ব্রিটেনের স্থনীয় নির্বাচনে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন দুই ব্রিটিশ বাংলাদেশী। উভয়েই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এরা দুজন হলেন সিলেট বিভাগের ওসমানীনগর উপজেলার বাসিন্দা। প্রথমজন লুৎফুর রহমান তিনি টানা চতুর্থবারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন। অন্যজন নিউহ্যাম কাউন্সিল থেকে ফরহাদ হোসেন। তিনি এই বারায় প্রথম বাংলাদেশী নির্বাহী মেয়র। ব্রিটেনের রাজনীতিতে যখন ডানপন্থি দল রিফর্ম পার্টির উত্থানে শংকিত লেবার কনজারভেটিভ পার্টি, ঠিক এই মূহুর্থে সকল চ্যলেঞ্জ মোকাবেলা করে এই বিজয় বহুজাতিক বিটেনে চমক। এছাড়া এই নির্বাচনে দেশব্যাপী বিভিন্ন কাউন্সিল থেকে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী কাউন্সিলার নির্বাচিত হয়েছেন। এযাবত যে সব বাংলাদেশী কাউন্সিলার নির্বাচিত হয়েছেন তারা হলেন ওল্ডহ্যাম থেকে মহিব উল্লা (আবু তালেব), সদরুজ্জামান খান বার্কিং এন্ড ডাগেনহাম, বার্মিংহ্যাম থেকে রিহান আব্বাস, রেডব্রীজ থেকে সৈয়দা ফেরদৌসী পাশা কলি, সৈয়দা সায়মা আহমদ, অজয়ন্তা দেব রায়, নিউহ্যাম থেকে রহিমা রহমান প্রমুখ।
ইতিহাস ড়লেন লুৎফুর রহমান: টাওয়ার হ্যামলেটসে চতুর্থবারের মতো মেয়র নির্বাচিতঃ
গ্রেটব্রিটেনের পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা টাওয়ার হ্যামলেটেস এর মেয়র পদে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন লুৎফুর রহমান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরাজিত করে আবারও জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক।নির্বাচনে বিজয়ী লুৎফুর রহমান পেয়েছেন ৩৫,৬৭৯ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ১৯,৪৫৪ ভোট। স্থানীয় কাউন্সিলের নির্বাচনে এবার পুরো ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভরাডুবি ঘটিয়ে সবচেয়ে বেশি কাউন্সলর পদ জিতে নিয়েছে ডানপন্থি নতুন দল রিফর্ম ইউকে। প্রধান দুটি দল লেবার পার্টি ও কনজারভেটিভ পার্টি এখন রিফর্ম ইউকের উত্থানে শঙ্কিত। চতুর্থবারের মত মেয়র নির্বাচিত হয়ে বারার বাসিন্দাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন লুৎফুর রহমান।
তিনি বলেন,“আমাকে পুনর্নির্বাচিত করায় টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে ধন্যবাদ। আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় যুগান্তকারী সহায়তা এবং সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন নির্মাণের রূপান্তরমূলক কর্মসূচি অব্যাহত রাখব।আশা ও ঐক্যের রাজনীতিকে ভয় ও বিভেদের রাজনীতির ওপর প্রাধান্য দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। তিনি বলেন, “টাওয়ার হ্যামলেটসে আমরা গর্ব করি যে এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ এলাকাগুলোর একটি। আমরাই দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু করেছি,এবং জাতীয় সরকারের কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত উল্টে দিয়েছি। লুৎফুর রহমান বলেন,“আমরা একসঙ্গে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। আমি আশা করি আজ নির্বাচিত নতুন প্রগতিশীল প্রশাসনগুলো আমাদের পথ অনুসরণ করবে,একই ধরনের রূপান্তরমূলক নীতি গ্রহণ করবে এবং আমাদের কমিউনিটির জন্য বাস্তব পরিবর্তন আনতে একসঙ্গে কাজ করবে।”
লুৎফুর রহমান তার নির্বাচনি ইশতেহারে কিছু নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেন।এর মধ্যে কম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ট্র্যাভেল পাস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে টাওয়ার হ্যামলেটস হবে দেশের প্রথম কাউন্সিল যারা এমন উদ্যোগ নেবে।এর আগে লুৎফুরের প্রশাসন দেশের প্রথম কাউন্সিল হিসেবে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর জন্য সার্বজনীন ফ্রি স্কুল মিল চালু করে।তার প্রস্তাব অনুযায়ী, কাউন্সিল শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন’ এর নেটওয়ার্কে ব্যবহারের উপযোগী ট্র্যাভেল পাসের অর্থায়ন করবে।বর্তমানে লন্ডনে শুধু ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে।নতুন পরিকল্পনার আওতায় টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় নির্ধারিত আয়সীমার নিচে থাকা পরিবারের সব শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে।
টাওয়ার হ্যামলেটস ভিত্তিক স্থানীয়দল অ্যাসপায়ার পার্টির এই প্রার্থী হিসেবে লুৎফুর রহমান ৩৫,৬৭৯ ভোট পেয়ে চতৃর্থ মেয়াদে নির্বহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২,১৯,০৩০ এবং ভোটদানের হার ছিল ৪২.১ শতাংশ। টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাচনের ভোট গণনা গত ৮ই মে, শুক্রবার, এক্সেল লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়।
সম্পূর্ণ ফলাফল
