মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে এক বিখ্যাত যুদ্ধে জয়ী মধ্যযুগীয় রুশ রাজপুত্রের হাতের (যে হাত দিয়ে তিনি তলোয়ার চালাতেন) হাড়ের একটি অংশ রাশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের অংশ হিসেবে রুশ অর্থোডক্স চার্চ সেনাবাহিনীর মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
১৩৮৯ সালে মৃত্যুবরণকারী গ্র্যান্ড প্রিন্স দিমিত্রি দনস্কয় ১৩৮০ সালের কুলিকোভোর যুদ্ধে মঙ্গোল ‘গোল্ডেন হোর্ড’-কে পরাজিত করার জন্য রুশ জাতীয়তাবাদীদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। ক্রেমলিনের ভেতরে অবস্থিত মস্কোর ক্যাথেড্রাল অফ দ্য আর্কাঞ্জেল-এ সংস্কার কাজের সময় এই গ্রীষ্মে তাঁর কফিন বা সারকোফ্যাগাসটি উন্মোচিত হয়।
আগস্ট মাসে পুতিন ব্যক্তিগতভাবে রাজপুত্রের সেই সংরক্ষিত দেহাবশেষ পরিদর্শন করেন। তিনি এটিকে “অত্যন্ত অনন্য ও বিস্ময়কর আবিষ্কার” হিসেবে অভিহিত করে বলেন যে, এটি রুশ ইতিহাসের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
রুশ অর্থোডক্স চার্চ—যারা এই সংঘাতের শুরু থেকেই পুতিনকে সমর্থন দিয়ে আসছে—জানিয়েছে তারা দনস্কয়ের ডান হাতের একটি অংশ দোনেৎস্কে পাঠিয়েছে। দোনেৎস্ক হলো ইউক্রেনের সেই চারটি অঞ্চলের একটি, যা পুতিন ২০২২ সালে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন—যে পদক্ষেপকে কিয়েভ অবৈধ ভূখণ্ড দখল হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
দনস্কয়কে “পবিত্র সেনাপতি” হিসেবে উল্লেখ করে রুশ অর্থোডক্স চার্চের মস্কো প্যাট্রিয়ার্কেট জানিয়েছে, তাঁর দেহাবশেষের একটি অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে যাতে তা রুশ সৈন্যদের পাশে অদৃশ্যভাবে অবস্থান করতে পারে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “গ্র্যান্ড প্রিন্সের ডান হাতের একটি অংশ—সেই একই ডান হাত যা দিয়ে তিনি কুলিকোভোর ময়দানে তলোয়ার চালিয়েছিলেন—সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।”
মজবুত কাঁচের নিচে একটি ছোট ও কারুকার্যময় বাক্সে রাখা এই পবিত্র নিদর্শনটি ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ যুদ্ধরেখা জুড়ে মোতায়েন রুশ যুদ্ধ ইউনিটগুলোকে দেখানো হবে বলে জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চার্চের অর্থায়নে গঠিত একটি সোভিয়েত ট্যাঙ্কের বহরের নামকরণ করা হয়েছিল দনস্কয়ের নামানুসারে; ১৯৮৮ সালে রুশ অর্থোডক্স চার্চ তাঁকে সন্ত বা সাধু হিসেবে ঘোষণা করে।
দেশপ্রেম জাগানোর প্রচেষ্টা
দেশপ্রেম ও মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে জনসংযোগের অংশ হিসেবে তাঁর দেহাবশেষ ব্যবহারের এই সুপরিকল্পিত উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে চলতি মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সংসদীয় নির্বাচনের ঠিক আগে।
রুশ সামরিক ও চার্চ কর্মকর্তারা এই আবিষ্কারকে একটি সৌভাগ্যজনক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা ইউক্রেনে—যেখানে এখন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পঞ্চম বছর চলছে—রুশ বাহিনীকে বিজয়ী হতে সহায়তা করতে পারে। এই সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে রুশ বাহিনী এবং যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো এখনও কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মুখ দেখেনি।
