জানি না, কীভাবে লিখলে কিংবা কীভাবে আমাদের কথাগুলো উপস্থাপন করলে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের ন্যায়সংগত দাবিটির গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন। আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না, চাই শুধু আমাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে দেশের কাজে লাগানোর সুযোগ। আমরা কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক। আমরা পড়াতে চাই, শ্রেণি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই, শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করতে চাই। আমরা অলস থাকতে চাই না। আমরা শুধু নিজেদের স্বার্থের কথা বলছি না। আমাদের দাবি পূরণ হলে এর সুফল কেবল আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আমাদের দাবি পূরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার মানোন্নয়ন, তরুণ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, কর্মসংস্থান, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ। একজন সুস্থ ও কর্মক্ষম মানুষ শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও সম্পদ। তাই শারীরিক শিক্ষায় বিনিয়োগকে কোনো অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির বিনিয়োগ।
শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল বা একটি সার্টিফিকেট অর্জন নয়। একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য। তার জ্ঞানের পাশাপাশি প্রয়োজন সুস্থ শরীর, সুস্থ মন, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা। এখানেই শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলার গুরুত্ব। শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থীকে জ্ঞান দেয়, আর মাঠ তাকে শেখায় সেই জ্ঞান ও জীবনবোধকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে। খেলাধুলার মাধ্যমে একজন তরুণ নিয়ম মানতে, সময়ের মূল্য বুঝতে, পরিশ্রম করতে, দলগতভাবে কাজ করতে, প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে এবং পরাজয়ের পর আবার ঘুরে দাঁড়াতে শেখে।অর্থাৎ মাঠের শিক্ষা জীবনের শিক্ষারই অংশ।
বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে শারীরিক শিক্ষাকে সুস্বাস্থ্য, শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তি থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও শারীরিক শিক্ষার প্রসারের কথা বলা হয়েছে। তাহলে রাষ্ট্রের নিজস্ব শিক্ষানীতিতে যে বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, বাস্তব শিক্ষাব্যবস্থায় সেটিকে প্রান্তিক করে রাখার সুযোগ কোথায়? বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে উপযুক্তভাবে প্রশিক্ষিত ও অনুপ্রাণিত নাগরিক তৈরি করা যায়। ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মাদক ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে। এই সাংবিধানিক দায়িত্বের আলোকে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, সুস্বাস্থ্য এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলাকে আরও কার্যকর করা সময়ের দাবি।
শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব শুধু আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) শিশু ও কিশোরদের নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। WHO-এর Guidelines on Physical Activity and Sedentary Behaviour ২৫ নভেম্বর ২০২০ প্রকাশিত হয় এবং এতে ৫–১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য নির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম শুধু শারীরিক সক্ষমতা বাড়ায় না; এটি হাড়ের স্বাস্থ্য, জ্ঞানীয় সক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার জন্যও উপকারী। বিপরীতে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ভবিষ্যতে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।UNESCO-ও মানসম্মত শারীরিক শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের শারীরিক, সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। সহযোগিতা, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দলগত কাজের মতো জীবনদক্ষতা বিকাশেও খেলাধুলার ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ব যখন শারীরিক শিক্ষাকে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে, তখন বাংলাদেশে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখার সুযোগ নেই।
আজকের তরুণ সমাজ নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি। মাদকাসক্তি, হতাশা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপরাধপ্রবণতা এবং আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা পরিবার ও সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু আইন, শাস্তি কিংবা সচেতনতামূলক বক্তৃতা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তরুণদের সামনে সুস্থ ও ইতিবাচক জীবনযাপনের বাস্তব বিকল্প তৈরি করতে হবে। সেই বিকল্পের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম খেলাধুলা। একজন তরুণ যখন মাঠে থাকে, তখন তার সময় ও শক্তি ইতিবাচক কাজে ব্যয় হয়। সে প্রতিযোগিতা করতে শেখে, ব্যর্থতা মেনে নিতে শেখে, নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টা করে এবং দলগত সাফল্যের জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে শেখে। এই অভিজ্ঞতাগুলো তার চরিত্র ও জীবনদৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। তরুণদের মাদকের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
