
কথা ছিল—এই দেশ হবে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-পাহাড়ি-আদিবাসী-ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সবার। কথা ছিল—লড়াইটা হবে ভাত-কাপড়ের, রুটি-রুজির, মানুষের জীবনমান ও মর্যাদার। রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন নিয়ে, যেখানে ধর্ম, জাতিসত্তা কিংবা শ্রেণি নয়—মানুষই হবে রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে আজ নির্দ্বিধায় বলতে হয়, সেই স্বপ্ন কেবল ভাঙেনি—পরিকল্পিতভাবেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে আমরা যে ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছি, তা উন্নয়নের কোনো রূপকথা নয়। এটি শোষণ ও বঞ্চনার এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ধারাবাহিকতা। প্রতিশ্রুতি ছিল সমতার, বাস্তবতা হয়েছে চরম অসমতার। অঙ্গীকার ছিল জনগণের রাষ্ট্র গড়ার, কিন্তু রাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে একটি ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পাহারাদারে পরিণত হয়ে।
এই ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নিজেদের শোষণ ও লুটপাট নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে কৌশলে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। জনগণের শ্রেণিগত প্রশ্ন আড়াল করতে উসকে দেওয়া হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। বারবার সৃষ্টি করা হয়েছে ধর্মীয় বিভাজন, উস্কে দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদ, আর তার প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। সংখ্যালঘু নির্যাতন এখানে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি শাসনব্যবস্থার একটি কার্যকর হাতিয়ার।
প্রতিবারই যখন মানুষ ভাত-কাপড়, কাজ আর ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন তোলে, তখনই সমাজকে ভাঙতে সামনে আনা হয় ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়, উপাসনালয় ভাঙা হয়, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হয়। আর রাষ্ট্র, অধিকাংশ সময়েই, হয় নীরব দর্শক—নয়তো পরোক্ষভাবে অপরাধের পক্ষাবলম্বনকারী।
প্রতিটি গণআন্দোলনে দৃশ্যপট প্রায় অপরিবর্তিত। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ রাজপথে নামে। তারাই লাঠিচার্জ সহ্য করে, তারাই টিয়ার গ্যাসে শ্বাস নেয়, তারাই গুলি খায়, তারাই রক্ত দেয়। গণতন্ত্র, অধিকার, সংস্কার কিংবা পরিবর্তনের নামে যত আন্দোলন—সব কিছুর রক্তাক্ত জ্বালানি এই মানুষগুলোই। অথচ আন্দোলন শেষ হলেই ক্ষমতার ভাগ-বণ্টনে তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তারা ফিরে যায় ক্ষুধা, বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার পুরোনো জীবনে।
আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সামনে আসে নতুন শোষকগোষ্ঠী। মুখ বদলায়, দল বদলায়, পতাকা বদলায়, ভাষা বদলায়, স্লোগান বদলায়—কিন্তু শোষণের কাঠামো একচুলও নড়ে না। রাষ্ট্রক্ষমতা পরিণত হয় লুটপাটের বৈধ লাইসেন্সে, আর জনগণের আন্দোলন ব্যবহার করা হয় ক্ষমতালোভীদের সিঁড়ি হিসেবে। একদল ক্ষমতা ছাড়ে, আরেক দল আসে—কিন্তু রাষ্ট্র থেকে জনগণ বরাবরই বাদ পড়ে।
এই রাষ্ট্রে ঘুরে-ফিরে সেই একই ৮ শতাংশ মানুষেরই সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। রাষ্ট্রের বাজেট তাদের জন্য, আইন তাদের জন্য, নীতি তাদের জন্য, উন্নয়ন তাদের জন্য। আর বাকি ৯২ শতাংশ মানুষ কেবল সংখ্যায় পরিণত হয়—ভোটের সময় দরকার, আন্দোলনের সময় দরকার, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাদের কোনো জায়গা নেই। এই বাস্তবতায় ‘জনগণের রাষ্ট্র’ কথাটি নিছক এক নির্মম পরিহাস।
