আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশি। এই দেশ আমাদের; এই মাটিই আমাদের শিকড়, এই নদীর জলে আমাদের স্মৃতি ভাসে, এই আকাশে আমাদের স্বপ্ন ঝরে। তাই সবার আগে দেশের কথাই ভাবতে হবে। দেশটাকে ভালোবাসতে হবে নিজের সন্তানের মতো—যেমন মা সন্তানের প্রতি অমোঘ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হন, তেমনি আমাদেরও দেশকে বাঁচানোর, সুস্থিত করার অনুশীলন করতে হবে। কারণ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনি ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা না থাকলে সাধারণ মানুষ কেউই আর ভালো থাকতে পারবেন না। মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষার গুণগত মান, সংস্কৃতি ও খেলাধুলা—সবকিছুই দেশের উপর নির্ভরশীল। বিশ্ব আজ যে গতিতে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে চলেছে, আমরা যেন সেই একই গতিতে পিছিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমাজে জ্ঞান, চিন্তা ও সৃজনশীলতার মূল্যায়ন ক্রমশ কমে যাচ্ছে। গবেষণা, আবিষ্কার বা নতুন ধারণাকে উৎসাহ দেওয়ার পরিবর্তে আমরা ব্যস্ত ক্ষমতার প্রতিযোগিতায়। জ্ঞানের চর্চার জায়গা দখল করে নিয়েছে স্বার্থ আর রাজনৈতিক প্রভাব। অথচ একটি জাতির অগ্রগতি নির্ভর করে তার চিন্তার স্বাধীনতা ও জ্ঞানভিত্তিক মনোভাবের ওপর— যা আমরা ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা আনন্দদায়ক নয়। আমরা এমন এক সময় জুড়ে আছি যখন গণতন্ত্রের কাঠামোই ধুঁকছে। ‘গণতন্ত্র’ কথাটি আজকের সাধারণ অর্থে অনেককেই এমন এক আবরণ মনে হয়, যেখানে নির্বাচনের নামে পাঁচ বছরের জন্য তিনশত-অধিক প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়—কিছু সংখ্যক ব্যক্তি যা-ই বলেন, তারা আসলে আমাদের প্রতিনিধি নয়, তারা হয়ে উঠে শোষক। তারা পাঁচ বছর ধরে আমাদের শোষণ করবে; লুটপাট করবে; দুর্নীতি করবে; বিদেশে অর্থ পাচার করবে; নারী-পুরুষ-শিশু পাচারের চক্রকে সক্রিয় করবে; মাদক ব্যবসা চালাবে; সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে পৃষ্ঠপোষণ করবে; এবং বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে দেশের সামাজিক ও নৈতিক বুনন খণ্ডন করবে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির পেছনে যে সাধারণ কূটনীতি কাজ করে, তা কোনো গোপন কথা নয়—এরা নির্বাচনে টাকা বিনিয়োগ করে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া আজ এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়েছে যেখানে পুঁজি, কৃত্রিম শক্তি ও কালো অর্থ বড় ভূমিকা পালন করছে। জনগণের কল্যাণ কিংবা দায়িত্ব পালনের মানদণ্ড এখানকার আলোচ্য বিষয়ের বাইরে ধরা হচ্ছে। মনোনয়নপ্রাপ্তি, প্রচারণা, ভোটকৌশল—সবকিছুই টাকা ও ক্ষমতার আদানপ্রদান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচন প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকার আদায়ের পরিবর্তে লুটপাট, দুর্নীতি এবং ব্যবসায়ীদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে।
এই সঙ্কট ভাঙার একমাত্র উপায় হলো নির্বাচনকে আবারও পরিষ্কার, ন্যায্য ও স্বচ্ছ করা—কিন্তু এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব একমাত্র সরকারের ওপর নেই; বাস্তব পরিবর্তনের চাবিকাঠি হলো জনগণের সচেতনতা ও নাগরিক কর্মকাণ্ড। যদি আমরা নির্বাচনে টাকা দিয়ে আসা প্রতিনিধিদের আটকে দিতে পারি, তাদের অর্থায়ন ও প্রচারণামূলক উপায়গুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারি, তাহলে এই দুষ্টচক্র ভেঙে পড়বে। ভোট বিক্রি না করে, ভোটের পেছনে ব্যক্তিত্ব নয়, নীতি ও পরিকল্পনা বিবেচনা করে নির্বাচন করা হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে একটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় গড়ে ২–৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়, যেখানে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ অনুমোদিত ব্যয় ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, প্রকৃত ব্যয় ঘোষিত সীমার ৮–১০ গুণ বেশি। একইভাবে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক সংস্থা “নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ফোরাম” জানিয়েছিল যে, প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ প্রচারণা ব্যয়ে অঘোষিত বা কালো অর্থ ব্যবহার করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ভারতে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৮.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যয়ের চেয়েও বেশি (Center for Media Studies, India)। অর্থাৎ, দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচনী ব্যয় এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে মূল প্রতিযোগিতা হয় না নীতি বা পরিকল্পনায়, বরং অর্থবলে।
