প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনে নাটকীয় ঘটনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আকস্মিক রাজনৈতিক পতনের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা-পরবর্তী সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর সারা দেশে যে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, তা নিছক রাজনৈতিক বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়—বরং এটি গভীরভাবে পরিকল্পিত, কৌশলগতভাবে পরিচালিত এবং ভয়ঙ্করভাবে সংগঠিত এক শক্তিশালী প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি জাতির পরিচয় মুছে ফেলে তা ভিন্নভাবে নির্মাণ করা। এই প্রক্রিয়ায় আজ ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সাধারণ মানুষের জীবনধারা—সবকিছুই একের পর এক ধ্বংস ও হুমকির মুখোমুখি।
এই জাতীয় বিপর্যয়ের মধ্যে লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন বাংলাদেশ বিভিন্ন সংগঠন, সরকারি-বেসারকারি প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক মিশনের মতো একটি পালাবদলের ক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে আনুগত্য ও ব্যক্তিগত অবস্থান পরিবর্তনের এক প্রবল ঢেউ বইতে দেখা যায়।
এই রূপান্তরের অন্যতম প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন হাই কমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম—যিনি তার প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বাকচাতুর্যের জন্য প্রশংসিত ছিলেন। তিনি হাই কমিশনে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলেছিলেন যেখানে সবাই একে অপরের সহযোগি হিসেবেই কাজ করেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে পেশাদার, দক্ষ এবং যথেষ্ট সহযোগিতামূলক কূটনীতিক হিসেবে পেয়েছি। তবু কূটনীতিক মহলের ভেতরে ও বাইরে তাসনিম বরাবরই বিতর্কিত ছিলেন—তার দীর্ঘদিনের উত্থানপর্বে যেমন প্রশংসা ছিলো, তেমনি তা সমালোচিতও হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর তা আরও স্পষ্ট ও প্রবল হয়ে ওঠে।
একটি কৌশলগত পদক্ষেপ
ঢাকা পতনের এক দিন পরই হাই কমিশনে এক টি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। হাই কমিশনার ইচ্ছায় বা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে, যে কারণেই হোক, স্পষ্টতই একটি হিসেবি পদক্ষেপ নেন। ৬ আগস্ট সকালে আমি হাই কমিশনারের কাছ থেকে একটি ফোন কল পাই। তিনি জানান যে, শামসুল আলম লিটনের নেতৃত্বে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি প্রতিনিধি হাই কমিশনে আসছে। লিটন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি ইজাজউদ্দীন আহমেদের ডেপুটি প্রেস সচিব ছিলেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে এসে সুরমা পত্রিকায় যোগ দেন।
২০২৪, যখন বাংলাদেশ ধ্বংস হলো (অধ্যায় এক- পর্ব ৫)
আমি হাই কমিশনারের অফিসে পৌঁছলে তিনি ইমেইলে লিটনের পাঠানো এক খসড়া বিবৃতি দেখিয়ে বলেন, এটি তাকে সভায় পড়ে শোনাতে বলা হয়েছে। হাই কমিশনার এ নিয়ে স্পষ্টত অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, কেন তিনি এমন একটি বিবৃতি পড়বেন!
আমি জানি না শেষ পর্যন্ত তিনি তা পড়েছিলেন কি-না। কারণ লিটন সভার শুরুর আগেই আমাকে, মিনিস্টার কন্সুলার এবং ডিফেন্স অ্যাডভাইজারকে সভা থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। তার যুক্তি ছিল, আমরা শেখ হাসিনার দ্বারা রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত। এটা ঠিক যে আমি রাজনৈতিকভাবে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু অন্য দুজন ছিলেন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা। সামরিক বাহিনী থেকে আসা- যে বাহিনী শেখ হাসিনার পতন ও একটি আধা-সামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা রেখেছিল। তবু আমাদের তিনজনকেই সভাস্থল ছাড়তে হয়। বিস্ময়কর ছিল হাই কমিশনারের নীরব সম্মতি। তিনি আমাদের সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো আপত্তি জানাননি—যদিও এটি ছিল তার নিজস্ব কূটনৈতিক এলাকা। কারণ এটি ছিল তার সমঝোতার প্রচেষ্টা যা পরবর্তীতে আরো অনেক ক্ষেত্রেই আরো স্পষ্ট হয়েছে।
পরদিন এই সভার বিষয় বাংলাদেশের প্রায় সব প্রধান সংবাদমাধ্যমে অন্যতম শিরোনাম হয়। তাসনিমের আচরণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে কূটনৈতিক মহলে এবং সাধারণের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে। সংবাদে তার নামে প্রকাশিত বিবৃতিটি লিটনের খসড়ার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন, ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সংহতি এবং সহিংসতায় নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানান। ঢাকার কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার আগেই এই বিবৃতি দেওয়া হয়—যা অন্য কোনো বাংলাদেশি কূটনীতিক করেননি। কিছু ছাত্র আন্দোলন কর্মী এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবে সমালোচকরা এটিকে সুবিধাবাদী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখেন। প্রশ্ন ওঠে—তিনি কী কেবল নিজের অবস্থান রক্ষা করতেই নিজের ভূমিকা নতুন করে তুলে ধরতে চাচ্ছেন?
এরপরও ১৪ আগস্ট হাই কমিশনের সামনে প্রবাসি বাংলাদেশিদের অনেকে হাই কমিশনারসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের জন্য কারা কাজ করেছে তাদের সবার প্রত্যাহার ও বিচার দাবি করে বিক্ষোভ প্রকাশ করে।পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলি পার্কেও অনুরূপ সমাবেশ ও বিক্ষোভ হয়।
হাই কমিশনে ইতিহাস মুছে ফেলার প্রচেষ্টা
সেদিন সকালেই হাই কমিশনে আরও কিছু ঘটনা ঘটে, যা একটি পরিকল্পিত ‘ক্লিয়ারআউট’-এর অংশ মনে হয়— যাতে আগের সরকারের সব চিহ্ন মুছে ফেলা হয়। কখন এই কাজ শুরু হয়, তা আমি জানি না, তবে সভার সময় তা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

