
কান পাতলে আজকাল আর বাতাসের সুরের ছন্দ শোনা যায় না; শোনা যায় ধর্ষণ, বলাৎকার, নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা এবং নির্যাতনের খবর। চোখ মেললে প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের পাশাপাশি চোখে পড়ে কিশোর গ্যাং, মব সন্ত্রাস, ঘুষ-দুর্নীতি, লুটপাট, খুন, অপহরণ, জমি দখল, ছিনতাই, খাদ্যে ভেজাল, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং নানা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। এসব ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাবোধকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবারগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, অভিভাবকেরা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। মানুষের মনে আজ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি এমন একটি সমাজ চেয়েছিলাম?
সমস্যাটি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতার আশঙ্কা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের প্রশ্ন। অপরাধ সংঘটনের পর সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও সময়ের সঙ্গে অনেক ঘটনা মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের জীবনে সেই ক্ষত থেকে যায় দীর্ঘদিন। তাই অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া সংজ্ঞা অনুসারে, ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা সাবেক স্বামীর দ্বারা শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতন কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের ৪৯ শতাংশ আগের ১২ মাসে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। জরিপটি ২৭ হাজার ৪৭৬ জন নারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
এই পরিসংখ্যান দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে সংঘটিত সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে; এটি ধর্ষণ বা সব ধরনের যৌন অপরাধের পরিসংখ্যান নয়। তবু এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু রাস্তাঘাট বা জনপরিসরে সীমাবদ্ধ নয়—অনেক ক্ষেত্রে ঘরের ভেতরেও সহিংসতা ঘটে। জরিপ অনুযায়ী, নির্যাতনের শিকার নারীদের ৬২ শতাংশ তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানাননি। সামাজিক অপবাদ, ভয়, পারিবারিক চাপ ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা অনেক ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। সংবাদপত্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২ হাজার ৫২৫টি ঘটনার বিপরীতে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৮০৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এই হিসাব ১৪টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তৈরি; ফলে এটি দেশে সংঘটিত সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ গণনা নয়।
ধর্ষণ ও বলাৎকার কেবল ব্যক্তির ওপর সংঘটিত অপরাধ নয়; এগুলো মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর নির্মম আঘাত। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন তাদের স্বাভাবিক বিকাশ, মানসিক সুস্থতা ও ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করতে পারে। তাই এসব অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—অপরাধের শিকার মানুষ কি নির্ভয়ে বিচার চাইতে পারেন? অভিযোগ জানানোর পর তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় কি? তদন্তে প্রভাব খাটানোর সুযোগ বন্ধ করা যায় কি? অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাসময়ে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত হয় কি? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতিতে পাওয়া যাবে না; পাওয়া যাবে কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে। দুর্নীতি যখন প্রশাসনিক সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে বাধা সৃষ্টি করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। ঘুষ, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের অনাস্থা বাড়তে পারে। একইভাবে কিশোর গ্যাং ও মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ভয় ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়। কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রভাবশালীর পরিচয়ে অপরাধের অভিযোগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
সম্প্রতি পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান নিয়ে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। ৮৭ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা ২৪ অক্টোবর ২০২৬ সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে মারা যান। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়ার পর গার্ড অব অনার প্রদান ও নিজ এলাকায় দাফন নিয়ে বাধার অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, বাড়িতে কবর খননের পর সেটি মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর ২৫ অক্টোবর দিবাগত রাতে পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে পরিবারের নারী সদস্যরা আবার কবর খনন করে চিতলিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন ঘটনাটির দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। একজন মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, পরিবারের মানবিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিশ্চিত করা। মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান ও দাফন নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া উচিত নয়, যাতে শোকাহত পরিবারকে রাতের অন্ধকারে নিরাপত্তার মধ্যে কবর খনন করতে হয়। মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা রক্ষা, মৃত ব্যক্তির প্রতি সম্মান এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে কিংবা বিশেষ দিবসের আয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; মানুষের মর্যাদা, আইনের শাসন, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সেই চেতনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটতে হবে।
অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহি, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, শিশু সুরক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করতে হবে। পরিবারকেও শিশুদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে সচেতনতা এবং বিপদের মুখে বিশ্বস্ত ব্যক্তির সাহায্য নেওয়ার বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় কঠোরতা মানে যথেচ্ছ ক্ষমতার প্রয়োগ নয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের নামে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা জনতার বিচারের মাধ্যমে কাউকে শাস্তি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। অভিযোগ উঠলে তদন্ত করতে হবে, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় যেন বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে।
অন্যায়ের ঘটনা দেখেও নীরব থাকা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা কিংবা অপরাধীর পরিচয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবাদের মাত্রা নির্ধারণ করা সামাজিক প্রতিরোধকে দুর্বল করে। তবে প্রতিবাদ হতে হবে দায়িত্বশীল, তথ্যনির্ভর ও শান্তিপূর্ণ। গুজব ছড়ানো, যাচাই না করা অভিযোগ প্রচার কিংবা প্রতিশোধমূলক আচরণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ভুক্তভোগীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। যারা অপরাধের পক্ষে অবস্থান নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন, অপপ্রচার চালান কিংবা উগ্রতা ছড়ান, তাঁদের ক্ষেত্রেও আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের প্রকৃতি, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করেই ব্যবস্থা নিতে হবে। রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে অপরাধে উসকানি বা সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সুস্থ ধারার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও খেলাধুলার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে এসব উদ্যোগ আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়; বরং একটি মানবিক ও নিরাপদ সমাজ গঠনের সহায়ক উপাদান।
দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিতভাবে বলার—নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে; মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে; আর অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আওয়াজ তুলুন, গর্জে উঠুন—তবে সেই প্রতিবাদ হোক শান্তিপূর্ণ, যুক্তিনির্ভর ও ন্যায়বিচারের পক্ষে। নীরবতা অপরাধীর সাহস বাড়াতে পারে, আর সম্মিলিত সচেতনতা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং নাগরিকদেরও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে নারী নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন, শিশু নির্ভয়ে বেড়ে উঠবে, পরিবার নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করবে, মুক্তিযোদ্ধারা যথাযথ সম্মান পাবেন এবং কোনো অপরাধী ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ পাবে না। ভয় নয়—সাহস; নীরবতা নয়—প্রতিবাদ; প্রতিহিংসা নয়—ন্যায়বিচার; বিভেদ নয়—মানবিক ঐক্য—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজই রুখে দাঁড়াই।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।

































































