
জিপিএ—৫ এই শব্দটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি যেন একটি সোনার হরিণ, যা পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা হন্যে হয়ে ছুটছে। জিপিএ-৫—শিক্ষার্থীদের জন্য এক মহাসফলতা, যা প্রায় সকলের কাছে একটি অপ্রত্যাহার্য আর্কষণ। সত্যি বলতে কি, জিপিএ-৫ একটি শিক্ষার্থীর বহুকাঙ্ক্ষিত সাফল্যের প্রতীক।
শিক্ষা শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখলে জীবনের আনন্দ, শিক্ষার আনন্দ উপভোগ থেকে বঞ্চিত করে,ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক দায়দ্ধতাকে অস্বীকার করে কখনোই নিজেকে ভালেঅ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কেমন জিপিএ-৫ চাই? সেই জিপিএ-৫ যেখানে প্রকৃত শিক্ষা নেই, জ্ঞান নেই, প্রজ্ঞার কোনো আলোকচ্ছটা নেই— আছে শুধু অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তি স্বার্থের সর্বোচ্চ চর্চাকেন্দ্র। এমন জিপিএ-৫ কি আমাদের জীবনে আশীর্বাদ বয়ে আনতে পারে? উচ্চ ফলাফল গুণগত শিক্ষার বিকল্প নয়, বরং তার বিকৃতি।
আমরা অলস নই—অলস করে রাখা হয়েছে
বস্তুত, প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থী “মানসিক অসুস্থতা” এর আতঙ্কে ভুগে। অভিভাবকদের চাপ অনেক সময় শিক্ষার্থীকে “দুর্বল” অথবা “অযোগ্য” মনে করে দেয়। শুধু GPA-৫ দিয়ে শিক্ষার্থীর প্রকৃত সামর্থ্যের বিচার অসম্পূর্ণ। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষা-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বাস্তব জীবনের দক্ষতা উপেক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরির যোগ্যতার পরীক্ষায় মেধা সংকট স্পষ্ট।কল্পনা শক্তি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে ওঠার আগেই তারা পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত।
আজ আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে ফলাফলের অন্ধ প্রতিযোগিতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে বিসর্জন দিচ্ছে। শিক্ষার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হলেও সংখ্যার হিসেবে সাফল্য আকাশছোঁয়া। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল কিংবা চাকরির বাজারে যোগ্যতার পরীক্ষায় এর প্রতিফলন স্পষ্ট। পরিমাণগত সাফল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু গুণগত শিক্ষা দিন দিন তলানিতে ঠেকছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের মতো শিক্ষার মানও ক্রমেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। অথচ, গুণগত ও পরিমাণগত শিক্ষার সমন্বয় না হলে শিক্ষা কার্যকর হওয়ার বদলে হয়ে ওঠে কেবলমাত্র কাগুজে অর্জন।
শিক্ষার বর্তমান চিত্র ভয়াবহ। ক্লাসরুম এখন প্রায় উপেক্ষিত, আর শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়ছে কোচিং ও প্রাইভেট নির্ভর। শিক্ষকরা আগের মতো শ্রেণিকক্ষে আন্তরিক নন; বরং তাদের আগ্রহ বাড়ছে কোচিং ব্যবসায়। অন্যদিকে, অভিভাবকরা জিপিএ-৫-এর মোহে অন্ধ হয়ে সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা হয়ে পড়ছে মানসিক চাপে জর্জরিত, শারীরিক সক্ষমতাও কমছে। শৈশবের আনন্দ আজ হারিয়ে গেছে ফলাফলের ভয়ানক প্রতিযোগিতার চাপে।
বুর্জোয়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাদের শাসন ও শোষণকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষাকে মুনাফার হাতিয়ার বানিয়ে রেখেছে। তাই তখন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আজ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের দায়বদ্ধতার অভাব, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার সংকট, অতিরিক্ত কোচিং সংস্কৃতি ও ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণে শিক্ষার্থীরা জিপিএ—৫ পাওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ না হয়ে চরম আত্মকেন্দ্রিক মানুষ হয়ে গড়ে উঠছে।
