কথা হচ্ছিল বন্ধু সোমের সাথে আলতাফদের দাওয়ায় বসে, সেখানে আরও কয়েকজন বন্ধু ও বান্ধবী ছিল । আমরা এক একজন নানা বিষয়ের উপর কথার ফুলঝুড়ি ছিটিয়ে চলছিলাম। তবে এ কথা ঠিক কোন কথায়ই বেশীক্ষণ স্থায়ী হচ্ছিল না । টুক-টাক কথার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। অবশ্য আমাদের আড্ডার ফাকে একবার গরম গরম ধোয়া উঠা চায়ের স্বাদ নিয়েছি, এদিকে আমরা ছাদে এসে স্থান নিয়েছি।
অবশেষে কল্পনা বলে বসলো, আচ্ছা বলো তো দেখি, তিন অক্ষরে নাম যার সর্বলোকে খায়, মাঝের অক্ষর উড়ে গেলে আকাশেতে রয়? এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে আমাদের গলদঘর্ম হতে হলো কিন্ত উত্তরটা বেশ সোজাই ছিল। এ ভাবেই এগিয়ে চলছিল আড্ডাটা। আমাদের ভিতর থেকে কেউ না কেউ ধাঁধার অবতারনা করলো, উত্তর কেউ পারলো কেউ ব্যার্থ হলো। তারপরও জোৎস্নায় বেশ লাগছিল, আর গায়ে বুলিয়ে যাচ্ছিল মন মাতানো ঝিরি ঝিরি মৃদু মন্দ বাতাসের পরশ।
মাঝে আলতাফের ছোট ভাই এসে জানিয়ে গেলো টিভিতে এখন “পারসুয়েডার” দেখাবে, দেখলে এখনি চলে আসো। টিভির এই গোয়েন্দা সিরিজটি দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই সিরিজে অভিনয় করেছে ব্রিটিশ অভিনেতা রজার মুর আর ইতালীর টনি কার্টিস। বইটিতে বেশ মজার মজার গোয়েন্দা কাহিনী রয়েছে, যারা একবার টিভির সামনে বসেছে তারা এই সিরিজটি না দেখে কেউ উঠতে চাইবে না এতে কোন সন্দেহ নাই।
তখন আমাদের ধাঁধার পর্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কেউ আর আড্ডা বাদ দিয়ে “পারসুয়েডারস” দেখতে রওয়ানা দিলো না, যদিও এর কারণ ছিল তা হলো সে সময় জনপ্রিয় ছবিগুলি রবিবার দুপুরে আবার পুনঃ প্রচার হতো অতএব ছবিটি তখন দেখবে বলে আজ আর আড্ডা থেকে কেউ উঠে গেল না।
তোমাদের মনে আছে কি না আমার জানা নাই তবে ঢাকা টেলিভশন কেন্দ্র শুরু হতো সন্ধ্যা ৬ টায় আর শেষ হতো রাত ৯ টায় এই ৩ ঘন্টা প্রচারিত হতো আর প্রতি রবিবারে দুপুর ৩ টায় আরম্ভ হতো আর ৫ টায় প্রচার শেষে ২ ঘন্টা চলার পর বন্ধ হতো। মনে আছে সে সময় চার্লি চ্যাপলিন এর নির্বাক হাসির ছবিগুলি খুব আমুদ দিতো আমাদের, আর চলতো একটা বিজ্ঞান ভিত্তিক বই “এ ফর এ্যান্ডোমেডা” আর আগেই বলেছি সন্ধ্যার জনপ্রিয় সিরিজ এর একটা সিরিজ দেখাতো। বেশ কিছুদিন পরে দুপুর বেলায় বাংলা ছায়াছবি দেখানো শুরু হলো। এদিকে টিভির দর্শক সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কর্তিপক্ষ মর্নিং শো (সকালের অধিবেশন) দেখানোর সিদ্বান্ত নেয়। সকাল ৯ টা থেকে ১২ পর্যন্ত।
যাহোক আমাদের আড্ডা যেমন চলছিল তেমনই অব্যাহত রইলো, বেশীক্ষণ আর স্থায়ী হলো না কারন হঠাৎ ঝড়ো বাতাশ শুরু হলো, আমরা ছাদে বসে কেউ এই রিস্ক নিতে চাইলাম না, শেষে আড্ডাবাজদের ঠাঁই হলো বৈঠক খানার টিভি রুমে। ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলে আমরা যার যার গন্তব্যে চলে এলাম।
