উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকস (BRICS) একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সম্মত হয়েছে বলে শনিবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। জোটের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে নয়াদিল্লিতে নেতাদের শীর্ষ বৈঠক শুরুর প্রাক্কালে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে আয়োজক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, জোটটি এখন পূর্ণতা পেয়েছে এবং বিশ্বমঞ্চে তাদের ঐক্য ও ঐকমত্যকে সুনির্দিষ্ট ফলাফলে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত নিয়ে সদস্য দেশ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্য দূর করার প্রত্যাশা নিয়ে এই শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই বৈঠক হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের ছয় মাসব্যাপী যুদ্ধে একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি হামলা পুনরায় শুরু করেছে।
এর আগে আগস্ট মাসের বড় একটি সময়জুড়ে লড়াই কিছুটা স্তিমিত ছিল; তবে সেই সময়ে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে।
রয়টার্সের সাথে আলাপকালে চারটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচকরা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সম্মত হয়েছেন। এতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করা হলেও যেকোনো দেশের একতরফা আগ্রাসনের নিন্দা জানানো হবে। সূত্রগুলো আরও জানায়, শনিবারই জোটের নেতারা এই নথিতে অনুমোদন দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার আনুষ্ঠানিক অনুমতি না থাকায় সূত্রগুলো নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এই ঘোষণাপত্র নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে আয়োজক দেশ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি।
আলোচনা চলাকালে বেশ কিছু বিতর্কিত বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলেও, ভারত সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান দূর করে ঐকমত্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধারাবাহিক আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছে—এমনটাই জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি অবগত এক ভারতীয় সূত্র।
উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও তীব্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ঐকমত্যে পৌঁছানোটা ছিল একটি অত্যন্ত জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলে ওই সূত্রটি উল্লেখ করে।
**পুতিন, শি, পেজেশকিয়ান ও রামাফোসার উপস্থিতি**
পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, এই জোটের জন্য প্রধান পরীক্ষাটি হবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে এমন একটি ভাষা বা বয়ান খুঁজে বের করা যা আবুধাবি ও তেহরান—উভয় পক্ষই মেনে নিতে পারে এবং যার মাধ্যমে যৌথ ঘোষণার পথ প্রশস্ত হয়।
তাঁদের মতে, এ ধরনের যৌথ বিবৃতি হয়তো বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না; তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর নীতির বিরুদ্ধে উদীয়মান দেশগুলোর জোট হিসেবে এটি তাদের ঐক্য প্রদর্শন করবে।
এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্যের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ব্রিকস জোট আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি জানিয়ে নিজেদের অবস্থান বা গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে; কারণ জোটের কোনো কোনো সদস্য মনে করে এসব প্রতিষ্ঠান পশ্চিমা শক্তির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী নেতাদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের শি জিনপিং, ইরানের মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অধিকতর সমতা ও ন্যায়বিচারের পথে পরিচালিত করার মাধ্যমে ব্রিকস দেশগুলোর উচিত ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল, ইরান এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি এক ধরনের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকস সদস্যদের বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাধা কমানো এবং ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারণের আহ্বান জানাচ্ছেন।
**প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকা উচিত: মোদি**
মোদি বলেন, “ব্রিকসকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমাদের বৈশ্বিক সংস্কারের দিকটিও নির্ধারণ করতে হবে। বৈশ্বিক সংকটের ক্ষেত্রে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্ব আজ সামনের সারিতে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা পেছনের সারিতে রয়েছে। আমাদের এই পিরামিড-সদৃশ কাঠামো ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যবস্থাকে অংশীদারিত্বের একটি মঞ্চে রূপান্তর করতে হবে—যেখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কণ্ঠস্বর থাকবে এবং প্রতিটি সদস্যের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হবে।”
মোদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণের বিষয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ভারতসহ অন্যান্য উদীয়মান শক্তির জন্য নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসনের দাবি জানিয়ে বলেন যে, এই সংস্কার আর বিলম্বিত করা উচিত নয়।
মোদি বলেন, “ভারতে অনুষ্ঠিত এই ব্রিকস সম্মেলনের বার্তাটি স্পষ্ট হওয়া উচিত: যদি আমাদের ভবিষ্যৎ অভিন্ন হয়, তবে সেই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অধিকারও সবার হওয়া উচিত।”
ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলো হলো—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের আধিপত্যাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর লক্ষ্যে ২০০৯ সালে এই জোটটি গঠিত হয়েছিল। সম্মিলিতভাবে এই জোটের সদস্য দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।































































