২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নিজের অভিষেক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, “আজ থেকে আমাদের দেশ এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হবে। এখন থেকে নীতি হবে—‘আমেরিকা সবার আগে’ (America First)।” বিশ্বজনীন বা ‘গ্লোবালিস্ট’ ধারণা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিরূপ মনোভাবের পাশাপাশি এক ধরনের অন্তর্মুখী ও জনতুষ্টিবাদী জাতীয়তাবাদ তাঁর হোয়াইট হাউসের উভয় মেয়াদেরই মূল প্রতিপাদ্য ও প্রধান স্লোগান হয়ে উঠেছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতিসংঘকে তীব্রভাবে আক্রমণ ও সমালোচনা করতে প্রচুর সময় ও শক্তি ব্যয় করেছেন—অথচ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ৮০ বছর আগে সহায়তা করেছিল এবং তখন থেকেই এর রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। তিনি জাতিসংঘকে ‘অনির্বাচিত ও জবাবদিহিহীন এক বৈশ্বিক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ এবং কেবল ‘কথার দোকান’ (talking shop) বা অর্থহীন আলোচনার মঞ্চ হিসেবে অভিহিত করে উপহাস করেছেন। অধিকাংশ আমেরিকান এখন আর তাদের প্রেসিডেন্টের অবস্থানের সাথে একমত নন। রকফেলার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত একটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ আমেরিকান উত্তরদাতা একমত পোষণ করেছেন যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের দেশের উচিত অন্যদের সাথে সহযোগিতা করা—এমনকি এর ফলে যদি কিছু জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে ছাড়ও দিতে হয়। মাত্র ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা এর বিপক্ষে মত দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি আমেরিকানদের এই সমর্থন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ৩৪টি দেশের ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর চালানো ২০২৬ সালের জরিপে যখন একই প্রশ্ন করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রে এই সমর্থন ৪ শতাংশ বেড়ে ৬৫ শতাংশে পৌঁছায় এবং বিরোধিতার হার ২ শতাংশ কমে ১৪ শতাংশে নেমে আসে।
২০২৬ সালে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রতি আমেরিকান জনগণের সমর্থন পশ্চিম ইউরোপের (যেখানে এই হার ৬১ শতাংশ) চেয়েও বেশি। জাতিসংঘ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নানা সমালোচনামূলক মন্তব্যের পরেও ৬২ শতাংশ আমেরিকান জানিয়েছেন তারা এই সংস্থার ওপর আস্থা রাখেন—যা গত বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি—অন্যদিকে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ এর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। প্রায় অর্ধেক আমেরিকান উত্তরদাতা (৪৬ শতাংশ) মনে করেন, বিশ্বমঞ্চে জাতিসংঘের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালনে কোনো সমস্যা নেই; মাত্র ২১ শতাংশ এ বিষয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা হ্রাস পাওয়া এবং শান্তি ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে আমেরিকানদের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। একই জরিপে উত্তরদাতাদের ১৩টি বৈশ্বিক বিষয়ের তালিকা থেকে তিনটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয় বেছে নিতে বলা হয়েছিল; সেখানে ৪০ শতাংশ আমেরিকান উত্তরদাতা যুদ্ধ ও সংঘাত প্রতিরোধকে তাদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট। গত ৮০ বছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে—এমনকি এককেন্দ্রিক ক্ষমতার যুগেও—আমেরিকা বহুপাক্ষিক পন্থায় কাজ করেছে। ক্রমবর্ধমান বহুকেন্দ্রিক ক্ষমতার যুগেও আমেরিকানরা চায় না যে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে কোনো পদক্ষেপ নিক। তারা চায় তাদের দেশ জোরজবরদস্তির পরিবর্তে ঐকমত্য গড়ে তোলার রাজনীতি অনুসরণ করুক।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন আহ্বান
আমি বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশের ১০০ জন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি উদ্যোগে শামিল হয়েছি। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বর্তমান বিশ্বনেতাদের প্রতি এমন আহ্বান জানানো, যাতে তারা ক্রমশ খণ্ডিত ও বহুকেন্দ্রিক হয়ে ওঠা বিশ্বে সহযোগিতার আরও শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলেন। সোমবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে আমাদের অনেকেই একত্রিত হয়ে কিছু মূল নীতিকে সমর্থন জানিয়েছি; এসব নীতি যৌথ সমস্যা সমাধান এবং যাদের সহায়তা প্রয়োজন তাদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে একটি নতুন বৈশ্বিক ঐকমত্যের ভিত্তি হতে পারে। প্রয়োজনের মুহূর্তে।