- জামি আলী, টাওয়ার হ্যামলেটস ইন্ডিপেন্ডেন্টস (৩,১৫৬)
- জন জেরাল্ড বুলার্ড, রিফর্ম ইউকে (৭,১৫৩)
- মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস (২,৪২১)
- সিরাজুল ইসলাম, লেবার পার্টি (১৯,৪৫৪)
- হিরা খান আদিওগুন, গ্রিন পার্টি (১৯,২২৩)
- টেরেন্স ম্যাকগ্রেনেরা, স্বতন্ত্র (৫২৪)
- ডমিনিক এইডান নোলান, কনজারভেটিভ (৩,৮১৮)
- হুগো পিয়ের, ট্রেড ইউনিয়নিস্ট অ্যান্ড সোশ্যালিস্ট কোয়ালিশন (৬৩৮)
- লুৎফুর রহমান, অ্যাসপায়ার (৩৫,৬৭৯)
ভোট গণনা শেষে টাওয়ার হ্যামলেটসের রিটার্নিং অফিসার স্টিফেন হ্যালসি বলেছেনঃ“একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পরিচালনার আরও একটি চমৎকার উদাহরণ স্থাপনের জন্য আমি নির্বাচনে কর্মরত প্রত্যেককে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাতে চাই।“ দেশের যেকোনো স্থানের তুলনায় টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাচন প্রক্রিয়া অন্যতম সেরা। আমাদের ভোটকেন্দ্রে এবং ভোট গণনায় কর্মরত ৮০০ জন কর্মী থেকে শুরু করে টাওয়ার হ্যামলেটস পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনের মতো আমাদের অংশীদাররা পর্যন্ত, আমরা সবাই টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে সহায়তা করার জন্য একত্রিত হয়েছিলাম। “কাউন্সিলের ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের ভোট গণনার মাধ্যমে আগামীকালও এই কাজ চলবে।”
আজ এক্সিকিউটিভ মেয়রের গণনার পর, আগামীকাল এক্সেল লন্ডনে ২০টি বরো ওয়ার্ডের প্রতিনিধিত্বকারী ৪৫ জন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলরের জন্য আরও একটি গণনা অনুষ্ঠিত হবে। গণনাটি ৯ই মে, শনিবার সকাল ৮:৩০ থেকে শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং প্রতিটি ওয়ার্ডের ফলাফল কাউন্সিলের ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলগুলিতে প্রকাশ করা হবে। পোস্ট করা হয়েছে শুক্রবার, ৮ই মে ২০২৬।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষনে দেখা যায় লুৎফুর রহমান অ্যাসপায়ার পার্টির এই প্রার্থী ৩৫,৬৭৯ ভোট পেয়েছেন। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২,১৯,০৩০ এবং বারায় ভোটদানের হার ছিল ৪২.১%।
প্রথম বাংলাদেশি মেয়র হিসেবে লন্ডনের দ্বিতীয় বাঙ্গালী অধ্যুসিত নিউহ্যামে ইতিহাস গড়লেন ফরহাদ হোসেন
ব্রিটেনজুড়ে লেবার পার্টির ভরাডুবির মধ্যেও ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন ফরহাদ হোসেন। লন্ডনের নিউহ্যাম বারার ইতিহাসে মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে লেবার পার্টির মনোনয়নে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।সিলেটি শিকড় থেকে উঠে আসা ফরহাদ নিউহ্যামের বাসিন্দাদের বিপুল জনসমর্থন পেয়েছেন।
নির্বাচনে ২৫ হাজার ৫৩৮ ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন ফরহাদ হোসেন। তিনি সদ্য বিদায়ী পাকিস্তানী বংশদ্ভোত মেয়র রোকসানা ফিয়াজের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। রোকসানা টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় গ্রিন পার্টি ও রিফর্ম ইউকের চাপে লেবার পার্টি যখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি, তখন ফরহাদের এই জয় পূর্ব লন্ডনে দলটির অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নবনির্বাচিত মেয়র ফরহাদ হোসেন নিউহ্যামের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্লাস্টো নর্থের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি অপরাধ দমন, অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ এবং বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পোর্টফোলিওগুলোর প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন।
বিজয়ী ঘোষণার পরপরই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ফরহাদ হোসেন এই মুহূর্তের গুরুত্ব তুলে ধরেন।তিনি বলেন, এটি এই বারার জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। নিউহ্যাম আমাকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে,আর সেই বারার মেয়র নির্বাচিত হওয়া আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্মান। গণতন্ত্র তখনই সার্থক হয় যখন সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসে সেবা করার সুযোগ পায়।মূলধারার রাজনীতিতে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নেতার এই উত্থান ব্রিটিশ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এক বড় মাইলফলক। আগামী মঙ্গলবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ফরহাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী ক্যাবিনেট গঠন করা, যা বারার তীব্র আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো জরুরি সমস্যাগুলো মোকাবিলা করবে।



























































