গাছে গাছে ডাব ঝুলছে, আবার সেখানে ডাব সদৃশ পাম গাছও রয়েছে, আর আছে সুপারী জাতীয় গাছ। সামনে সোজা সাগরের পানি উথাল পাথাল করছে, আর নীচে তপ্ত বালুরাশি পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে, রহিম সাহেব প্রতিদিন ভোরে ২ মাইল হাঁটেন কখনও বা ৩ মাইল। তিনি কখনই তার এই হাঁটার পরিধি বাড়ান না, সেদিন হাটতে হাটতে তার কি জানি কি মনে হলো, আজ একটু বেশী হাঁটবেন তাই হাটতে হাটতে অনেক দুর চলে এলেন, গায়ে তার ঠান্ডা বাতাশ স্পর্শ করে গেলো তখন তার হুস হলো সে অনেক দূর চলে এসেছেন, সামনে তাকাতেই দেখেন সাগরের ঢেউ এর খেলা। সাগরের পানির ঢেউ আছরে আছরে পড়ছে বালুকা রাশির মধ্যে, মাথার উপরে সুর্যের হালকা পরশ বেশ ভালই লাগলো। অতএব তিনি কাল বিলম্ব না করে নেমে পড়লেন বীচে। কিছুক্ষন জলে নেমে কাপড় ভিজিয়ে ক্ষান্ত হলেন, আবার তার পদযাত্রা শুরু হলো; এবার গন্তব্য তার বাড়ীর দিকে।
হাঁটার পথেই দেখেছিলকাল মেঘে ছেয়ে গেছে সম্পূর্ন আকাশটা, যাও বা সূর্য মেঘের আড়াল থেকে একটু একটু করে উকি মারছিলো এখন তাও নাই । বোঝা গেলো খুব শীঘ্রই বৃষ্টি আসন্ন তাই তিনি তাড়াতাডি হাঁটছিলেন, কিন্তু ছিটেফোটা পানি উপর থেকে ঝড়ছিল। বুঝতে অসুবিধা হলো না জোর কদমে কোথাও আশ্রয় নিলেও পানি তাকে ছাড়বে না। ওদিকে ঝড়ো হাওয়া বার্তা দিচ্ছে বৃষ্টি আসছে তারই পূর্বাভাস। বাসার কাছে আসতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো তখন তিনি আর বৃষ্টিতে না ভিজে বাসার উদ্দ্যশে মারলেন দৌড়। দৌড়তো দিলেন কিন্ত ওদিকে রহিম সাহেব ভিজে এক-সা। কর্তা এসেছে আওয়াজ পেয়ে গিন্নি ছুটে এসে রহিম সাহেবের এই হাল দেখে গামছা (টাওয়াল) আনতে ছুটলেন। রহিম সাহেব কাপড়-চোপড় ছাড়লেন। এদিকে বাড়ীর কত্রি গামছা দিয়ে তার ভাল মত মাথা ও সারা শরীর মুছে দিলেন।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে চেয়ারে বসলেন, রুটিন মতো এক গ্লাস পানি পান করে দুটো ডিম পোছ (তাও আবার তেলে নয় পানিতে) একটি সাগর কলা আর ভেজানো পানিতে কাঁঠ বাদাম খেয়ে নাস্তা সারলেন। সবাই জানেন এবার কর্তা বৈঠক-খানায় টিভি ছেড়ে দিয়ে আজকের পত্রিকা নিয়ে বসবেন, এই মূর্হতে কেউ অযথা ডিস্টার্ব করুক তা তিনি চান না।
রহিম সাহেবের রুটিন বড়ই কড়া, যদিও তিনি একজন রাসভারি মানুষ তথাপি মাঝে-মধ্যে একদম ছেলে মানুষ হয়ে পরেন। তিনি কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন ৩ বছর হলো। এখন তার ব্যাবসা সামাল দেয় তার সেজ পুত্র বসির। বড় ছেলে হাফিজ, সে অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব নিয়েছে আর সে ঐ দেশের মেয়েকে বিয়ে করে ২ বাচ্চার বাবা হয়েছে। তার আর দেশে ফেরার ইচ্ছা নাই, তবে একেবারে যে আসবে না সে রকম কোন কথা নয়। কয়েক বছর পর পর সপ্তাহ খানিকের জন্য বেড়িয়ে যায় কিন্ত বছর বছর নয়। আর মেঝ ছেলে রশিদ সে এ দেশেই আছে তবে সারাদিন গান- বাজনা- নাটক নিয়েই পড়ে আছে। তার ব্যাবসা-বানিজ্য একদম ভাল লাগে না তবে মাস গেলেই সে অফিস থেকে মোটা অংক হাতিয়ে নেয় আর ঐ টাকাতেই বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সংস্কৃতি অনুষ্ঠানে মাতিয়ে বেড়ায়। তারও ব্যাবসার প্রতি কোন মনযোগ নাই, অতএব সবেধন নীল মনি তৃতীয় ও শেষ ছেলে আসিফই ভরসা। আর রশিদ সাহেবের আছে ২ মেয়ে নায়লা আর সায়লা, একজনের বিয়ে হয়ে গেছে। তার কর্তাও ব্যাবসা করে, তবে সে গবেট কিসিম।