তবে কেবল ভোটের দিনেই সচেতন হওয়া যথেষ্ট নয়। পরিবর্তনকে টেকসই করতে হলে প্রতিটি স্তরে সংস্কার প্রয়োজন—শিক্ষা সংস্কার, তথ্যের মুক্তি, বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, আর্থিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নাগরিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে হবে; সংবাদমাধ্যমে দুর্নীতির কভারেজ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা উৎসাহিত করতে হবে; বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; আর সরকারি ক্রয়-প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল রেকর্ড রাখতে হবে যাতে দুর্নীতি লুকানো না যায়। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও অপরিহার্য। রাজনীতিকে ব্যবসা নয়, জনসেবা হিসেবে গণ্য করা হলেই আমরা যোগ্য নেতৃত্ব আশান্বিত হতে পারি। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আর্থিক বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতামূলক মেকানিজম প্রবর্তন করা এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ গৃহীত হলে পারদর্শী ও দায়বদ্ধ নেতৃত্ব পুনরায় ফিরিয়ে আনা যায়। একই সঙ্গে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র জাগ্রত করলে মনোনয়ন জাল-মিলের বদলে যোগ্যতাভিত্তিক প্রার্থিতা প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক আর্থিক ব্যবস্থার জটিলতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—নির্বাচনী খরচ কেবল প্রচারণার বিজ্ঞাপন বা রোডশো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিণত হয় পৃষ্ঠপোষকতা, অনুদান, এবং চক্রাকার আর্থিক বিনিময়ের মাধ্যমে রাজনীতির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এই অর্থখাত অবৈধভাবে চললে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণেও আর্থিক স্বার্থের প্রাধান্য গড়ে ওঠে—এর ফলে নীতিনির্ধারণ জাতির কল্যাণের বদলে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধার জন্য প্রভাবিত হয়। তাই নির্বাচনী অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক উৎস- উন্মোচন ও কঠোর মনিটরিং জরুরি। মিটমাট ছাড়াও স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্য-প্রাপ্তির অধিকার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতির কুন্ডলী ফাঁস করে এবং জনগণকে সজাগ রাখে। অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে দেয়—এটি সুবিধা হলেও একই সঙ্গে গুজবের ঝুঁকি বাড়ায়; তাই তথ্য-ভিত্তিক সাংবাদিকতা ও মিডিয়া নৈতিকতা বজায় রাখা আজ অতীব জরুরি।
তরুণ প্রজন্মকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে উৎসাহিত করা দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নাগরিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা বিষয়ক পাঠ্যক্রম চালু করলে আগামী প্রজন্ম দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। তরুণরা যদি ভোটব্যবহারে টাকার প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে, তারা পরিবর্তনের মূলে দাঁড়াবে।বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইন শাসনের প্রত্যাবর্তন ছাড়া দাঙ্গামুক্ত, স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও ন্যায়িক বিচার, আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আর্থিক নজরদারি শক্তিশালী করতে হবে।
নাগরিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী ও স্থানীয় কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগদের উৎসাহ দিয়ে আমরা নিচুতল থেকে সংস্কার শুরু করতে পারি—যেমন ভোট পর্যবেক্ষণ, বাজেট নিরীক্ষণ, ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, নাগরিক সচেতনতা ক্যাম্পেইন ও গণতান্ত্রিক অনুশীলনে অংশগ্রহণই দারুণ বদল আনতে পারে। পরিশেষে, দেশপ্রেম কেবল আবেগ নয়; এটি দায়িত্বের পরিচয়। দায়িত্ব হলো—আপনার ভোটকে বেচে না ফেলা; নিজের নৈতিক অবস্থান অটল রাখা; এবং দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ক্রীড়াকে সমুন্নত রাখতে কাজ করা। নির্বাচনী অর্থায়নের এই অস্বচ্ছতা দূর করতে হলে প্রার্থীদের সম্পদের উৎস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, প্রচারণার ব্যয় নিরীক্ষণ ও স্বাধীন পর্যবেক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি জনগণকেও জানতে হবে—কোন প্রার্থী কীভাবে অর্থ ব্যয় করছে এবং কার স্বার্থে তা করছে। আজ যদি আমরা সকলে একসঙ্গে প্রতিজ্ঞা করি—ভোট বিক্রি করব না, ন্যায়ের পক্ষে থাকব, এবং স্বচ্ছতার জন্য লড়াই করব—তবে শুধু নির্বাচনই পরিষ্কার হবে না; পুরো সমাজে নৈতিক পুনরুজ্জীবন ঘটবে। এই দেশ আমাদের; এ দেশেই আমাদের আশা, ইতিহাস, কষ্ট ও গৌরব। যারা এই দেশকে লুটেপুটে খেতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা আমাদের সম্মিলিত কাজ। আমাদের ভোট, আমাদের সচেতনতা ও আমাদের অঙ্গীকার—এই তিনটি হাতিয়ার শক্ত করলে বাংলাদেশ পুনরায় স্থিতিশীল, সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এখন সময় কাজের—শব্দ নয়, কর্মে দেশকে বাঁচান।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com























