এই বৈষম্য এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়। এটি মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা। একদিকে অঢেল সম্পদ, বেহিসাবি বিলাসিতা, ক্ষমতার দম্ভ ও প্রদর্শন; অন্যদিকে অনাহার, চিকিৎসার অভাব, শিক্ষার সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। সমাজের নিচে নামতে নামতে মানুষ যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে আটকে যাচ্ছে, যেখান থেকে ওপরে ওঠার সব সিঁড়ি পরিকল্পিতভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে। কারণ তারা একদিকে শ্রেণিগত শোষণের শিকার, অন্যদিকে পরিচয়ের কারণে রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার। তাদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নয়; বরং তাদের ভয় ও অনিশ্চয়তা শাসকদের জন্য কার্যকর বিভাজনের অস্ত্র।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই বৈষম্য ও সহিংসতাকে এখন স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে। শোষণকে বলা হচ্ছে উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে বলা হচ্ছে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের ক্ষুধা ঢাকার চেষ্টা চলছে, আর তদন্তহীনতার মাধ্যমে অপরাধ ঢেকে রাখা হচ্ছে। কিন্তু ক্ষুধার পেটে কোনো প্রবৃদ্ধি কাজ করে না, আর নিরাপত্তাহীন জীবনে কোনো উন্নয়ন অর্থহীন।
যে রাষ্ট্র নাগরিকের ন্যূনতম চাহিদা—খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজ ও নিরাপত্তা—নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারায়। আজ প্রশ্ন উঠছে—এই রাষ্ট্র কি তার জন্মের অঙ্গীকার রক্ষা করছে, নাকি শোষণ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কাঠামো কেবল এক হাত থেকে আরেক হাতে হস্তান্তর হচ্ছে? শাসকের নাম বদলালেও যদি শাসনের চরিত্র একই থাকে, তবে তাকে পরিবর্তন বলা প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।
এই দেশে রাজনীতি আর সেবার নাম নয়—এটি রীতিমতো একটি লাভজনক ব্যবসা। ক্ষমতায় যাওয়াকে ধরা হয় বিনিয়োগ, আর ক্ষমতায় থাকার সময়কে দেখা হয় মুনাফা তোলার সুযোগ হিসেবে। ফলে নির্বাচন আর উৎসব নয়, এটি হয়ে উঠেছে লুটপাট ও বিভাজনের প্রতিযোগিতা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনগণের বিরুদ্ধেই নীতি প্রণয়ন—এটাই এই ব্যবস্থার স্বাভাবিক নিয়ম।
এই বাস্তবতায় প্রশ্নটা আর নৈতিকতার নয়, এটি সরাসরি রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন। কারা জনগণের রক্তে পা রেখে ক্ষমতায় ওঠে, কারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে—তার হিসাব কবে হবে? এই হিসাব না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচন, কোনো উন্নয়ন প্রকল্প, কোনো ভবিষ্যতের আশ্বাস বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।
এই লড়াই এখন আর কেবল ক্ষমতা বদলের নয়। এটি শোষণ, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাঠামো ভাঙার লড়াই। কারণ ইতিহাস আমাদের স্পষ্ট করে শিখিয়েছে—শুধু শাসক বদলালে রাষ্ট্র বদলায় না। রাষ্ট্র বদলায় তখনই, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে জনগণ, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হয় মানুষের প্রয়োজন, অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে সামনে রেখে।
এই দায় শুধু রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দায় সারার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিক সমাজ—সবারই দায়িত্ব এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। প্রশ্নটা খুব সরল কিন্তু গভীর—আমরা কি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে উন্নয়ন মানে কয়েকজনের বিলাসিতা আর বাকিদের ভয়, নাকি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে উন্নয়ন মানে সবার সম্মানজনক ও নিরাপদ জীবন?
আজ সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলার—এই দেশ আর প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলি শুনতে চায় না। মানুষ চায় ন্যায়, চায় কাজ, চায় সুযোগ, চায় মর্যাদা এবং নিরাপত্তা। ইতিহাস কাউকে ছাড় দেয় না। যারা আজ শোষণ ও সাম্প্রদায়িকতার সুবিধাভোগী, তাদের একদিন জবাব দিতেই হবে—তারা রাষ্ট্র গড়েছে, নাকি রাষ্ট্রকে লুট ও বিভক্ত করেছে?এই প্রশ্নের উত্তর যদি না বদলায়, তবে ইতিহাস আবারও এক নির্মম সত্য লিখবে—
আমরা কেবল শাসক বদলেছি, রাষ্ট্র বদলাইনি।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।








































