আমার বাড়ি মেঘানার পাড়ে। ছোটবেলা থেকেই নদী-র সাথে লড়াই করে এবং মিতালী করে বড় হয়েছি। তাই নদীর সাথে একটা সক্ষ্যতা তৈরী হয়েছে। বলতে গেলে এরকম নদীতেই স্বাস্থ্য রক্ষা, নদীতেই পুষ্টি রক্ষা।
আমরা যারা নদীর পাড়ে বড় হয়েছি, তারা জানি নদীর স্পন্দন কেমন। ভরা বর্ষায় নদীর ঢেউয়ে কেমন বেঁচে থাকার আহ্বান থাকে, আবার শীতকালে সেই নদীই কেমন নিরব কান্না হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু এখন? নদী যেন আর নদী নেই, যেন মৃতপ্রায় এক স্মৃতি মাত্র।
গত দুইদিন আগে নদীর পাড়ে এক জেলের সাথে কথা হয়। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম ভাই নদীতে আগের মতো সুখ নাই কেন? কি করে থাকব কন, নদীতে মাছ নাই, জল নাই, নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, অসংখ্য ডুবোচর, নদীর গভীরতা কমে গেছে, ব্যাপক হারে বেড়েছে নদী দূষণ, শব্দ দূষণ, তারওপরে আছে মৎস্য পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড কর্মকর্তাদের ঘুষের কারণে প্রজনন মৌসুমে ইলিশ হত্যা এবং জাটকা রক্ষার মৌসুমে নির্বাচারে ধ্বংস।
মব ও কিশোর গ্যাং: এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি
ভাই এখানেই শেষ নয়। সুখ কেমনে পাবেন বলেন। এক সময় নদীতে জেলেরা শুধু, চান্দি এবং গোল্ডি জাল দিয়ে ইলিশ ধরত। আর এখন ইলিশ এবং নদীর অন্যান্য মাছ ধরার জন্য ব্যাবহার হচ্ছে কত রকমের অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না চাই, মেহেদী জাল, গচি/নেট/খুঁটি জাল, জাটকা ধরার ছোট কারেন্ট জাল, বিষ দিয়ে মাছ ধরা ইত্যাদি। আমাদের নদীগুলোর প্রায় ৯০ভাগ আইসিউতে আছে।
জেলের কথাগুলো শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই, নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হয়। একজন জেলে যদি এইভাবে চিন্তা করতে পারে তবে আমরা শিক্ষিত সমাজ কেন এইভাবে ভাবতে পারিনা? এই নদীতো শুধু একটা জলপ্রবাহ নয়, এটা আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী মানেই জীবন, নদী মানেই রক্তপ্রবাহ।
নদীতে এইসব অবৈধ জালের ব্যবহারে শুধু ইলিশ নয়, মিঠা পানির সকল মাছের জন্যই হুমকী, হুমকী আমাদের স্বাস্থ্যের, প্রজননের এবং আমাদের অর্থনীতির। যেই নদীতে আমাদের জীবীকা, সংস্কৃতি, গতিশীল অর্থনীতি অথচ সেই নদী আজ মৃত্যুপথযাত্রী। নদী মানে কৃষি, নদী মানে মৎস্য, নদী মানে পরিবেশ, নদী মানে সংস্কৃতি। এই নদীই একদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষকে। অথচ আজ সেই নদীর বুক শুকিয়ে যাচ্ছে অবহেলা, লোভ আর দুর্নীতির আগুনে পুড়ে।
মা ইলিশকে যদি প্রজনন মৌসুমে রক্ষা করতে না পারি তবে ইলিশ আর নদীতে পাওয়া যাবে না, ইলিশ পাওয়া যাবে যাদুঘরে। আমরা আমাদের ইলিশকে যাদুঘরে দেখতে চাই না। আমাদের অতিমাত্রার লোভ, নদীর নাব্যতা সংকট, শব্দ দূষণ, নদী দূষণ, নদীর জল দূষণের ফলে ইলিশ সংকট আজকে অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছেছে।
যে নদীগুলো ইলিশের চারণভূমি, ইলিশের আতুরঘর সেই নদীগুলোতে প্রচুর ডুবোচর এতে নদীর স্বাবাভিক প্রবাহ ব্যহত হচ্ছে ফলে ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, নদীর দুই পাড়ে ভাংগনের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীর জল দূষণ আজকে অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছেছে। চাঁদপুর, হাইমচর, লহ্মীপুর, শরিয়তপুর নদীর জল দূর্গন্ধে ভরে গেছে। আর এইভাবে চলতে থাকলে আমাদের জাতীয় মাছ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ ইলিশও বিলুপ্তপ্রায় মাছের তালিকার নামে চলে আসবে।
নদীতে শব্দ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং সেই সাথে নদীতে ইলিশের প্রবাহ কমেছে। ইলিশ অনেক দ্রুতগতি সম্পন্ন মাছ্। এরা সমুদ্র এবং নদীতে দল বেধে চলে। এরা যেই গতিতে সামনে যায় এবং চলার পথে বাধা পেলে তার চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে পিছনের দিকে ছুটে চলে। তাই ডুবো চর এবং ভাসমান চরের কারণে নদীতে ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে পক্ষান্তরে মায়ানমারে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নদী দূষণ, শব্দ দূষণ এবং নদী দখল ইলিশসহ মিঠা পানির অন্যান্য মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় বাধা। ইলিশসহ মিঠা পানির অন্যান্য মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মাননীয় কর্তৃপক্ষকে নদী দূষণরোধ এবং নদীকে দখলমুক্ত রাখতে হবে।