অন্যদিকে আমরা যদি ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে দেখি পরীক্ষার চাপ নেই, প্রাথমিক স্তরে কোনো স্ট্যান্ডার্ডাইজড এক্সাম নেই। প্রজেক্ট-ভিত্তিক শেখানো, শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা উন্নয়নে জোর। শিক্ষককে দেওয়া হয় পূর্ণ স্বাধীনতা ও উচ্চ সামাজিক মর্যাদা।হোমওয়ার্ক কম, পড়াশোনা আনন্দদায়ক ও জীবনমুখী। (তথ্যসূত্র: OECD Education Reports) জাপানের শিক্ষা পদ্ধতিতেও দেখা যায়, শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তি নির্ভর মানসম্পন্ন শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা শিক্ষার অংশ। শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে সমস্যার সমাধান শেখানো হয়। আধুনিক টুলস ব্যবহার করে প্র্যাকটিক্যাল লার্নিং। বিশ্বব্যাপী STEM (Science, Technology, Engineering, Math) সেক্টরে জাপানিরা এগিয়ে।
এই অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর ব্যবস্থা। পরীক্ষার হলে অনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করতে হবে, খাতা মূল্যায়নে নমনীয়তার নামে অবিচার রোধ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অভিভাবকদের বোঝা উচিত, সন্তানকে সহজ উপায়ে ভালো ফল করানো সাময়িক সুখ দিতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ভয়াবহ। সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে অনৈতিক পন্থায় ফলাফল অর্জনের বিরুদ্ধে। আমরা চাই জিপিএ-৫, কিন্তু তা হোক প্রকৃত শিক্ষার ফল।
এমন জিপিএ-৫ চাই না যা জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। বরং চাই এমন সাফল্য যা আমাদের দক্ষ, নৈতিক এবং মানবিক করে তুলবে। কারণ, শুধু ভালো ফল দিয়ে নয়, ভালো মানুষ হয়েই জীবনের জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব। মনে রাখতে হবে, নৈতিকতার সঙ্গে কম জিপিএ নিয়েও সফল হওয়া অনেক বড় অর্জন, অনৈতিকভাবে পাওয়া জিপিএ-৫ থেকে।
আমরা জিপিএ-৫ চাই, তবে তা হোক শেখা, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে। কারণ শুধুমাত্র ফলাফলের পরিমাপ নয় বরং শিক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়ে ওঠা শিক্ষার সার্থকতা। আমাদের প্রজন্মের লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল ভালো ফল নয়, বরং নৈতিকতা, আদর্শ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সৎ ইচ্ছাশক্তিকে জীবনমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করা। আমরা ভালো মানুষ হতে চাই দেশপ্রেমিক নাগরিক হতে চাই,—দক্ষ নেতা হতে চাই, যেন দেশকে এগিয়ে নিতে পারি সঠিক পথে। আমাদের দেশ আমাদেরই, তাই দেশ গড়ার দায়িত্বও আমাদের। আজকের দিনে এই প্রত্যাশাই হোক সবার শপথ—আমরা সবাই পরের তরে।
নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা (প্রজেক্ট, হ্যান্ডস-অন লার্নিং) শিক্ষকদের জবাবদিহি ও পেশাগত উন্নয়ন অভিভাবকের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। অনৈতিক সহযোগিতা ও ভুল অনুকূলায়ন বন্ধ করতে কঠোরভাবে প্রয়াস চালানো জরুরি। পরীক্ষা ব্যবস্থারও সংস্কার করতে হবে যেন তা শিক্ষা বান্ধন, শিক্ষার্থী বান্ধব এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন বান্ধব হয়।
ক্লাসে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ভিত্তিক শিক্ষা ফিরিয়ে আনতে হবে—কেন্দ্রীয় তহবিল ও প্রশিক্ষণ মাধ্যমে। শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মূল্য বুঝিয়ে শিক্ষাকে শুধুমাত্র পরীক্ষার হাতিয়ার থেকে মানুষ গড়ার মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। এই বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরী।
GPA-৫-এর সহজ পথের মোহ থেকে সরে আসা—সমাজকে অনৈতিক উপায় বন্ধে অঙ্গীকার করতে হবে। সামাজিক মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। জিপিএ—৫ না পেলে জীবন ব্যর্থ এই সংকোচিত চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জিপিএ—৫ এর মধ্যেই জীবনের সকল সফলতা নির্ভর করে না। ভালো ফলাফল যেমন দরকার ঠিক তেমনি দরকার ভালো মানুষ হওয়া।
























