ব্যাবসায়ী প্রায়ই তাকে শালা আসিফ অথবা শশুরের কাছে হাত পাততে হয়, তবে আবার এই বিষয়ে তিনি খুবই শেয়ানা। কারণ, নিজে কখনো হাত পেতে টাকা চান না এ ব্যাপারে তিনি তার গিন্নি নায়লাকে পাঠান তার বাবা কিংবা ভাইয়ের কাছে। ছোট মেয়ে শায়লার বিয়ে এখনো হয়নি, সে পড়ছে কলেজে।
রশিদ সাহেব ভার মুক্ত হয়ে তার রুটিন মাফিক চলছেন। মোটামুটি এই হলো সংক্ষেপে রশিদ সাহেব ও তার পরিবারের জীবন-যাত্রা। তাদের ব্যাবসা বেশ ভালই চলছে, কোন রকম ঝুট-ঝামেলা নেই, আর যদিও বা ব্যাবসায় কোন অসুবিধা হয় তাহলে তো রসিদ সাহেব আছেন। তখন ছেলেকে বুদ্ধি এবং পরার্মশ দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করেন।
সেদিন তিনি নিত্য দিনের মত সাদা গেঞ্জি, সাদা কেটস, সাদা মোজা, সাদা ট্রাউজার, আর মাথায় সাদা ক্যাপ পড়ে নেমে পড়েন রাস্তায় প্রাতঃ ভ্রমনের ঊদ্দেশ্যে। পথে নেমেই ঘাড় ঘুড়িয়ে আকাশের দিকে দেখে নিলেন, পরে রওয়ানা দিলেন ঠিকই তবে তার বুঝতে বাকী রইলো না আজও বৃষ্টি ঝড়বে, অতএব তার আজকের হাঁটা সংক্ষেপ করতে হবে। কেবল রওয়ানা দিয়েছেন আর ওমনি শুরু হয়ে গেলো ঝড়ো হাওয়া, এই বাতাশে রাস্তার দু ধারের গাছপালাগুলির নরম ডাল ভেঙ্গে আছড়ে পড়লো পথে। ঝড়ের গতি ক্রমে ক্রমে বাড়তে লাগলো। এই অবস্থায় বাইরে থাকা ঠিক হবে না ভেবে ইউটার্ণ করলেন। আচমকা আকাশে বিদ্যুত যেন ঝলসে উঠলো, তার পরপরই বিকট শব্দে বাজ পড়লো ধারে কাছে কোথাও; একবার নয় কিছুক্ষন পরে পড়েই দিনের আলোর মতই আকাশে বিজলী গর্জন করে উঠলো আর এই আওয়াজে মনে হলো মাটি যেনো দুই ভাগ হয়ে গেলো ।
দুর্যোগপুর্ন আবাহাওয়া বাড়ীর সবাই রসিদ সাহেবের জন্য চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলো, ঠিক এমন সময় দরজায় একই সাথে কলিংবেল ও কড়া নাড়ার শব্দে হুড়মুড় করে দরজার সামনে হাজির হলো সকলে, দরজা খুলেই দেখে বৃষ্টিতে কাকভেজা রসিদ সাহেবকে। তাকে দেখে সবার প্রানে যেনো পানি ফেরে এলো। তখনও বুক কাঁপানো গর্জনে মেঘে মেঘে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে দামামা বাজাচ্ছে আর আলোর ঝলকানি দিয়ে জানান দিচ্ছে সাবধান কেউ বের হইও না, বের হলেই বিপদ। এইভাবে সকালে সকলকে জানান দিয়ে গেলো বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকানো ও চোখ ঝলসানো এবং বুক কাঁপানো গর্জন।
বলা বাহুল্য গাছ পড়ে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। ভাগ্যিস অনেকে টের পেয়ে সুকনো দ্রব্যাদি কিনে গুদামজাত করেছিল। তার কারণও আছে, ঝড় বৃষ্টি যে হবে সেটা আগে থেকেই রেডিও টেলিভিশনে বার বার সতর্ক বার্তা দিচ্ছিল, রশিদ সাহেবরাও যে কিছু কেনেনি তাও না। তবে আপাতত খাওয়ার সমস্য না হলেও বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না, সেটাই বড় কথা।