বেশ রাতে ক্রিং ক্রিং শব্দে ফোনটা বেজে উঠলো, বেশ বিরক্ত সহকারে ফোনটি উঠাতে হলো, একবার ভাবলাম এত রাতে ফোনটি ধরবো না আবার ভাবলাম ফোনটি ধরা উচিৎ কারণ যে ফোন করেছে তার হয়তো কোন গুরুতর কারণ থাকতে পারে, শেষ পর্যন্ত সব দ্বিধা-দন্ধ ঝেড়ে ফেলে ফোনের রিসিভারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। রিসিভারটা কানে লাগাতেই ওপাস থেকে মেয়েলী কন্ঠ ভেসে এলো। তিনি কোন রকম কোন ভনিতা না করে জানতে চাইলেন, আচ্ছা বলুনতো মানুষেরা কোন তিনটি জিনিষ কখনই ভোলে না? বুঝতে অসুবিধা হলো না ফোন যিনি করেছেন তিনি আজ আমাদের আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন, মনে পড়লো এক কোনায় তিনি লাজবতী নুপুর হয়ে বসে ছিলেন গালে হাত দিয়ে, তিনি কোন কথাই বলেননি শুধু আড্ডায় অংশ নিয়ে ছিলেন, মনে হয় এখন তার কোন কথা মনে পড়েছে সেটা বলে হালকা হতে চাইছেন কিন্ত মজার ব্যাপার হলো ফোন করে কোন রকম হাই হ্যালো অথবা কে বলছেন কাকে চাইছেন এরাকম কোন কথা না বলে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে মারলেন, আমি অবাক না হয়ে উনার কথা মনোযোগ সহকারে শুনলাম এবং বল্লাম, আপনি কি আগামী রবিবার আলতাফদের বাসায় আমাদের জ্বম্পেস আড্ডায় আসবেন? তিনি হ্যা সূচক জবাব দিলে আমি অতন্ত্য বিনয়ের সঙে জানালাম, তাহলে সেদিনই না হয় দেখা হবে এবং উত্তরটার ও একটা সুরাহ হবে।
তিনদিন পর যথারীতি আবার পড়ন্ত বিকালে নিভান্ত রোদে আমাদের নির্ধারিত স্থান আলতাফদের বাসার ছাদে সমবেত হলাম। এই কথা সেই কথার পর আমি রাতের প্রশ্ন কর্তাকে বল্লাম, আপনার জানি কি প্রশ্ন ছিল? আমেনা লজ্জা পেলেও হাসি হাসি মুখ নিয়ে বল্লো, আচ্ছা কেউ কি বলতে পারবেন, “মানুষ একবার যদি শেখে তাহলে সে কোনও দিন সেটা ভুলতে পারে না,” কি জিনিষ সেটা, আড্ডায় একটা গুঞ্জন উঠলো এবং এক একজনের উত্তর ভিন্ন হলো অবশেষে আমাকেই হাল ধরতে হলো। তখন সবাই আমার মুখের দিকে হা হয়ে দেখছে যে আমি কি উত্তর দেবো। কিছুক্ষণ নীরবতা ভঙ্গ করে উত্তরটা দিলাম
১) সাঁতার শেখা।
২) সাইকেল চালানো ।
আর ৩ নাম্বারটা এবার তোমরাই বলো? বলা বাহুল্য যে যা উত্তরে জানালো তা সবই ছিল ভুল জবাব। শেষে আমি যোগ করলাম, এটা হবে “গাছে উঠা”।
উপস্থিত আড্ডাবাজরা সমস্বরে ঠিক ঠিক বলে আমাকে সমর্থন জানালো। মনে মনে ভাবলাম যা বল্লাম তাকি আশলেই ঠিক। কি জানি হলেও হতে পারে।
আজ আমাদের কারো কারো তাড়া থাকায় উঠতে হলো। এত জলদি আড্ডা শেষ হওয়াতে অনামী খালাম্মা ভাঙা হাটে এসে জানালো কি ব্যাপার আজ যে দেখছি তোমাদের অন্য জায়গায় কাজ আছে?
