২০০১ সালে ৯/১১ আমি আমার পরিচিত জগতটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। পঁচিশ বছর পর, অনেকটা কাকতালীয়ভাবেই আমি সেই জগতটাকে নতুন করে গড়ে তুলছি।
পার্কিং লট দিয়ে সিভিয়াস (CVS)-এর দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় আমার ছয় বছর বয়সী ভাইজি ফিসফিস করে বলল, “আমার মনে হয় মানুষ ভাবে তুমিই আমার মা।”
আমিও তার দুষ্টুমিভরা হাসির জবাবে হেসে বললাম, “আমারও তাই মনে হয়।” তার সেই হাসিতে যেন মনে হচ্ছিল আমরা দুজন মিলে পৃথিবীকে বোকা বানাচ্ছি। আমি তাকে স্কুল থেকে নিয়ে এসেছিলাম এবং আমাদের একসাথে রাত কাটানোর (sleepover) জন্য তার আবদার অনুযায়ী নকল নখ কিনে দিচ্ছিলাম। সে ঠিক কোনো মেয়ের মতোই শক্ত করে আমার হাত ধরেছিল। আমরা দুজনে মিলে গর্বের সাথে স্বয়ংক্রিয় স্লাইডিং দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম।
আমার নিজের কোনো সন্তান নেই, তাই আমার ভেতরে জমে থাকা মাতৃত্বের সবটুকু ভালোবাসা ও আবেগ আমার ভাইজিই পায়। ২০২০ সালে তার জন্ম হয়; তার জন্মের চার মাস পরেই আমি নিউ ইয়র্কে একটি মর্নিং নিউজ শো-এর এক্সিকিউটিভ প্রডিউসারের চাকরি ছেড়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে আসি। মিডিয়া জগতে আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষী অগ্রযাত্রায় সেটাই ছিল প্রথম বড় কোনো ছেদ। ক্যালিফোর্নিয়ার মাটিতে পা রাখার পর থেকে আমার দৈনন্দিন জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ‘খালা’ বা ‘ফুফু’ হিসেবে আমার ভূমিকা।
জন্মদিন, ব্যালে নাচের অনুষ্ঠান আর স্কুলের নানা আয়োজন আমার দিনলিপির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। রাতের খাবারের আগে লুকোচুরি খেলা, মঙ্গলবার আইসক্রিম খাওয়া আর সাজগোজের জন্য তাকে আমার আলমারি তছনছ করতে দেওয়া—এসবই জায়গা করে নেয় গভীর রাতের ফোনকল, ব্রেকিং নিউজ আর মিডিয়া জগতের নৈশভোজের মতো বিষয়গুলোর বদলে। সম্প্রতি আমার বোন যখন কাজের প্রয়োজনে দেশের বাইরে গেল, তখন আমার ভাইজি নিশ্চিত হতে চাইল যে তার ‘বিকল্প মা’ (substitute mother) তার পাশে থাকবেন। কথাটি শুনে আমার হাসি পেলেও একই সাথে আমার বুকটা যেন এক তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। কারণ, ‘বিকল্প মা’ থাকার অভিজ্ঞতা কেমন, তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।
ড্যাফনি পুলেটসোস কাজ করতেন ‘এওএন’ (AON) নামের একটি বিমা কোম্পানিতে। তাঁর অফিস ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সাউথ টাওয়ারে এবং ৯/১১ এর হামলায় নিহত ২,৯৭৭ জন মানুষের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন।
‘সাজা’—এই নামেই আমরা তাঁকে ডাকতাম। আমার বড় খালাতো বোন ডেইনা তাঁর এই ডাকনামটি দিয়েছিল; কারণ ছোটবেলায় আধো-আধো বুলিতে সে ‘আন্ট ড্যাফনি’ (খালা ড্যাফনি) উচ্চারণ করতে পারত না।
