
প্রতিদিন ভোরে সামসু সাহেব ঘুম থেকে উঠে সকালের দৈনন্দিন কাজ সেরে নামাজ পডে বের হন মাঠা বা ঘোল খেতে। এটা তার নিত্য দিনের অভ্যাস, তিনি ঘোল খেয়েই বাসায় চলে আসেন, এসেই সোজা চলে আসেন নাস্তার টেবিলে। দুই স্লাইস পাউরুটি অরেঞ্জ জ্যাম দিয়ে খেয়ে নেন তারপর এক গ্লাস দুধ পান করে টেবিলে বসেই আজকের খবরের কাগজ দেখেন আর যে খবরটি তার কাছে ভাল লাগে সেটা জোরে জোরে পড়ে শোনান নাস্তা করতে আশা টেবিলের সবাইকে। এরপর তিনি চলে যান অফিসে, কাজ শেষে বাসায় আসতে আসতে সেই বিকেল ৫টা সাড়ে ৫টা বেজে যায়। কোন কোন দিন হাতে করে কিছু না কিছু খাবার আনেন। আজ হাড়ি ভাঙা আম আর “আর্ল গ্রে” চা সাথে করে নিয়ে এসেছেন, নাস্তার টেবিলে চা পান করার সময় তাকে লিফটন চা দেওয়া হয়েছিল তাই বুঝতে পেরেও কিছু বলেননি কারন তিনি বেশ ভালই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যে চা পছন্দ করেন সেটি আজ আর নাই।
তার সবেধন নীলমনি একটিই ছেলে সন্তান, সম্প্রতি পড়া শেষ করেই তার বন্ধুর এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ফার্মে কাজ নিয়েছে। চাকরী পাওয়াতে তিনি ভীষন খুশী, যদিও বেতন খুব একটা বেশী না তারপরও ছেলে যে চাকরী পেয়েছে সে জন্য বাসার সবাই আনন্দিত সেইসাথে এক এক জনের এক একটি আবদার কেউ থ্রি পিস, কেউ বা জামদানী শাড়ী, ইত্যাদি বায়না তাদের শেষ হয় না তবে ছেলে নিলয় কাউকে হতাশ করেন না, সব হবে হবে বলে সবাইকে সান্তনা দেন।
নিলয়ের বোন ডাক্তার। তার আয় ইনকাম খুব ভাল এবং তার হাত জশও রয়েছে, তিনি হাসপাতালে কাজ শেষে সন্ধ্যার দিকে তার বাসার নীচ তলায় চেম্বারে বসেন। তারও যে আবদার রাখতে হয় না তা কিন্তু নয়, তার এক ভাই নিলয় আর বোন সে নিজে কিন্ত আবদার রাখতে হয় সংসারের সবার জন্য। তাদের বাসায় যারা থাকে তাদের জন্যও যেমন মামাতো ভাই ১ জন, চাচাত ভাই-বোন ২জন আর খালাতো বোন ১জন এ ছাড়া তার ২ সন্তানের আবদার, এখানে বলে রাখা ভাল আগে তার ছেলে-মেয়েরা এরকম ছিলো না কিন্ত এখন বড়দের দেখা দেখি তারও বায়নার দলে চলে গেছে একেই বলে সঙ্গদোষ।
তাদের অভিভাবকদের মতই তাদের সন্তান সংখ্যা সমান। বাবা এবং মায়ের ইচ্ছা তাদের ছেলেকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা, কিন্ত ছেলে নিলয় বেকে বসেছে, সে এখন বিয়ে করতে রাজী নয়। আরও কিছুকাল সে ব্যাচেলার জীবন উপভোগ করতে চায়। মা নিলয়ের পিছনে লেগেই আছে, সারাদিন কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে যখন সে ঘরে ফেরে তখন থেকেই শুরু হয় মায়ের ভাঙা রেকর্ড, সেই একই আবদার, বিয়ে, বিয়ে আর বিয়ে। শেষে নিলয় বিরক্ত হয়ে কাজ শেষে আর আগের মত বাসায় ফেরে না, কারণ বিয়ের প্যাচালে সে অতন্ত মনক্ষুন্ন।
