
মতিয়ার চৌধুরী লিখিত “স্থানীয় সরকারের সার্কেল পঞ্চায়েত সরপঞ্চঃ বিলুপ্ত অধ্যায়” গ্রন্থটি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের (তৎকালীন শ্রীহট্ট) স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিস্মৃত সময়কালের উপর আলোকপাত করে রচিত। গ্রন্থটি মোগল আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত প্রচলিত সার্কেল পদ্ধতি ও সরপঞ্চ ব্যবস্থার ইতিহাসকে নথিবদ্ধ করেছে। গ্রন্থের লেখক মতিয়ার চৌধুরী একজন প্রবীণ সাংবাদিক ও গবেষক , যিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর প্রচেষ্টাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সার্কেল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বা সরপঞ্চ প্রথা সংক্রান্ত সরকারি তথ্য খুব কম সংরক্ষিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর সরপঞ্চ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই গ্রন্থে স্থানীয় উদ্যোগ ও আঞ্চলিক গবেষণার মাধ্যমে তথ্যের শূন্যতা পূরণ করে বিলীন হতে যাওয়া জনপদের স্মৃতি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এটি কেবল তথ্যের ভান্ডার নয়, বরং স্থানীয় ইতিহাসের জন্য একটি ‘পাল্টা-আর্কাইভ’ হিসেবে কাজ করবে।
স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের বিবর্তন এবং বিলুপ্ত সার্কেল পদ্ধতিঃ
সার্কেল বা সরপঞ্চ পদ্ধতি হলো মূলত প্রাচীন ভারতীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থারই পরিবর্তিত রূপ, যা গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনের মূল ভিত্তি ছিল। প্রাচীন ভারতে পাঁচজন নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই পরিষদগুলির হাতে গ্রামগুলির প্রশাসন, আইন প্রণয়ন এবং সালিশের ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। মোগল আমল পর্যন্ত এই স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হলেও, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর তা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ ধাঁচের স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যশালী ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়। ১৮৫৭ সালের পর সীমিত পরিসরে গ্রামীণ অপরাধ দমন ও বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা দিয়ে ১৮৭০ সালে বঙ্গীয় গ্রাম চৌকিদারি আইনের মাধ্যমে পঞ্চায়েতকে আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা হয়। ব্রিটিশদের অধীনে প্রতিটি প্রশাসনিক থানাকে একাধিক সার্কেলে বিভক্ত করে, তার প্রধান নির্বাহী হিসেবে ‘সরপঞ্চ’ পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল। সরপঞ্চের পরিষদে দুই থেকে পাঁচজন সহকারীসরপঞ্চ বা সহকারী সরপঞ্চায়েত থাকতেন। সরপঞ্চের ক্ষমতার মধ্যে ছিল চৌকিদার নিয়োগ, ট্যাক্স আদায়, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্থানীয় বিচার-সালিশের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ইত্যাদি। তবে এই ব্যবস্থায় সরপঞ্চরা থানা সার্কেল অফিসার বা প্রশাসনিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন করতেন। এই আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণই গ্রামীণ নেতৃত্বের প্রথাগত ক্ষমতাকে ক্ষুণ করে দেয়। ১৯৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান কর্তৃক মৌলিক গণতন্ত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে সার্কেল পঞ্চায়েত প্রথা বিলুপ্ত করে ইউনিয়ন কাউন্সিল চালু করা হয়। সরপঞ্চের পদ চেয়ারম্যান পদে এবং সহকারী সরপঞ্চের পদ মেম্বার বা ইউপি সদস্য পদে পরিবর্তিত হয়।
বিলুপ্ত প্রশাসনিক কাঠামোর বিবরণঃ
“বিলুপ্ত অধ্যায়” গ্রন্থটিতে মতিয়ার চৌধুরী সিলেট বিভাগের স্থানীয় সরকারের একটি বিস্তারিত আঞ্চলিক চিত্র অঙ্কন করেছেন, যা কেবল ঐতিহাসিক তত্ত নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক তথ্য প্রদান করে। বইটিতে সিলেট বিভাগের তৎকালীন মহকুমা ও থানাভিত্তিক সার্কেল সংখ্যা এবং সেগুলোর মানচিত্র বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সিলেট বিভাগে মোট সার্কেল সংখ্যা ছিল ১,৪৮০টি।
সিলেট বিভাগের ঐতিহাসিক সার্কেল পরিসংখ্যানঃ
মহকুমা (বিলুপ্ত/বর্তমান জেলা) মোট সার্কেল সংখ্যা (১৮৫৭-১৯৫৮ প্রায়), শ্রীহট্ট/সিলেট সদর (বর্তমান সিলেট জেলা) ৫৬৬ টি, সুনামগঞ্জ মহকুমা (বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা) ৩৯২ টি, হবিগঞ্জ মহকুমা (বর্তমান হবিগঞ্জ জেলা) ২৮৬ টি, মৌলভীবাজার মহকুমা (বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা) ২৩৬ টি। সব মিলিয়ে বৃহত্তর সিলেটে প্রায় ১৪৮০টি। এছাড়াও, গ্রন্থটির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এতে বৃহত্তর সিলেট জেলার ১২০ জন সরপঞ্চ ও সহকারী সরপঞ্চের নাম এবং তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। বইটি ইতিহাসের নীরস তথ্যকে মানবিক স্পর্শ দিয়েছে, যা গ্রামীণ নেতৃত্বের সামাজিক উৎস বোঝার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ উপযোগিতাঃ
গ্রন্থটি পাঠক, গবেষক এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের জন্য অপরিহার্য। বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ব্যবস্থার জন্ম সার্কেল পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিলুপ্তির ফসল। ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বইটি পড়ে তাদের বর্তমান পদের ঐতিহাসিক পূর্বসূরিদের ভূমিকা বুঝতে পারবেন। গ্রন্থটিতে স্থানীয় সরকারের প্রায় ১০০ বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে; যা অন্য কোথাও সরকারিভাবে সংরক্ষিত নেই। গ্রন্থটি সরপঞ্চদের বিচারিক ও সালিশী ক্ষমতার প্রয়োগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা বা শক্তিশালী করার সম্ভাবনা নিয়ে নীতি নির্ধারণ ও গবেষণা কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সাংবাদিক, লেখক এবং গবেষকরা স্থানীয় ইতিহাস ও গ্রামীণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে গবেষণামূলক লেখার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক উপাদান হিসেবে গ্রন্থটিকে ব্যবহার করতে পারবেন। বিশেষত সরপঞ্চদের তালিকা ও জীবনী সম্পর্কে ধারণ নিতে পারবেন গ্রন্থটি থেকে। পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকরা গ্রন্থটিকে “ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য একটি সহায়ক গ্রন্থ” হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন, যা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের পতন এবং তার বিলুপ্তির এক ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। গ্রন্থটি স্থানীয় গণতন্ত্রের ধারণার জন্ম এবং তার বিবর্তনের প্রেক্ষাপট উপলব্ধিতেও ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করি। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে গাঙুড় প্রকাশনী , প্রকাশকাল সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রকাশক অসীম সরকার, মূল্য দুইশত টাকা। গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন প্রবীণ সাংবাদিক আল আজাদ ও ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য। আমি গ্রস্থটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি।








