দেশপ্রেম শুধু বক্তৃতা বা স্লোগানের বিষয় নয়। দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, দলগত চেতনা এবং দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতার মধ্য দিয়েই দেশপ্রেম গড়ে ওঠে। খেলাধুলা এসব মূল্যবোধ চর্চার একটি কার্যকর ক্ষেত্র। একটি দলের হয়ে খেলা একজন শিক্ষার্থী শেখে—ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের সাফল্য কখনো কখনো বড়। সে শেখে নেতৃত্ব দিতে, আবার প্রয়োজনে নেতৃত্ব মেনে নিতে। জয় তাকে আত্মবিশ্বাসী করে, পরাজয় তাকে ধৈর্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। এই কারণেই বলা যায়— “ক্রীড়াই শক্তি, ক্রীড়াই বল; ক্রীড়াতেই বিশ্বজয়।“ একজন তরুণকে দেশের পতাকার নিচে মাঠে খেলতে দেখা হয়তো একটি সাধারণ দৃশ্য; কিন্তু সেই দৃশ্যের মধ্যেই তৈরি হতে পারে দেশ ও জাতির প্রতি গভীর ভালোবাসা।
প্রশ্ন হলো—যেখানে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য কলেজ শরীরচর্চা শিক্ষক রয়েছেন, তাঁদের যথাযথভাবে শ্রেণি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হবে না কেন? একজন শরীরচর্চা শিক্ষক শুধু বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নন। শিক্ষার্থীদের শারীরিক শিক্ষা দেওয়া, স্বাস্থ্য ও ফিটনেস সম্পর্কে সচেতন করা, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহিত করা, খেলাধুলার দক্ষতা বিকাশ এবং সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলাও তাঁর শিক্ষাগত দায়িত্বের অংশ। রাষ্ট্র যখন একজন শিক্ষককে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করেছে, তখন তাঁর দক্ষতাকে যথাযথভাবে কাজে না লাগানো এক ধরনের মানবসম্পদ অপচয়। একজন শিক্ষককে নিষ্ক্রিয় রাখার অর্থ শুধু একজন মানুষের কর্মক্ষমতা নষ্ট করা নয়; এর অর্থ শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাক্ষেত্র থেকেও বঞ্চিত করা। আমাদের দেশে কলেজ শরীর চর্চা শিক্ষক পদের নাম হলেও তাদের পদবী অশিক্ষক । চাকুরী জীবনে তাদের কোন পদোন্নতি নেই। যেই পদে নিয়োগ সেই পদেই অবসর। যা খুবই লজ্জাজনক এবং হতাশাজনক। একই পদে স্কুল পর্যায়ে পদোন্নতির সুযোগ আছে।
রাষ্ট্র যখন প্রশিক্ষিত কলেজ শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগ করেছে, তখন তাঁদের শ্রেণি কার্যক্রমের বাইরে রেখে রাষ্ট্র কীভাবে শিক্ষার সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করবে? আমাদের দাবি তাই কেবল চাকরি বা পদসংক্রান্ত কোনো দাবি নয়। এটি শিক্ষার্থীর অধিকার, শিক্ষার মানোন্নয়নের দাবি এবং একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার দাবি। শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলার পরিসর বাড়লে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রশিক্ষক, কোচ, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, ফিটনেস, ক্রীড়া বিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। ফলে এটি শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। সুতরাং শারীরিক শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু মাঠ বা ক্রীড়া সরঞ্জামে ব্যয় নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ।
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের আবেদন খুব পরিষ্কার—আমাদের করুণা নয়, কাজের সুযোগ দিন। আমাদের অনুগ্রহ নয়, যোগ্যতা কাজে লাগানোর সুযোগ দিন। আমাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নিন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিন। আমাদের দাবিকে কেবল একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর দাবি হিসেবে দেখবেন না। এটিকে দেখুন শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের অংশ হিসেবে। আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হবে না; জীবনের জন্যও প্রস্তুত হবে। যেখানে শ্রেণিকক্ষ ও মাঠ একে অপরের পরিপূরক হবে। যেখানে বইয়ের পাশাপাশি শরীর, মন, চরিত্র ও নেতৃত্বেরও বিকাশ ঘটবে। আমরা কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক। আমরা পড়াতে চাই। আমরা শ্রেণি কার্যক্রমের সঙ্গে থাকতে চাই। আমরা শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে চাই। আমরা তরুণদের মাদকের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে চাই। আমরা নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের চেতনা জাগাতে চাই। আমরা দেশের জন্য কাজ করতে চাই। আমরা অলস থাকতে চাই না। রাষ্ট্র যদি আমাদের যোগ্যতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগায়, তাহলে হয়তো কয়েকজন শিক্ষক তাঁদের প্রাপ্য কর্মক্ষেত্র ফিরে পাবেন; কিন্তু এর সুফল পাবে আরও বড় একটি পরিসর—আমাদের শিক্ষার্থীরা, আমাদের তরুণ সমাজ এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ। আমাদের বসিয়ে রাখবেন না। আমাদের কাজে লাগান। কারণ আমরা বোঝা নই—আমরাই রাষ্ট্রের মানবসম্পদ।
সুধীর বরণ মাঝি, শরীর চর্চা শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।


































