বাবা সমস্যাটা বুঝতে পেরে গিন্নিকে মানা করেন বিয়ের ব্যাপারে আর যেনো জোর জবরদস্তি করা না হয়, তিনি আরও বলেন, আজকালের ছেলে-মেয়েদের জোর করলে হিতে বিপরিত হতে পারে, তাই ও যখন বলেছে তখন বিয়ের জন্য আর চাপ দিও না, ওর এখনো “বিয়ের ফুল ফোটেনি” এই ভেবেই সান্তনা নাও। কিন্ত মা নাছোড়বান্ধা, যার ফল হলো নিলয়ের সাথে বাসার দুরত্ব বেড়ে গেলো।
নিলয় সকালে নাস্তা করে বের হয় আর আজকাল সে রাত করে বাড়ি ফেরে। তার খাবার ঘরে একটা প্লেট দিয়ে ঢাকা থাকে, এদিকে মা খুব দুঃখ পান কিন্ত কিছুইতো আর করার নাই, তীর তো ধনুক থেকে বেরিয়ে গেছে।
নিলয়ের এক মামাতো বোন রয়েছে, মুরুব্বীদের ইচ্ছা ঘরের মেয়েকে ঘরে ঠাঁই দিতে। কিছুদিন মায়ের নীরবতার পর আবার শুরু হলো বিয়ের পীড়িতে বসার জন্য ঘ্যান ঘ্যানানি আর প্যান প্যানানি এবার শুধু মা নয় সাথে যোগ হয়েছে মামাও। আগে যাওবা নিলয় কাজ শেষে ঘরে ফিরতো এবার থেকে নিয়মিত আর ঘরে ফেরার নাম করে না কারণ ঐ একটাই। সে কাজ শেষে অফিসেই থেকে যায়। অফিসের কেউ তা জানে না একমাত্র দারোয়ান ছাড়া। এ ভাবেই চলছে আজকাল নিলয়ের জীবনযাত্রা। অবশেষে মা এবার বিয়ের ব্যাপারটা ক্ষান্ত দিয়ে ছেলেকে আবার ঘরমুখী করার চেষ্টা করলেন। নিলয় সমস্ত কিছু বিবেচনা করে শান্ত ছেলের মত ঘরে ফিরে এলো।
একদিন বিকালে সামসু সাহেব সিনেমার টিকিট নিয়ে এলেন। “রবীন হুড” ছায়াছবির। এসে টিকিটগুলি ছেলে নিলয়ের হাতে দিয়ে বল্লেন, ছোট বেলায় মোটামুটি ভাবে তোমরা রবিন হুডের সাথে বেশ পরিচিতি, তাই তোমরা ছবিটি দেখলে মজা পাবে, সেখানে নায়ক রবিন হুড ছাড়াও তার বন্ধু লিটিল জন ও ফাদার টাক আছে বেশ মজার মজার কাহিনী দিয়ে বইটি শেষ হয়েছে। সময়মতো নিলয় তার পছন্দের ভাগ্নে ও ভাগ্নিকে নিয়ে সিনেমা হলের দিকে রওয়ানা দিলো, অন্যরা মন খারাপ করে বসে রইলো, সামসু সাহেব সেটা লক্ষ করে জানালেন, তোমাদের মন খারাপ হবার কিছু নেই আগামীতে সবার জন্য টিকিট আনা হবে।
একদিন নিলয় তার বন্ধুদের সাথে “রবিনসন ক্রশো” সিনেমাটি দেখে বাসার সবার জন্য টিকিট নিয়ে এলো। সবাই মিলে হৈ চৈ করতে করতে সিনেমা দেখতে গেলো। গল্পটি ছিল কিভাবে ক্রশো একা একা নির্জন দ্বীপে কাটিয়েছিল তারই এক কাহিনী নিয়ে গড়া, সিনেমাটা সবার খুব ভাল লেগেছিল।
এভাবেই দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছিল সামসু সাহেবদের সংসার। একদিন তার বোন ক্লিনিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেই নিলয়ের নাম ধরে উচ্চ স্বরে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢুকে এসেই হাপাতে হাপাতে বল্লো, আমার ওখানে অপারেশন করতে গিয়ে এক রোগীর অবস্হা খুবই খারাপ, এখন আমি কি করবো? পুলিশ ডাকবো সে সাহসও পাচ্ছি না। ইতিমধ্যে নিলয় অফিস শেষে বাসায় এসে সব খবর শুনেই ক্লিনিকের দিকে গেলো, পরে জানা গেলো এক রুগী ক্লিনিকে একা একা এসে এ্যাবরসন করাতে এসেছিল, ডাক্তার সাহেবা তখন ওখানে ছিলেন না, অভিজ্ঞ নার্স মাতব্বরী করে নিজেই কাজ শুরু করে ছিলেন এখন তো রক্ত বন্ধ হচ্ছে না, এখন কোন রকম রক্ত পড়া বন্ধ হলেও রুগীর অবস্থা খুব একটা ভাল নয়, নিলয় যদি রুগীকে হাসপাতালে নিয়ে যায় তাহলে যাহোক একটা ব্যাবস্থা হতে পারে।