রকফেলার ফাউন্ডেশনের পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি (৫৩%) আমেরিকান উত্তরদাতা তাদের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে সহযোগিতার এই নীতিগুলোকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোর বিষয়টিকে স্বাগত জানাবেন। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, আমেরিকা কেবল “সবার আগে আমেরিকা এবং একমাত্র আমেরিকা” (America first and America only)—এমন মতাদর্শে বিশ্বাসী কোনো জাতি নয়; বরং তারা এমন এক জাতি যারা বৃহত্তর বিশ্বের সাথে নিজেদের আবদ্ধকারী চিরস্থায়ী মূল্যবোধগুলোর প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধাশীল।
অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সহযোগিতার বিষয়ে আমেরিকানদের সমর্থন যখন বাড়ছে, তখন আমেরিকার সাথে সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য অংশের আগ্রহ বা প্রবণতা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। দশকের পর দশক ধরে বিশ্বের মানুষ আশা ও অনুপ্রেরণার জন্য আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। সেই আস্থার জায়গাটিই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একই জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বনেতা হিসেবে আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা বা আকর্ষণ কমেছে। বিশ্বজুড়ে মাত্র ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালনের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। আবার ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা আমেরিকাকে তাদের নিজ নিজ দেশের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে মনে করেন। এই উদ্বেগজনক সূচকে রাশিয়ার অবস্থান আরও খারাপ—৪২ শতাংশ মানুষ দেশটিকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। চীনের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম (৩০ শতাংশ)।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল বিশ্ববিষয়াবলীতে কোন কোন দেশের নেতৃত্ব তারা পছন্দ করবেন, তখন তালিকার নিচের অর্ধেকের মধ্যে আমেরিকার অবস্থান ছিল। এক্ষেত্রে কানাডা আমেরিকার চেয়ে এগিয়ে ছিল; বিশ্বজুড়ে ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা কানাডার নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছেন, যা যেকোনো দেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ।
সম্ভাব্য বিশ্বনেতা হিসেবে বেশ কয়েকটি মাঝারি শক্তির দেশকে উত্তরদাতারা অধিকতর ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন: জাপান (৫৮%), অস্ট্রেলিয়া (৫৫%), যুক্তরাজ্য (৫৪%), জার্মানি, স্পেন ও ইতালি (সবকটি ৫৩%), ফ্রান্স (৫১%) এবং দক্ষিণ কোরিয়া (৪২%)।
যদিও অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিক থেকে এই দেশগুলোর কোনোটিই আমেরিকার ধারেকাছেও নেই, তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার ‘সফট পাওয়ার’ বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা নিশ্চিতভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, প্রায় ৯০ কোটি মানুষ তাদের নিজ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশে বসবাস করতে আগ্রহী।
মানুষ কোন দেশে বসবাস করতে পছন্দ করবে—এমন জরিপগুলোতে বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রকে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে। গ্যালাপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৪ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের পছন্দের নতুন আবাসস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ২০২৫ সাল নাগাদ সেই পছন্দের হার কমে মাত্র ১৫ শতাংশে নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের পুনরুজ্জীবন
যুক্তরাষ্ট্র এখনও তার ‘সফট পাওয়ার’ বা নমনীয় প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। আমেরিকানরা তাদের আশাবাদ কিংবা সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেনি। ২০২৬ সালের জরিপে ৫৫ শতাংশ আমেরিকান অংশগ্রহণকারী মত প্রকাশ করেন যে, কোনো সংকটের সময় তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে। আরও বড় একটি অংশ—৬৪ শতাংশ—বিশ্বাস করেন যে, আমেরিকান হিসেবে অন্যদের সহায়তা করা তাঁদের দায়িত্ব; এমনকি সেসব দেশের মানুষের জন্যও যাদের তাঁরা চেনেন না। এছাড়া ৭৬ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন যে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
আমেরিকানদের উচিত তাদের এই দৃঢ় বিশ্বাস ও মনোভাব আরও স্পষ্টভাবে এবং ব্যাপকভাবে তুলে ধরা। দেশের অভ্যন্তরে জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকট এবং বিদেশে অতিরিক্ত সামরিক সম্পৃক্ততার চাপের মুখে আমেরিকানরা হয়তো আর আগের মতো “যেকোনো বোঝা বহন করতে বা যেকোনো মূল্য দিতে” প্রস্তুত নয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে যেসব মূল্যবোধ কাজ করে, তা এখনও দেশটির অধিকাংশ মানুষ ধারণ করে। এর থেকে বোঝা যায়, আমাদের এই অস্থির পৃথিবীতে আগের চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয় বৈশ্বিক নেতৃত্ব পুনরায় গ্রহণের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের এখনও রয়েছে।



































