সপ্তাহান্তে মস্কোর রাস্তায় এক বিশাল অর্থোডক্স ধর্মীয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে দনস্কয়ের পবিত্র অবশেষ বহন করা হয়।
মঙ্গলবার দোনেৎস্কে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিসৌধে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে, পুতিনের ক্রেমলিন চিফ অফ স্টাফের প্রথম ডেপুটি সের্গেই কিরিয়েঙ্কো সামরিক কমান্ডার এবং রাশিয়ার নিয়োগকৃত আঞ্চলিক প্রধানের সাথে পবিত্র অবশেষটি চুম্বন করেন এবং ক্রুশ চিহ্ন আঁকেন; এ সময় একজন যাজক প্রার্থনা পাঠ করছিলেন।
দোনেৎস্ক ও মারিউপোলের মেট্রোপলিটন ভ্লাদিমির— রাশিয়া কর্তৃক নিযুক্ত একজন জ্যেষ্ঠ ধর্মযাজক—বলেন, “আমাদের সামরিক কর্মী এবং দনবাসে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ—উভয়েরই ওপর শক্তি বা আধ্যাত্মিক বল প্রয়োজন; প্রয়োজন ঈশ্বরের সহায়তা ও আমাদের সাধুদের আশীর্বাদ।” দনবাস হলো একটি বৃহত্তর অঞ্চল যার অন্তর্ভুক্ত দোনেৎস্ক এবং পার্শ্ববর্তী লুহানস্ক; এই পুরো এলাকাটির প্রায় পুরোটাই এখন রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।
অন্যত্র, সামরিক কমান্ডাররা দনস্কয়ের অবশেষকে ঈশ্বর যে রাশিয়ার পক্ষে আছেন, তার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বুধবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সভের্দলভস্ক অঞ্চলের সৈন্যদের গির্জার প্রার্থনায় অংশ নেওয়ার দৃশ্য প্রকাশ করে, যেখানে তারা ধর্মীয় চিত্র (আইকন) ও অর্থোডক্স পতাকা বহন করছিল। এর পাশাপাশি একজন কমান্ডারের সাক্ষাৎকারও প্রচার করা হয়, যিনি বলেন এই পবিত্র অবশেষ রাশিয়ার বিজয়ে সহায়তা করবে।
তবে সমালোচকরা চার্চের বিরুদ্ধে ক্রেমলিনকে খুশি করার জন্য ধর্মীয় প্রথা বা নিয়মভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, দনস্কয়কে সাধু ঘোষণা করার ৩৮ বছর পর কেন হঠাৎ তাঁর অবশেষ উদ্ধার ও ভক্তিভরে পূজা করা হচ্ছে—অথচ দশকের পর দশক ধরে তাঁর সমাধিস্থল বা অবস্থান সম্পর্কে সবাই জানত।
রাশিয়ার বাইরে বসবাসকারী অর্থোডক্স যাজক ও ইতিহাসবিদ আলেকজান্ডার জানেমোনেটস ‘কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার’-এর জন্য লেখা এক নোটে বলেন, “যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে মস্কোর চার্চ নেতৃত্ব ভাবতে শুরু করে যে, রাশিয়া যাকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে অভিহিত করছে, তার প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের জন্য আর কী করা যেতে পারে।” (উল্লেখ্য, এই সেন্টারের পরিচালককে রাশিয়া ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।)
তিনি আরও লেখেন, “তারা ইতিমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে যাজকদের পাঠিয়েছে, প্রতিটি গির্জায় রাশিয়ার বিজয়ের জন্য বাধ্যতামূলক প্রার্থনার ব্যবস্থা করেছে এবং শহরের ওপর দিয়ে ধর্মীয় চিত্র বা আইকন বহনকারী বিমান উড়িয়েছে। যুদ্ধে লিপ্ত কোনো রাষ্ট্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সমস্ত প্রতিষ্ঠানকেই সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য করার চেষ্টা করে।”































































