আজ বিশ্ব বই দিবস, বই দিবসে নিজ এলাকার ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে নবীগঞ্জের কৃতিসন্তান সাংবাদিক গগেষক মতিয়ার চৌধুরী লিখিত “নবীগঞ্জের ইতিকথা” গ্রন্থটি সংগ্রহ করতে পেরে আনন্দিত হয়েছি। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। এই গ্রন্থ সম্পর্কে অনেকের কাছে শুনলেও এর আগে আমার পড়ার সুযোগ হয়নি। প্রায় চারশত পৃষ্টার এই বইটি হাতে পেয়ে আমার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া জনাতে এই আয়োজন।
বইটি আমাদের সিলেট বিভাগের অন্যতম ও ঐতিহ্যবাহী উপজেলা নবীগঞ্জ সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে। লেখক নবীগঞ্জ এর কৃতি মানুষ মতিয়ার চৌধুরী। ৪১ বছর আগের বইটি এখন নতুন রুপে আরো তথ্য বহুল করে মুদ্রিত হয়েছে। কিছুদিন আগে এই বইটির পোস্ট দেখেছিলাম ভার্চুয়াল মাধ্যমে। লেখক এর সাথেও কথোপকথন হয়েছে- কিন্তু তিনিও সুদুর প্রবাস লন্ডনে! বইটি হাতে পাবার জন্য কিছু দিন অপেক্ষা করেছিলাম তাই আজ ছুটে গেলাম আউশকান্দিতে সাংবাদিক এম. মুজিবুর রহমান মুজিব ভাইয়ের হাত থেকে এই বইটি সংগ্রহ করলাম। আসলে আমাদের নবীগঞ্জ এর ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে শেকড় সন্ধানী তেমন কোন বই নেই! শেকর সন্ধানী অনেক দুরূহ কাজ করেছেন লেখক মতিয়ার চৌধুরী।
আমাদের মতো নব প্রজমন্মের তরুণ সমাজ অনেকেই জানিনা যে নবীগঞ্জ এক সময়ে রাজস্ব জেলা ছিল! এ অঞ্চলে আছে বড় দুটি চা-বাগান, অনেকেই সেটা জানিনা। উক্ত উপজেলা নিয়ে ইতিহাস জানতে হলে এই বইটি খুবই গুরুত্ব পূর্ণ। একসময় আমাদের নবীগঞ্জ ছিল একটি রাজস্ব জেলা, এটি আসাম প্রদেশের একটি জেলা হিসেবে সিলেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশের কবল থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে সিলেট তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একটি জেলায় পরিণত হয়। এছাড়া এই বইয়ে রয়েছে নবীগঞ্জ নামকরন নিয়ে আলোচনা, রয়েছে নবীগঞ্জ বাজার প্রতিষ্টার ইতহাস।
“নবীগঞ্জের ইতিকথা” গ্রন্থটি মূলত একটি আঞ্চলিক ইতিহাসভিত্তিক গবেষণাধর্মী রচনা, যেখানে নবীগঞ্জের অতীত, সমাজ-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনৈতিক বিবর্তন এবং লোকজ ঐতিহ্যকে সুসংবদ্ধভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গ্রন্থটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে কেবল ঘটনাপঞ্জি বা তারিখের বিবরণ নেই; আছে মানুষের গল্প, তাদের জীবনসংগ্রাম, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক রূপান্তরের ধারাবাহিকতা। এরপর লেখক ক্রমান্বয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে নবীগঞ্জের অতীতকে উন্মোচন করেছেন।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপটে অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিন্যাস, শাসনব্যবস্থা এবং বহিরাগত প্রভাবের বিষয়গুলো সংক্ষেপে হলেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় নবীগঞ্জের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় যে পরিবর্তন ঘটে, লেখক তা বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নবীগঞ্জের সম্পর্ক ও প্রতিক্রিয়াও গ্রন্থে যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে। রয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই অঞ্চলের অবদান, গণহত্যা. শহীদদের তালিকা, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা। লেখক তুলে ধরেছেন এই অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির কথা।
আসলে চিন্তার বিষয় লেখক বইটি প্রথম যখন লিখেছিলেন এ নিয়ে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। কারণ তখন ছিল এনালগ যুগ তখন কিছু তথ্য জানার জন্য তিনি ছুটে গিয়েছেন নিরন্তন দিক দিগান্তে এবং অনেকের কাছ গিয়ে অনেক কিছু জেনেছেন অনেক কষ্ট উপত্যাকার মধ্যে এই বইটির প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু বর্তমান এই ডিজিটাল যুগে হাতের মুঠোর মধ্যেই সব কিছু তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তখনতো সেই সময় ছিল না! লেখক দূরহ কাজ করেছেন তা বুঝা যায়। আজ এতো বছর পর আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে যে বইটি তুলে ধরেছেন তার জন্য জানাই অন্তস্থল থেকে সাধুবাদ। আর শেকর সন্ধানী মানুষ না হলে এরকম দুরূহ কাজ করাই সম্ভব নয়।
আর হবেন না কেন, তার পারিবারিক যোগসূত্র জানার জন্য তাকে যেতে হয়েছে ভারতের গুজরাটে। আর মজার বিষয় হচ্ছে তিনি ৭ দিনের জন্যে গিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে গিয়ে ১মাস অতিবাহিত করে সেই শেকড়সন্ধানী কাজটি শেষ করে চলে এসেছিলেন এ নিয়ে লেখাটা খুব ভাল লেগেছে। যাইহোক, আজ বিশ্ব বই দিবস ২০২৬ বইটি হাতে পেয়ে এই পোস্টটি করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।
আর যদি আমাদের নবীগঞ্জ নিয়ে অনেকেই জানতে চান, তাহলে এ বইটি প্রত্যেকের পড়া এবং সংগ্রহ করা উচিত। বইটি সংগ্রহ করতে হলে মাঈন লাইব্রেরী, সুজন বইঘর অথবা অনলাইন মাধ্যমে rokomari.com থেকে দেশের যেকোন প্রান্তে বসে সংগ্রহ করতে পারেন উক্ত বইটি। আবারও ধন্যবাদ জানাই লেখক মতিয়ার চৌধুরী ভাইকে সুন্দর করে বইটি প্রকাশ করার জন্য। এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নবীগঞ্জ উপজেলার ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য। এই বইটি ইংরেজি অনুবাদ সংস্করণ করার জন্য আশাবাদ ব্যক্ত করছি। এ বইটি প্রকাশ করেছে বাসিয়া প্রকাশনী সিলেট ।








