সাজা নিউ জার্সিতে থাকতেন আর আমি বড় হয়েছি ভার্জিনিয়ায়—দূরত্ব থাকলেও আমার জীবনে তিনি ছিলেন এক ধ্রুব আলোর মতো। গ্রীষ্মকাল বা ছুটির সময় আমরা গাড়ি চালিয়ে উত্তরে যেতাম, আর সারা বছর ধরেই সাজা আমাদের সাথে দেখা করতে আসতেন। একবার, মা যখন স্কুল থেকে আমাকে ও আমার ভাইবোনদের গাড়িতে তুলে নিচ্ছিলেন, তখন সাজা আমাদের ক্রাইসলার মিনিভ্যানের পেছনের অংশে লুকিয়ে ছিলেন; হঠাৎ কথাবার্তার মাঝে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। আমরা আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলাম।
সাধারণ মুহূর্তকেও কীভাবে প্রাণবন্ত ও আনন্দময় করে তুলতে হয়, তা সাজা খুব ভালো জানতেন। ঘরে ঢোকার আগেই তাঁর রসবোধের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত; আর তাঁর বাড়িতে রাত কাটানোর অর্থই ছিল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’ দেখা। ছোটবেলায় আমার মনে হতো, ‘দ্য চার্চ লেডি’ বা ‘কফি টক’-এর চরিত্রগুলো যেন আমার ফুফুরই কোনো রূপ (নিউ জার্সির আঞ্চলিক টান বা অ্যাকসেন্ট থাকায় এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছিল)। ‘স্প্রকেটস’-এর মতো কাঁধ ঝাঁকিয়ে নাচানাচি করাটা ছিল আমাদের নিজেদের মধ্যে এক বিশেষ কৌতুক বা ‘ইনসাইড জোক’। তাঁর হাসি যেকোনো বিষণ্ণ মেজাজকেও নিমেষে আনন্দময় করে তুলতে পারত।
তবে তাঁর সাথে কাটানো সেরা মুহূর্তগুলো ছিল বড়দিনের সকালের। সাজা একদম সকালেই আমার দাদা-দাদির বাড়িতে চলে আসতেন; পেছনের দরজার জিঙ্গেল বেল বা ঘণ্টার শব্দেই বোঝা যেত তিনি এসেছেন। তিনি নীল রঙের গদি-আঁটা বড় ‘উইংব্যাক’ চেয়ারটিতে বসতেন—কিশোরীদের মতো পা গুটিয়ে, আর নব্বইয়ের দশকের সেই ফ্রেমহীন চশমার আড়ালে তাঁর চোখগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠত। নতুন কোনো বেবি ডল বা পুতুল খোলার উত্তেজনা আর সেটি তাঁকে দেখানোর আনন্দ—এই দুটো অনুভূতি আমার কাছে অবিচ্ছেদ্য ছিল। তিনি যখন উৎসাহভরে আদরমাখা স্বরে প্রশংসা করতেন, তখন আমার আনন্দ আরও বেড়ে যেত। একবার তিনি তাঁর সব ভাইপো-ভাইজিকে মোটা কালো প্লাস্টিকের চশমা উপহার দিয়েছিলেন, যার সাথে রাবারের তৈরি কলার মতো দেখতে নাক লাগানো ছিল। ওটাই ছিল আমার পাওয়া সবচেয়ে অদ্ভুত বা মজার উপহার, আর একই সাথে সেরাগুলোর একটি। আমরা সবাই মিলে একটা ছবি তুলেছিলাম—একে অপরের ওপর গাদাগাদি করে বসে হাসাহাসি করছি, এক অদ্ভুত অথচ আনন্দঘন পারিবারিক মুহূর্ত। তাঁর উপস্থিতি যেন একটা নিশ্চয়তা দিত যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে। ছোটবেলায় আমি ভাবতাম, সবকিছু বুঝি সবসময় এমনই থাকবে।

২০০১ সালের শরৎকালে আমি বিদেশে পড়াশোনা করছিলাম। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে তখনো ক্লাস শুরু হয়নি, তাই এক বান্ধবীর সাথে ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। ৯/১১ এ বার্সেলোনার একটি রেস্তোরাঁয় বসে থাকার সময় এক ওয়েটার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে যা ঘটেছে’ তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন।
আমি আমার বান্ধবীকে বললাম, “আমার ফুফু ওখানে কাজ করেন।” তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তিনি ভালোই আছেন। তিনি ভালো থাকবেন না—এমনটা তো হতেই পারে না।
তবুও, একটা পে-ফোন খুঁজে আমি বাড়িতে ফোন করলাম। আমার বাবা শান্ত ও সংযত স্বরে পরিস্থিতিটা বোঝানোর চেষ্টা করলেন: “আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু জানি না, সব হাসপাতালে খোঁজ নিচ্ছি।”