দিনরাত নদীতে জাল ফেললেও কাঙ্খিত ইলিশের দেখা মিলে না। ইলিশের দেখা না পাওয়ায় জেলেদের ঋণের বোঝা বাড়ছে। এখনো সময় এবং সুযোগ আছে এই সংকট উত্তরণের। অনেকটা আমাদের সাধ্যের মধ্যে। আমাদের নদীগুলো আজ প্রায় মৃত। দখলদারদের অধীনে অধিকাংশ নদী। দূষণ নদীগুলোকে ভাগারে পরিণত করেছে। আর আমাদের পছন্দের প্রিয় ইলিশ মাছ এখন আমাদের নাগালের বাইরে।
প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও এই সময়ে মেঘনা, পদ্মা এবং তেতুলিয়া চলে যায় গংদের দখলে। মা ইলিশ নিধনের মাধ্যমে শুধু জেলেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা নয়, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশের অর্থনীতিও।
ইলিশের যেমন আছে পুষ্টিগুণ তেমনি আছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব। ইলিশেল মাধ্যমে জীবীকা নির্বাহ করে দেশের দুই শতাংশ মানুষ এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইলিশকে বলা হয় আমাদের দেশের সিলভার গোল্ড। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হলে নদীতে জেগে ওঠা ডুবো চর ও ভাসমান চরগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে খনন করতে হবে। আর এতে শুধু ইলিশ উৎপাদনই বৃদ্ধি পাবে না রোধ হবে নদী ভাঙ্গনও।
আরও ভয়াবহ হচ্ছে যখন দেখি নদীকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির মানুষ তৈরি করেছে দুর্নীতির সাম্রাজ্য। নদী শুধু পানি নয়, নদী মানে জীবন। ড্রেজিং নেই, নিয়মিত তদারকি নেই, দূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। উন্নয়নের নামে চলছে অপরিকল্পিত খনন, নদীর গতিপথ বদল, নদীর তীর দখল। একদিকে চলছে নদী খননের নামে অর্থ আত্মসাৎ, অন্যদিকে নির্লজ্জভাবে চলছে মাছের বিলুপ্তিসাধন।
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অবাধে চলছে ধরা-বিক্রি, প্রশাসনের চোখের সামনে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যক্তি, আর ঘুষখোর কিছু কর্মকর্তার কারণে আইন কার্যকর হয় না। কারেন্ট জাল, চায়না চাই, মেহেদি জাল, বিষ প্রয়োগ, এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও মাছ ধরা, যার একটিও আইনত বৈধ নয়।
এসব জাল শুধু জাটকা নয়, নদীর সব ছোট মাছ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। ডিমওয়ালা ইলিশ থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রজাতির মাছেরও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা কি পারি না নদীটাকে আবার তার পুরনো রূপ ফিরিয়ে দিতে? পারি না কি এই জেলেদের চোখে আবার নতুন ভোরের আলো ফুটাতে?
নদী রক্ষা করতে হলে শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। নদীর প্রতি আমাদের যে ভালোবাসা, সেই ভালোবাসাটাই হোক পরিবর্তনের হাতিয়ার। শিশুদের শেখাতে হবে নদী মানে শুধু মাছ নয়, নদী মানে আমাদের ভবিষ্যৎ। তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করতে হবে নদী রক্ষার আন্দোলনে। স্থানীয় প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। অবৈধ জাল আমদানি, উৎপাদন এবং বিক্রি বন্ধ করতে হবে যেকোন উপায়ে, জাটকা রক্ষায় কঠোর হতে হবে। এ শুধু একজন জেলের কষ্ট নয়, এ কষ্ট আমাদের সকলের, এ ব্যর্থতা আমাদের রাষ্ট্রের, আমাদের সমাজের। এই যে নদী মরে যাচ্ছে, তার মানে আমাদের ভবিষ্যৎও ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।
শুধু তাই নয়, মৎস্য কর্মকর্তা, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড — যার যেভাবে সুযোগ হয়, সেভাবেই টু পাইস কামিয়ে নেয়। অথচ সবচেয়ে অসহায় থাকে সেই জেলেটাই, যার রুজির পথ আজ বন্ধের পথে। এইভাবে চলতে থাকলে হারাব নদীর সংস্কৃতি, হারাব জীবন, হারাব ভবিষ্যৎ। তাই এখনই সময় — নদী রক্ষা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার।
নদী রক্ষা এবং ইলিশসহ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের জন্য রাষ্ট্রকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং জিরো টলারেন্সনীতি প্রয়োগ করতে হবে। নদীর তলদেশ খননের প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। অবৈধ জাল ও মাছ ধরা পদ্ধতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে।
দুর্নীতিগ্রস্ত মৎস্য কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীর পাড়ের মানুষ, বিশেষ করে জেলেদের নিয়ে নিতে হবে সচেতনতা কর্মসূচি। আমাদের মনে রাখতে হবে — নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে, নদী মরলে আমরা সবাই মরব। নদী এবং নদীর মাছকে যদি রক্ষা করতে পারি তবে তা থেকে আমাদের জাতীয় বাজেটের ১৫ থেকে ২০ভাগ যোগান দেওয়া সম্ভব হবে।
“মা ইলিশ নিধন”, “অবৈধ জাল”, “নদী দূষণ” —


























