রিসেপশন এরিয়া থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি পূর্ণ তৈলচিত্র এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক তুলে ধরা ব্যানার ও রোল-আপগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। সিঁড়ির ধারে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সব ছবি উধাও।
দুতলায় “বঙ্গবন্ধু লাইব্রেরি”র সাইন এবং বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর লেখা সব বই, ম্যাগাজিন, ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। এমনকি ইউনেস্কো’র ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি ‘৭ মার্চ ভাষণ’-এর একটি বড় তৈলচিত্রও তুলে ফেলা হয়। হাই কমিশনারের নিজের অফিস থেকেও বঙ্গবন্ধুর ছবি ও তার ওপর লেখা বই গায়েব হয়ে যায়।

বাইরের মূল প্রবেশপথে “Blue Plaque”—যেটি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঐ ভবনের ঐতিহাসিক সংযোগের বিশেষ স্বীকৃতি তাও তুলে ফেলা হয়। এই “Blue Plaque”টি ইংলিশ হেরিটেজ কর্তৃক প্রদত্ত একটি ফলক, যা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোতে স্থাপন করা হয়। এটি বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে কেনা ভবনে স্থাপিত হয়েছিল—এটি তাসনিমের উদ্যোগেই সম্ভব হয়েছিল। পাশে নতুন ভবনের “বঙ্গবন্ধু লাউঞ্জ”-এর সাইনবোর্ডটিও আর ছিল না।
যে হাই কমিশন এতদিন শুধু বঙ্গবন্ধু বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়, বাংলাদেশের, বাঙ্গালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের প্রতিফলনে পরিপূর্ণ ছিল, তা নিমিশে একেবারে শুন্য হয়ে যায়।

প্রতিক্রিয়া
এই “ক্লিয়ারআউট” প্রচেষ্টা দ্রুত সমালোচনার মুখে পড়ে। ব্রিটিশ বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রশ্ন ওঠে—হাই কমিশনার তাসনিম কি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন? কারণ সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরানোর কোনো নির্দেশনা তখনো আসেনি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪ক ধারা বলছে:
“জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতির কার্যালয়সহ সকল সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ পাবলিক কর্তৃপক্ষ, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশের বিদেশস্থ দূতাবাস ও মিশনে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে।”
তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বঙ্গভবন এবং রাষ্ট্রপতির ভবন থেকেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। তবে কোনো বিদেশস্থ দূতাবাস এত ব্যাপক পরিবর্তন আনেনি। লন্ডনের হাই কমিশনই ছিলো একমাত্র ব্যতিক্রম।
হাই কমিশনারের ব্যাখ্যা ছিল তিনি সবকিছু সরিয়েছেন সেগুলো রক্ষার জন্য। কারণ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যে বিএনপি-সমর্থিত কিছু লোক হাই কমিশনে হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ভাঙচুর করেছিল।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এবার কেন তিনি ব্রিটিশ কূটনৈতিক পুলিশের সহায়তা চাননি, যখন অন্য অনেক দূতাবাস তা করেছে? পরিবর্তে তিনি ইতিহাস, সংস্কৃতি, উত্তরাধিকার, এবং বাংলাদেশের অগ্রগতির বহু গুরুত্বপূর্ণ দলিল, ছবি ও প্রকাশনা সরিয়ে ফেলেন। প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অজানা, তবে এর ফলাফল গভীর।
নিরপেক্ষতার অবক্ষয়
যখন একটি কূটনৈতিক মিশনের প্রধান এমন কোনো পদক্ষেপ নেন যা প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্বমূলক বা সংবিধানগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়—যেমন, নির্দিষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই সংবিধানসম্মতভাবে প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকা একটি প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা—তখন এটি পররাষ্ট্রসেবার নিরপেক্ষ ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে হুমকির মুখে ফেলে। এ ধরনের কাজ অভ্যন্তরীণ ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে, পেশাদার কূটনীতিকদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে, এবং সেইসব রাষ্ট্রের সঙ্গে আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে, যারা রাজনৈতিক পালাবদলের পরও ধারাবাহিকতা ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি অনুগত থাকার প্রত্যাশা করে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার অপ্রত্যাশিত পতনের পর লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের ঘটনাপ্রবাহ এই জটিল বাস্তবতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। হাই কমিশনার পদক্ষেপ—সেগুলো সুরক্ষার উদ্দেশ্যে হোক বা রাজনৈতিক, কিংবা উভয়ই—এই ভারসাম্য রক্ষার চাপকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তবে ঘটনাগুলো আরও গভীর একটি প্রশ্নও উত্থাপন করে: এমন এক অস্থিরতার মুহূর্তে একজন কূটনীতিকের কী রক্ষা করা উচিত— সেই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা, যাকে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন, নাকি শুধুই নিজের অবস্থান?
ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদঃ –মতিয়ার চৌধুরী।
(আশেকুন নবী চৌধুরী একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কূটনীতিক ও লেখক)









































