সংখ্যাতন্ত্রী হস্তক্ষেপে অবলম্বিত, সেগুলো নির্মূল করে পেশাদার, নিরপেক্ষ ও মানবিক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত আদালত ও তদন্ত ব্যবস্থা অপরিহার্য।
সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জনমুখী রূপায়ন। SME খাত, কৃষি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে। কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে; ধনীদের করফাঁকি বন্ধ করতে হবে; আর্থিক সংকট মোকাবেলায় সূচকভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা ছুঁয়ে না গেলে হতাশা ও চরম সিদ্ধান্ত যেমন — সন্তান বিক্রির মতো জঘন্য ঘটনাই সমাজে ঘটবে (যেমন হাবিবুর রহমানের কল্লোল), যা একটি সভ্য দেশের পক্ষে অযোগ্য।
শিক্ষা-ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার শিক্ষায় শুধু বস্তাপচা তথ্য নয় — বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, গবেষণা ও সমালোচনামূলক পাঠ্যবই প্রয়োজন। ইতিহাস বিকৃতির জায়গায় তত্ত্বাবধান তুলে এনে শিক্ষাকে স্বাধীন চিন্তার মঞ্চ করা দরকার। শিক্ষা যদি চাকরির বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সমতাঠে না দাঁড়ায়, তরুণদের হতাশাই সমাজের বিস্ফোরক অবস্থা তৈরি করবে। সামাজিক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মিডিয়া নীতিমালা ভাষা, ধর্ম ও মত ভিন্নতা—এসবকে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মিডিয়ার স্বাধীনতার সঙ্গে ঘৃণা-প্রচারের বিরুদ্ধে কার্যকর নিয়ম থাকা জরুরি; সামাজিক মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিভাজন সৃষ্টি হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে।
স্থানীয় উন্নয়ন ও গরিবদের ক্ষমতায়ন আবাসন সংকট, ঋণ ও জীবনযাত্রার খরচকে কন্ট্রোল না করলে গরীব জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ও জীবনহিত নষ্ট হবে। শহুরে ও গ্রামীণ দু’ভাগে উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নিতে হবে—ভূমি-শ্রম-ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে, লজিস্টিক ও বাজারজনিত সুবিধা নিশ্চিত করে। প্রতিটি লাশ আমাদের জন্য এক প্রশ্নবাণ — আমরা কি আরেকটি লাশ দেখার জন্য অপেক্ষা করব? নাকি আজ থেকেই নতুন দিনের পথে হাঁটা শুরু করব? ভেনেটিক গর্জন নয়, বাস্তব পরিকল্পনা চাই; মব নয়, মানবিকতা চাই। সাধারণ মানুষের কষ্ট, হাবিবুর রহমানের কণ্ঠে ধরা ‘বিক্রি’ শব্দটি মুছতে হলে ছোট্ট সহায়তাও যথেষ্ট—কিন্তু ব্যক্তিগত সহায়তা ছাড়া টেকসই সমাধি হবে না। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পরিবর্তন আনতে হবে, প্রশাসনকে পুনর্গঠিত করতে হবে, এবং শিক্ষায়, অর্থনীতিতে ও সামাজিক নিরাপত্তায় পুনর্বিবেচনা চালাতে হবে।
পরিবর্তন সময়ও চায়, উদ্যোগও চায় — কিন্তু প্রথম শর্তটি হলো ইচ্ছা: সৎ, দায়বদ্ধ ও বাস্তবসম্মত নেতৃত্ব; এবং সেই নেতৃত্বকেই চাপ দিতে হবে জনগণকে। রাজনীতির ভাষা যদি বিভক্তিকরণে বসে, সরকার কীভাবে সমাজকে সংহত করবে? তাই আজই সময় প্রশ্ন তোলার, পরিকল্পনা প্রণয়নের, এবং বাস্তবে হেঁটে যাওয়ার। শ্লোগান নয়—কার্যকর পরিকল্পনা চাই। গর্জন নয়—গঠন চাই। মব নয়—মানবিকতা চাই। আজকের বাংলাদেশ যদি আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, সমভাগ্য ও মানবিক দেশ হিসেবে গড়ে ওঠে—তার জন্য প্রয়োজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা, জনমুখী নীতি ও কার্যকর ন্যায্যতা। বাহ্যিক সংস্কারের পাশাপাশি অধিকগুরুত্বের সাথে মানসিক সংস্কারও শুরু করতে হবে শতভাগ আন্তরিকতার সাথে। আর এসবই শুরু হবে আজ থেকেই — সবার অংশগ্রহণে, সবার দায়বোধে, এবং সবার মানবিকতায়।
সুধীর বরণ মাঝি। শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com

























































