বেঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল সিজেপির নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পতত্যাগ করলেও যন্তর-মন্তর ছাড়ছেনা তেলাপোকা পর্টির সদস্যরা। পরীক্ষায় অনিয়ম ও NEET-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে মাসব্যাপী ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠান। কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে তৃতীয় দফা আলোচনার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি তাঁর ‘এক্স’ (X) হ্যান্ডেলে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিই ছিল ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে সিজেপি (CJP) এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার আলোচনা এস মসয় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। শনিবার সকালে সিজেপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে, সরকার যদি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করতে অস্বীকার করে, তবে কোনো আলোচনা হতে পারে না।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলো ছিলঃ
- ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ
- আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া,
- নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান।
শুক্রবার কেন্দ্রীয় সরকার শেষ দুটি দাবির বিষয়ে সিজেপি-কে আশ্বস্ত করলেও, পদত্যাগের দাবির বিষয়ে নীরব ছিল। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে নিজের ‘এক্স’ (X) পোস্টে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন: “দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, আবেগ এবং ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। ভারতের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণ করা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের নৈতিক সংকল্প। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে জাতির সেবা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
ধর্মেন্দ্র প্রধান আরও বলেন, “আমার দৃঢ় সংকল্প হলো, আমরা দেশের যুবশক্তিকে বিভ্রান্তির জালে আটকা পড়তে দেব না।” “যন্তর মন্তর ও সারা দেশে উদ্ভত পরিস্থিতির সুযোগ যেন কোনো দেশবিরোধী শক্তি নিতে না পারে, দেশের ঐক্য যেন অটুট থাকে, ভারতের একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎও যেন কোনো আইনি জটিলতায় না পড়ে এবং আমাদের সন্তানরা যেন পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়ার দিকেই মনোযোগ দেয়—এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।”
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর পৌঁছামাত্রই যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। পদত্যাগের খবরের প্রতিক্রিয়ায় সিজেপি একটি পোস্ট করে: “ছাত্রশক্তি দীর্ঘজীবী হোক।”
যন্তর মন্তরের মঞ্চ থেকে প্রধানের পদত্যাগের খবর ঘোষণা করে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, “আমরা সফল হয়েছি।”
বলা হতো এই সরকারে কেউ পদত্যাগ করে না। কিন্তু আমরাই তা করে দেখিয়েছি। গত কয়েকদিনে দেশজুড়ে কয়েক ডজন শহরে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র বিক্ষোভ একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে বিরোধী দলগুলো এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সরকারকে অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলেছিল।
পদত্যাগের বিষয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের জেরে পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান শনিবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন; প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের জেরে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ‘এক্স’ (X)-এ প্রকাশিত এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বিষয়টি তাঁর কাছে কখনোই “ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন” ছিল না।
পদত্যাগ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিবৃতিঃ
আমার তরুণ বন্ধুরা, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা সংস্কারের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছি। আমি সর্বদা বিশ্বাস করে এসেছি যে, একটি বলিষ্ঠ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী শিক্ষাব্যবস্থাই একটি শক্তিশালী জাতির ভিত্তিপ্রস্তর। দেশের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, আবেগ এবং যৌক্তিক প্রত্যাশার প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করি। ভারতের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণ করা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে জাতির সেবা করার সুযোগ পাওয়ায় আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