বৃষ্টি ভেজা ভোরে যেহেতু তিনি রাস্তায় প্রাতঃ ভ্রমনে যেতে পারেন না বলে সারাক্ষণ মনটা একটু খারাপ থাকে। সেই সাথে মাঝে মাঝে মেজাজটাও কন্ট্রোল করতে পারেন না। যেহেতু বাইরে যেতে পারেন না তাই ঘরে বসেই ঘাম ঝড়ান উপর নীচ করে, অর্থ্যাৎ সিড়ি দিয়ে উঠেন আর নামেন। খাবার সময় পরিমিত খাবার গ্রহণ করেন এবং সবাইকে সেই উপদেশ ও দেন যার কারণে তিনি খেতে বসলে সাধারণতঃ কেউ আর খাবার ঘর মাড়ায় না । দ’দিন ধরে মেঘলা আকাশ আর থেমে থেমে বৃষ্টি, কখনও ঝম ঝম আবার কখনো বা ঝির ঝির করে বৃষ্টি ঝড়ছেতো ঝড়ছেই। এই বৃষ্টি কবে যে থামবে কে জানে? হঠাৎ শায়লার জামাই নীরবতা ভঙ্গ করে মুখ খুলে বল্লো, সাইক্লোনের একটা সময় আছে তাই অত তাড়াতাড়ি আকাশ পরিস্কার হবে বলে মনে হয় না।
শেষ পর্যন্ত চারদিন পর মেঘলা আকাশে সূর্যের আলো দেখা গেলো। তবে বৃষ্টিতে মনে হয় তার রস্মির তেজ বেশ কমে গেছে। রসিদ সাহেব আকাশ পরিস্কার দেখে তৈরী হতে লাগলো বাইরে হাটতে যাবেন বলে। যাবার সময় বলে গেলেন “চারদিন ঘরে বসে বসে হাত-পায়ে জং ধরে গেছে তাই একটু ঘুরে আসি। দরজার কাছে এসে জানতে চাইলেন রসিদ সাহেব, আজ কি শায়লারা চলে যাবে?” গিন্নি চাপা সুরে বল্লেন, বলো কি জামাই শুনলে ভাববে কি? উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে তিনি পথে নেমে পড়লেন।
শায়লারা আরো এক সপ্তাহ থাকার পরও নিজ বাড়ীতে যাওয়ার নাম গন্ধ নাই। শেষ পর্যন্ত রসিদ সাহেব বিরক্ত হয়েই বল্লেন, সাইক্লোনতো থেমে গেছে বেশ কয়েকদিন তা বাবা তোমার অফিসেও কি বন্ধ নাকি? জামাই বাবাজী কোন কথা না বলে সোফা থেকে উঠে গেলো, রসিদ সাহেব জামাইয়ের চলে যাওয়া দেখে শুধু বল্লেন, গবেট কোথাকার। কিছুক্ষণ পরে শায়লা চোখ মুছতে মুছতে মাকে সাথে করে রসিদ সাহেবের কাছে এসে বল্লো, তুমি নাকি জামাই কে অপমান করেছো?
রসিদ সাহেব কিছুক্ষণ হা করে চেয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করলেন কখন আবার জামাইকে গাল-মন্দ করেছেন? বাবাকে নীরব থাকতে দেখে শায়লা নিজেই বাবাকে বল্লো, কেন তুমি জামাইকে বলোনি বাসায় আর কত দিন থাকবে? তখন রসিদ সাহেবের কাছে সব পরিস্কার হলো। এবার জবাব দেবার পালা, রসিদ সাহেবের তিনি বল্লেন, তোমরাই বলো। সাইক্লোন হবে বলে আমাদের সবার সাথে থাকার জন্য তারা এলো তাও প্রায় ১০/১২ দিন হলো, তাই আমি জানতে চাইলাম তোমার অফিস কি খোলা? এই কথার সাথে চলে যাবার কথা আসলো কোথা থেকে?
শেষ পর্যন্ত শায়লারা আরও এক মাস বাবার বাড়ীতে অবস্থান করে চলে গিয়েছিল। তবে যাবার সময় বলে যেতে ভুললো না যে, তারা আবার খুব শীঘ্রই আসবে। এদিকে রসিদ সাহেব রোজ ভোরে মর্নিংওয়াক করতে বের হন। বাড়ীর পরিবেশ একটুও বদলাইনি। যেরাকম ছিল ঠিক সেরাকমই আছে।
ওদিকে মাঝে- মধ্যে আকাশে বিদ্যুৎ চমক দিয়ে বাজ পড়ে সেই সাথে বুক কাঁপানো গর্জনে অনেকে ভয়ে জড়সড় হয়ে বাসাতেই অবস্থান করে এ থেকে রসিদ সাহেবের বাড়ীও ব্যাতিক্রম নয়। তবে রসিদ সাহেব প্রায়ই এই নিয়মের ব্যাত্যয় ঘটান আর মেঘের গর্জনে বাসার দিকে পা বাড়ান। ভয়ে না গর্জনের আওয়াজে সেটা তিনি কাউকে না বলে বাসায় চলে আসেন, এবং সরাসরি একটু বিশ্রাম নিয়ে চলে আসেন খাবার টেবিলে, আর বাইরে তখনো বিদ্যুতের চমক এবং আকাশে তখন বাজের গর্জন।









