এরপর হোস্টেলের টিভিতে আমি সেই ঘটনার দৃশ্যগুলো দেখলাম। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে তিনিও সেই ট্র্যাজেডির শিকার হতে পারেন। সাজা—এমনটা হতে পারে না।
একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি জানি, কোনো বড় দুর্ঘটনার পর সাধারণত কী ধরনের প্রশ্ন ওঠে। তাঁদের বয়স কত ছিল? তাঁদের কি সন্তান ছিল? এসব প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আমরা সাধারণত কোনো মানুষের চলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যতাকে পরিমাপ করি—কে বা কী পেছনে রয়ে গেল, তার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু কোনো মানুষের জীবনের প্রকৃত প্রভাব কেবল তাঁদের পদবি বা আগে থেকে নির্ধারিত সামাজিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ৯/১১ এর ঘটনায় প্রাণ হারানো ২,৯৭৭ জনের প্রত্যেকেরই নিজস্ব এক বিশাল ও অর্থবহ জগৎ ছিল। সেই জগতের খুঁটিনাটি হয়তো আপনার জানা নেই, কিন্তু অন্য কারও না কারও ঠিকই জানা আছে। আর তাঁরা কেবল সেই মানুষটিকে হারানোর জন্যই শোক করেন না, বরং সেই মানুষটির উপস্থিতিতে যেসব মুহূর্ত বা স্মৃতি গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর জন্যও শোকাহত হন। আমার ক্ষেত্রে, “১১ই সেপ্টেম্বর আমি আমার খালাকে হারিয়েছি”—এটুকু কথায় পুরো ঘটনা বা অনুভূতির প্রকাশ ঘটে না। আমার এই শোক কোনো প্রথাগত গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি বা প্রভাব কোনো সংবাদ শিরোনামের সংক্ষিপ্ত পরিসরে ঠিকঠাক ধরা পড়ে না।
তাঁর বয়স কত ছিল? সাতচল্লিশ। না, তাঁর নিজের কোনো সন্তান ছিল না, তবে আমরা তো ছিলামই। পঁচিশ বছর পর, এখন আমার বয়স পঁয়তাল্লিশ, আর আমার জীবনে আছে আমার ভাইজি। সাজাই আমাকে শিখিয়েছিল একজন ফুফু বা মাসি ঠিক কেমন হতে পারেন।
তাঁর শূন্যস্থান হয়তো আমি কখনোই পূরণ করতে পারব না, তবুও প্রতিদিন আমি সাজাকে আমার পাশে অনুভব করি। যখন আমি আর আমার ভাইজি বাড়ির আঙিনায় কোনো পথবিড়ালকে খেতে দিই, তখন তিনি যেন আমাদের সাথেই থাকেন। রবিবারের খবরের কাগজের কমিকস দেখে যখন আমরা হাসি, তখনও তিনি থাকেন আমাদের মাঝে। পাড়ার পিৎজার দোকানে যাওয়ার জন্য যখন আমরা সুন্দর সব পোশাক পরে সাজগোজ করি, তখনও তিনি আমাদের সঙ্গেই থাকেন। তাঁর জীবনের কারণেই আজ আমি এই মুহূর্তগুলোকে প্রাণভরে অনুভব করতে পারছি।
ভাবি, তিনি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তবে তাঁর জীবনে আর কী কী থাকত। লস অ্যাঞ্জেলেসে তিনি যখন আমার সাথে দেখা করতে আসতেন, তখন কেমন লাগত সেই সময়টা? আমার বোন, তিনি আর আমি—আমরা সবাই মিলে গভীর রাত পর্যন্ত ‘এসএনএল’ (SNL) দেখতাম। জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোতেও তিনি কতটা ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতেন!
আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের নামেই নাম রাখা আমার ভাইজি—ড্যাফনিকে—কাছ থেকে জানার মধ্যে তিনি কতটা আনন্দই না পেতেন!































