তবে, ৩রা মে ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত NEET-UG পরীক্ষা সংক্রান্ত কিছু অনিয়ম সামনে আসে। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ভারত সরকার তদন্তের দায়িত্ব সিবিআই (CBI)-এর হাতে তুলে দেয়, পরীক্ষাটি বাতিল করে এবং পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করে। পাশাপাশি, আগামী বছর থেকে এই পরীক্ষাটি সিবিটি (CBT) বা কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষার পদ্ধতিতে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পুরো সময়জুড়ে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ২০ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষাটি সুষ্টুভাবে সম্পন্ন করা নিশ্চিত করা। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত একটি সামগ্রিক সরকারি প্রচেষ্টার (whole-of-government approach) মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় ২১শে জুন ২০২৬-এ পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। প্রথম দিন থেকেই আমি পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছি এবং পরিস্থিতি থেকে কখনোই মুখ ফিরিয়ে নিইনি। আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, ‘পরীক্ষা-মাফিয়া’র কারণে কোনো মেধাবী ছাত্রছাত্রীর সম্ভাবনা যেন নষ্ট না হয় এবং কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি যেন কোনো অবিচার না করা হয়। ১৬ জুলাই ঘোষিত NEET-UG-এর ফলাফল সন্তোষজনক ছিল; সুবিধাবঞ্চিত পটভূমি থেকে আসা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এতে সাফল্য অর্জন করেছে।
তবে, এই সময়েও দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তি বাধা সৃষ্টি করার এবং শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন—যা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। আমাদের গণতন্ত্রের শক্তির ওপর আমার সর্বদা অটল বিশ্বাস রয়েছে এবং আমি তরুণদের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। তারা কেবল ভারতের ভবিষ্যৎই নয়; তারা এক নতুন ও উন্নত ভারতের মশালবাহী, নির্মাতা এবং স্থপতি। গত দশ দিনের ঘটনাবলী আমাকে ব্যথিত করেছে। এটি আমার কাছে ব্যক্তিগত মর্যাদার কোনো বিষয় নয়।
ভারতের যুবশক্তিই এই জাতির প্রকৃত শক্তি। দেশের তরুণরা যাতে বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই আমার সংকল্প।
জন্তর মন্তর এবং সারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে—দেশবিরোধী শক্তি যাতে এর সুযোগ নিতে না পারে, জাতীয় ঐক্য অটুট থাকে, কোনো ভারতীয় শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যাতে আইনি জটিলতায় না পড়ে এবং আমাদের সন্তানরা যাতে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়ায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে—সেই লক্ষ্যে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা, আস্থা ও নিরন্তর সমর্থনের জন্য আমি তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এছাড়া মন্ত্রিসভার আমার সকল সম্মানিত সহকর্মী, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যাদের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে, তাঁদের সকলকেও আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জাতির সেবা করাই আমার জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার; আমি সর্বদা এই ব্রতে নিবেদিত থাকব। ভগবান জগন্নাথের আশীর্বাদে, ভবিষ্যতেও ভারতমাতা, ওড়িশার জনগণ এবং দেশের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমি সম্ভাব্য সব উপায়ে নিজেকে নিয়োজিত রাখব।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়ে সিজেপি (CJP) প্রতিষ্ঠাতার প্রতিক্রিয়াঃ
বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লি নিশ্চিত করেছে। জন্তর মন্তরে পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ শুরুর এক মাসেরও বেশি সময় পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন।
ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলন দিল্লি থেকে ভারতের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়েছিল; পরীক্ষার অনিয়ম ও নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
পদত্যাগের খবরটি যখন আন্দোলন শুরুর স্থান—সেই যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাল, তখন সেখানকার পরিবেশ আবেগঘন হয়ে ওঠে। সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করে সেই মুহূর্তটি তুলে ধরেছেন যখন তিনি খবরটি পেয়েছিলেন।
এরপর তিনি মাইক্রোফোন হাতে ঘোষণা করেন, “আমরা পেরেছি!”, এই কথাটি শুনে উপস্থিত জনতা উচ্চস্বরে উল্লাস করতে থাকে। মূলত তরুণ শিক্ষার্থীদের ভিড়ের উদ্দেশে দীপকে বলেন, এই প্রশাসনের অধীনে সহজে পদত্যাগ আসে না, কিন্তু এই মুহূর্তটি তার ব্যতিক্রম প্রমাণ করেছে। তিনি বলেন, “ঝুকতি হ্যায় দুনিয়া, ঝুকানে ওয়ালা চাহিয়ে” (পৃথিবী তখনই মাথা নত করে, যখন তুমি তাকে মাথা নত করাও)।
























