তখন নিলয়ের সাত পাঁচ ভাবার সময় ছিল না, গ্যারেজ থেকে গাড়ী বের করেই রুগীকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দিলো। ডাক্তাররা রোগীকে দেখে তাড়াতাড়ি ও টি (অপারেশন থিয়েটার) তে নিয়ে যাবার জন্য আহ্বান জানালেন নার্সকে। সার্জারী বা দুর্ঘটনা অথবা আঘাত জনিত কারনে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো মুস্কিল হয়ে পড়ে কারণ সে ক্ষেত্রে পুলিশের অনুমতি ছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সমস্যায় পড়তে পারে। যাহোক রুগীর হয়ে যে কেউ ফর্ম পূর্ন করতে পারে। সেখানে রুগীর সাথে কি পরিচয় তা লিখতে হয়, এ ক্ষেত্রে নিলয় ভেবে পেলনা কি লিখবে শেষে সাত-পাঁচ ভেবে রুগীর সাথে কি সম্পর্ক সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সাক্ষর দিয়ে চলে আসলো রুগীর কাছে। কিছুক্ষণ পর নার্স এসে নিলয়কে নিচু গলায় বল্লো, আপনি যে উনার স্বামী সেটা লেখেন নি? যা হোক আমরা তা পূরন করে দিয়েছি। কথাটি বল্লেই নার্স চলে গেলেন। নিলয় কিংকর্তব্য বিমূর হয়ে ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে দরজার দিকে চেয়ে রইলেন, নার্সটা নিলয়ের কোন জবাব না শুনেই দ্রুত চলে গেলেন দরজা ঠেলে। এদিকে রুগীর জ্ঞান ফিরে এসেছে, নিলয় ও নার্সের মধ্যে যে কথা হলো সে সম্পূর্ন কথাই শুনলো কিন্ত কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে রইলো। ডাক্তার এসে নিলয়কে রিলিজ সার্টিফিকেট দিয়ে জানালো, আপনি আপনার গিন্নিকে ঘরে নিয়ে যেতে পারেন। তখন নিলয়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো, কি করবে এখন? সেতো রুগীকে চেনেই না, এমন কি কোন দিন দেখেওনি। নিলয় রুগীর কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বল্লো, আপনার ঠিকানাটি যদি দিতেন তা’হলে আপনাকে বাসায় পৌছে দিয়ে আমি মুক্ত হতে পারতাম। মেয়েটি জবাব না দিয়ে বিছানায় পাস ফিরে রইলো। এদিকে মহা বিপদে পড়ছে দেখে নিলয় ভয় পেয়ে গেলো এমন সময় মা ও তার বোন এসে জানলো মেয়েটিকে রিলিজ করেছে। তারা ভাবলো এখন মেয়েটিকে তার বাবা-মায়ের কাছে রেখে আসবে। এদিকে মেয়েটি কান্না জুরে দিলো না না আমি এখন বাসায় যাবো না ২/১ দিন পরে যাবো। নিলয়ের মা আর বোন বোবা দৃষ্টিতে পরস্পর পরস্পরের দিকে চেয়ে হা হয়ে গেলো, পরিশেষে সিদ্ধান্ত নিলো আপাততঃ তাদের বাসায় নিয়ে যাবে।