কিন্ত তোমাদের জন্য তো আমি ঝালমুডি আর ডালপুরি রেডি করেছি। খালাম্মার কথা শেষ হতে না হতেই নারায়ন ট্রেতে করে খাবার নিয়ে এলো। সেই মজার খাবার থেকে কেউ বাদ জায়নি, যারা চলে যাবার জন্য উঠে দরজার কাছে গিয়েছিল তাঁরাও আমাদের সাথে শরিক হলো ।
বাসায় এসে রোকেয়ার ধাঁধার কথাটি ভাবার চেষ্টা করলাম, কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কি এমন ৩ অক্ষরের শব্দ যার পেট কাটলে খাতাঁয় লেখা যায়। অবশেষে আইজেক নিউটনের মতো চিৎকার দিয়ে উঠলাম পেয়েছি পেয়েছি। শব্দটি ছিল “নীরব” এর মাঝের অক্ষর বাদ গেলে থাকে “নীব” মনে মনে ভাবলাম এত সহজ ধাঁধার উত্তর বোঝার জন্য আমাকে এত ভাবতে হলো? ভাগ্যিস তখন আমি চুপচাপ ছিলাম না হলে তো আমার জারিজুরি ফাঁস হয়ে যেতো আর সবজান্তার খেতাবটি চিলের মত উড়ে যেতো।
একদিন আমরা মাঠে ক্রিকেট খেলছিলাম, বেশ ভালই চলছিল আমাদের খেলা। আমরা ফিল্ডিং করছিলাম। আমাদের প্রতিপক্ষ ভালই খেলছিল, স্কোর বোর্ডে দেখা যাচ্ছিল ৫ উইকেটে ২৭৯ রান। ওদের একজন ব্যাটসম্যান খুব ভাল খেলছিল বোঝা যাচ্ছিল তিনি আজ সেঞ্চুরী হাকাবেন। জসিমের বলে ফারুক একটি মহা ছক্কা হাকালো ফলে মাঠের বল বাইরে চলে যাওয়ায় বলটি আর খুঁজেই পাওয়া গেলো না, শেষে আম্পায়ার খেলা বন্ধ করতে বাঁধ্য হলো। তখন কি আর করা দুই টিমের অধিনায়করা ঠিক করলো কোন দলের কার কতো জ্ঞান আছে তার পরীক্ষার খেলা।
আর্মানিটোলার খেলোয়াডরা প্রথম প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলো। তাদের প্রশ্ন ছিলোঃ- প্রথম ক্রিকেট টেস্ট খেলা কোন দেশ কোন দেশ খেলেছিল? আমাদের উত্তর ছিলো, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যন ব্রাডম্যানের রানের গড়পরতা কত ছিল যখন তিনি টেস্ট খেলা থেকে অবসারে যান?
এবার জবাব দেওয়ার পালা ওদেরঃ– অনেক চিন্তা-ভাবনা করে জবাব পাওয়া গেলো – ৮০.৯৫। আমরা সবাই সমস্বরে আওয়াজ তুলে বল্লাম উত্তর হলো না, আমাদের আওয়াজে মনে হচ্ছিল এল বি ডাবলুর আবেদন জানাচ্ছি তারপর পরই উত্তরে জানালাম তিনি ৯৯.৯৬ রান করে খেলা শেষ করেছিলেন।
আর এই ভাবে আমাদের জ্ঞানের বহর এগিয়ে যাচ্ছিল কিন্ত এক দর্শক হারিয়ে যাওয়া বলটি খুঁজে পেলো সুতারাং অসমাপ্ত খেলা আবার শুরু হলো। ঐ খেলায় আমাদের দল ২৩ রানে হেরে গিয়ে ছিলো।
অনেকদিন পর আবার আলতাফদের বাসায় গল্প আর কাহিনীর আশর বসা শুরু হলো। এই আশরে ২/১ টি নতুন মুখ দেখা মিললো। তাদের কথায় বোঝা গেলো তারা বেশ টনটনে বুদ্ধি রাখে। বৃষ্টিমুখর এক সন্ধ্যায় ঝাল মুড়ি খেতে খেতে কথা চলছিলো টিমেতালে। নাসির জানতে চাইলো, চাঁদে তো মানুষের পায়ের ছাপ পড়েছে কিন্ত কত জন সেখানে ছিল? তাদের নাম কি ছিল আর তা কবে এই ঐতিহাসিক দিনটি ছিলোঃ— প্রশ্ন শুনে কায়সার জবাবে জানালো, ১৯৬৯ সালের ২১ জুন। ৩ জন এ্যাস্টোনট ছিল। যানটি ছিল (রকেট) এ্যাপেলা-১১। যারা চাঁদে গিয়েছিল তারা হলো- নীল আর্মাস্ট্রং, এডউইন অলড্রিন আর মাইকেল কলিন্স। কবিরের জিজ্ঞাসা ছিলঃ- রকেটে কোন প্রানী পৃথিবীর চারিদিক ঘুরে জীবিত ফিরে এসেছিল?
এবার আমি উৎফুল্ল হয়ে এর উত্তরটা দিলাম। রাশিয়ার রকেট সুইজ-১১, প্রানীটি ছিল একটি কুকুর ছানা যার নাম ছিল লাইকা।
এ ভাবেই আমাদের আড্ডা জমে উঠছিল প্রতিদিন। খাল্লাম্মা মনে মনে খুব খুশী হতেন কারণ তার নিজের ২ ছেলে ও সেই সাথে তাদের বন্ধুরা অন্য কোথাও না গিয়ে ঘরেই আড্ডা যে দিতো, আর ভুলে যাওয়া অনেক না জানা কথা জানতে পারতো ধাঁধা ও প্রশ্ন উত্তর পর্বে।









































