গত ২৩ এপ্রিল ছিল বিশ্ব বই দিবস। মানেই বইকে নতুন করে অনুভব করার দিন, শুধু পড়ার জন্য নয়, বরং নিজের শেকড়, সমাজ ও ইতিহাসকে নতুন চোখে দেখার দিন। এই বিশেষ দিনে হাতে এলো একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ “নবীগঞ্জের ইতিকথা”। এটি শুধু একটি বই নয়, বরং নবীগঞ্জের সময়, মানুষ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত এই গ্রন্থটির লেখক Matiar Chowdhury মতিয়ার চৌধুরী, নবীগঞ্জের একজন কৃতি সন্তান। চার দশকেরও বেশি পুরোনো এই বইটি সম্প্রতি নতুন রূপে, আরও তথ্যসমৃদ্ধভাবে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে যখন ইতিহাসের অনেক গল্প দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এমন একটি গ্রন্থের পুনর্জন্ম যেন অতীতকে আবারও বর্তমানের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। লেখকের সাথে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগাযোগ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আউশকান্দিতে সাংবাদিক মুজিবুর রহমান মুজিব ভাইয়ের হাত থেকে বইটি সংগ্রহ করার অভিজ্ঞতা যেন এই বইয়ের সাথে এক ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি করে দেয়। বইটি হাতে পাওয়ার মুহূর্তটি কেবল একটি সংগ্রহ নয়, বরং একটি ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি।
“নবীগঞ্জের ইতিকথা” শুধু তথ্যের সমষ্টি নয়, এটি একটি অঞ্চলের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। নবীগঞ্জের নামকরণ, জনপদ, ভূগোল, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক পরিবর্তন থেকে শুরু করে বহু অজানা অধ্যায় এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে নবীগঞ্জ একসময় রাজস্ব জেলা ছিল, এই তথ্যটি নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা। সিলেট বিভাগের এই ঐতিহ্যবাহী জনপদ একসময় আসাম প্রদেশের অংশ হিসেবে প্রশাসনিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল।
লেখক মতিয়ার চৌধুরীর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তাঁর শেকড়সন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি। তথ্য প্রযুক্তির সুবিধাহীন এক “এনালগ যুগে” তিনি ছুটে গেছেন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, মানুষের মুখের কথা, পুরোনো নথি, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে সংগ্রহ করে গড়ে তুলেছেন এই গ্রন্থ। এমনকি পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধানে ভারতের গুজরাট পর্যন্ত তাঁর যাত্রা, যা প্রমাণ করে ইতিহাসচর্চা কতটা ধৈর্য, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের বিষয়।
আজকের ডিজিটাল যুগে যেখানে এক ক্লিকে হাজারো তথ্য পাওয়া যায়, সেখানে এমন এক সময় ছিল যখন ইতিহাস ছিল মানুষের স্মৃতির ভেতর বন্দী। সেই বন্দী ইতিহাসকে মুক্ত করার প্রয়াসই এই বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। নবীগঞ্জ অঞ্চলের অনেক তরুণ আজও জানে না তাদের জনপদের গভীর ইতিহাস, কিংবা এখানে থাকা দুটি বড় চা-বাগানের কথা। “নবীগঞ্জের ইতিকথা” সেই অজানাকে জানার একটি দরজা খুলে দেয়। এটি কেবল অতীতকে তুলে ধরে না, বরং বর্তমানকে বুঝতে এবং ভবিষ্যৎকে নির্মাণ করতে সাহায্য করে।
বইটি প্রকাশ করেছে বাসিয়া প্রকাশনী। স্থানীয় বইয়ের দোকান কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম rokomari.com থেকেও এটি সংগ্রহ করা যায়। ইতিহাসচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এমন প্রত্যাশা জাগে স্বাভাবিকভাবেই। শেষ পর্যন্ত, “নবীগঞ্জের ইতিকথা” আমাদের মনে করিয়ে দেয় ইতিহাস শুধু পুরোনো ঘটনার নাম নয়; এটি একটি জাতি ও অঞ্চলের আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। আর সেই আত্মপরিচয়কে জানার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে সচেতন ভবিষ্যৎ। তাই বিশ্ব বই দিবসে তাই এই গ্রন্থ কেবল একটি বই নয়, বরং নবীগঞ্জকে নতুন করে চেনার একটি আহ্বান।
























