বাসায় এসে যখন শুনলো মায়ের সাথে রুগীটি সুস্থ হয়ে তাদের বাসায় এসেছে তখন নিলয় প্রমোদ গুনলো তবে সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো যতদিন মেয়েটি তাদের বাসায় থাকবে ততদিন সে আর রুগীর কাছে ভুলেও যাবে না। পরে মেয়েটির নাম জানা গেলো ‘স্নিগ্ধা’। বাসায় সে নামেই ডাকা হতে লাগলো, আরো জানা গেলো তাদের বাড়ী বনানীতে। নিলয়ের আর বুঝতে বাকী রইলো না আলালের ঘরে দুলাল তাই এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। ২ দিন পর সকালে নাস্তা করার সময় স্নিগ্ধা জানতে চাইলো, মায়ের কাছে উনার কয় ছেলে- মেয়ে? মা জানালেন এক ছেলে আর এক মেয়ে। পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল কোথায় আপনার ছেলেকে তো দেখলাম না। মায়ের উত্তর, ছেলে আমার বড়ই লাজুক তাই সাধারনত সবাইকে নিয়ে নাস্তা করে না, তার নাস্তা তার রুমেই দিয়ে আশা হয়, কোন রকম খেয়েই সে অফিসের দিকে বেড়িয়ে পড়ে, আর ফেরে সেই গভীর রাতে। মজার কথা হলো আগে সে অফিস ছুটি হলে বিকালে বাড়ি ফিরে আসতো কিন্ত ইদানিং তার বিয়ের জন্য চেষ্টা করছি তাই তিনি গাল ফুলিয়ে রাগ করে আমাদের সাথে কথাও বলে না আবার দেখাও করতে চায় না। সে নিজের মত নিজে চলে। এখন স্নিগ্ধা তুমিই বলো, ছেলের বিয়ের বয়স হয়েছে, আমরাওতো নাতি-নাতনি দেখতে চাই। কিন্ত সেদিকে তার একদম খেয়াল নাই।
অবশেষে মেয়েটির কাছ থেকে তার ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার নিয়ে মা ফোন করে তাদের অভিভাবকদের কাছে সিন্ধাকে ফেরৎ দিলো, কিন্ত কেন সে নিলয়দের বাসায় ছিলো সে কথা কেউ জানালো না, শুধু বল্লো, তাদের মেয়ের সাথে বেড়াতে কক্সবাজার গিয়েছিলো। যতদিন সে নিলয়দের বাসায় ছিলো একদিনের জন্যও নিলয়ের সাথে স্নিগ্ধার দেখা হয়নি। তবে এ কথা ঠিক স্নিগ্ধা হাসপাতালে একবার দেখেছে কিন্ত সেই দেখাতেই সে তাকে ভুলতে পারেনি। এদিকে সিন্ধার বিয়ের ব্যাপারে কথা এগিয়ে যাচ্ছিল। যেদিন পাকা দেখা হবে অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে দেখা ও কথা বলবে সেদিন ছেলে তার অভিভাবক ছাড়া তার কিছু বন্ধু বান্ধবকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।
বিয়ের কনে এলো অবাক দৃস্টিতে নিলয় চেয়ে দেখলো আরে এ যে স্নিগ্ধা, ওদিকে সিন্ধা দেখলো এ যে নিলয়? দুজনের চোখা চোখি হওয়াতে দুজনের একটা কেমন জানি শিহরণ জাগলো। পরে জানা গেল মেয়ে এখন বিয়ের পীড়িতে বসতে রাজী নয় তাই বিয়ে ভেঙে গেলো। তারপর থেকে নিলয় স্নিগ্ধার কথা শয়নে- স্বপনে ভেবেই চলেছে। শেষ পর্যন্ত নিলয় মনস্থির করে ফেল্লো বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে স্নিগ্ধাকেই করবে। একদিন নিলয় বোনের ক্লিনিকে গিয়ে বোনকে বলল, সে বিয়ে করতে রাজী তবে মেয়েটি স্নিগ্ধার মত হতে হবে। এ কথা জানার পর নিলয়ের বাবা-মা হালে পানি পেলো।
কিন্ত শেষে কি নিলয় আর স্নিগ্ধার বিয়ে হয়ে ছিল? সবাই কি তা মেনে নিয়েছিলো? সে কথা না হয় নাইবা বলি তবে শুধু এটুকুই বলি “মধুরণ সমাপয়াৎ”।









































